ন’কাকার কাছে গুরু মহারাজের অনেক কথা শুনতাম ৷ সেইসব কথা–যেগুলি আমি বনগ্রাম যাবার আগে গুরুমহারাজ ওনাদের কাছে বলতেন, সেইসব ঘটনার কথা – সেইগুলি বলা হচ্ছিল। আমি যখনই সময় বা সুযোগ পেতাম – তখনই সেই সময়কার কথা আমি ন’কাকাকে জিজ্ঞাসা করতাম ! যদিও ন’কাকা দীর্ঘসময় ধরে আলোচনা করার মতো ব্যক্তি ছিলেন না – উনি গুরু মহারাজের ছোট ছোট কথা বা ছোটখাটো কোন ঘটনার উপস্থাপনা করে হাততালি দিয়ে হেসে – নিজেই আনন্দ করতেন সবচাইতে বেশি ! গুরু মহারাজ প্রথম যেদিন বনগ্রামে পা দিয়েছিলেন তখন ওনার পোশাক কেমন ছিল, সঙ্গে কে বা কারা ছিল, কোথায় উঠেছিলেন, কোথায় বসেছিলেন, কি কথা বলেছিলেন – সব কথা ন’কাকার কাছে শুনেছিলাম । গুরু মহারাজের বনগ্রামে প্রথমবার আসা (যদিও খুব ছোটবেলায় উনি একবার সন্ধ্যার আঁধারে বনগ্রামে এসেছিলেন), দ্বিতীয়বারের আসা বা পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে আসার সমস্ত কথা ওনার মুখ থেকেই শুনেছিলাম(যদিও বনগ্রামের নগেনের কাছ থেকেও অনেককিছুই শুনেছিলাম)। লেখার সময় হয়তো ঘটনা পরম্পরার মধ্যে কিছু কিছু গোলমাল হতে পারে – কিন্তু ঘটনাগুলি এবং ওনার বলা কথাগুলি সবই সঠিক !
গুরু মহারাজের স্থুল-শরীর ছাড়ার পর বনগ্রাম আশ্রম থেকে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘চরৈবেতি’-তে ন’কাকাকে লেখা দেবার জন্য তৃষাণ মহারাজ (স্বামী পরমেশ্বরানন্দ) একদিন আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন ‘ ন’কাকার কাছে একটা লাল পাটি-বাঁধানো খাতা রয়েছে, তাতে গুরু মহারাজের বনগ্রামে প্রথম আগমন এবং সেই সময়কার অনেক কথা ন’কাকা লিখে রেখেছেন । তুমি ওনার কাছ থেকে খাতাটা নিয়ে – ওখান থেকে অল্প অল্প লেখা ‘চরৈবেতি’ কার্যালয়ে দিয়ে দাও । তাহলেই স্বরূপানন্দ ওগুলি ছাপাতে পারবে।” তৃষাণ মহারাজের সেদিনের কথা শুনে আমি খুবই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম এবং সেই সঙ্গে আমার খুব আনন্দও হয়েছিল ! যাক্, তাহলে সেই সব দিনগুলোর কথা আমরা সবাই বিস্তারিত জানতে পারবো ! আশ্রম থেকে চলে গেলাম ন`কাকার কাছে (মুখার্জি বাড়িতে), গিয়েই বললাম – ” ন’কাকা ! আপনার কাছে একটা লাল পাটি দেওয়া খাতা রয়েছে, যাতে আপনি গুরু মহারাজের প্রথমদিককার অনেক কথা লিখে রেখেছিলেন – সেই খাতাটা বের করুন ! আমাকে তৃষাণ মহারাজ বলে দিলেন যে, ওই খাতাটা থেকে অল্প অল্প করে নিয়ে ‘চরৈবেতি’ পত্রিকায় প্রতি সংখ্যায় দেওয়া হবে ৷”
সব কথা শুনে ন’কাকার সে কি হাসি ! বললেন – ” হ্যাঁ ! সে একসময় লিখতে শুরু করেছিলাম বটে – কিন্তু খুব একটা বেশি লেখা হয়নি ! আচ্ছা – আচ্ছা – আমি ওই খাতাটা খুঁজে রাখবো – আর খুঁজে পেলে তোমাকে দিয়ে আসবো ৷” পরের দিনই আমি ওই খাতাটা হাতে পেয়েছিলাম – বহুদিনের পুরনো খাতা [এই ঘটনাটি হয়তো ২০০০ বা ২০০১ সালের, আর ন’কাকা খাতাটিতে ঘটনা সমূহ লিখেছিলেন সম্ভবতঃ ১৯৮০ সালে বা ওই সময়ের কাছাকাছি কোন সময়ে] – কিন্তু মুক্তোর মতো ঝকঝকে হাতের লেখায় সাজানো খাতার পাতাগুলি ! খাতাটি সম্পূর্ণভাবে লেখা দিয়ে ভর্তি নয় – হয়তো অর্ধেক ভর্তি ছিল । আমি খাতা খুলেই দেখলাম ন’কাকা ঐ লেখাগুলোর একটা নামকরণও করেছেন, নামটি হলো – ” গৃহ যবে হোল মোর বৈকুণ্ঠধাম।” মনের আনন্দে ওই খাতাটি নিজের ঘরে (বনগ্রাম আশ্রমের সাধনা ভবনের ১৭ নম্বর ঘর) নিয়ে গিয়ে প্রথমেই এক নিঃশ্বাসে ন’কাকার লেখার সবটা পড়ে নিলাম ৷ তারপর ওই খাতা থেকে একটু একটু করে অংশ তুলে নিয়ে – বেশ কয়েক বছর ধরে ‘চরৈবেতি’- পত্রিকায় দেওয়া হয়েছিল (‘চরৈবেতি’ পত্রিকাটি ত্রৈমাসিক, ফলে এক বছরে ৪x২=৮ পাতা করে লেখা দেওয়া হোতো)। কিন্তু ওই খাতার সব লেখা ‘চরৈবেতি’ পত্রিকায় ছাপানো হয়নি । নির্দিষ্ট কোনো কারণে ন’কাকা একদিন খাতাটা আমার কাছ থেকে নিয়ে নিলেন এবং বললেন – ” এই খাতাটা থেকে লেখা দেওয়ায় অসুবিধা আছে, আমি তোমাকে প্রতি সংখ্যায় (চরৈবেতি পত্রিকার জন্য) একটা করে লেখা তৈরি করে দেবো – তুমি ওইটাকেই ঠিকঠাক করে স্বরূপানন্দের হাতে দিয়ে দেবে !” … [ক্রমশঃ]