গুরু মহারাজ অনেকবারই ন’কাকাকে বলেছিলেন – ” ন’কাকা দীক্ষা দাও ! তোমাদের বংশপরম্পরাতেও তো রয়েছে ! তাছাড়া তোমার কি অসুবিধা! আমি বলছি_ তুমি আশ্রমে দীক্ষা দেবার ভারটা নাও ! তুমি ঐ দিকটা দেখো – আর আমি আশ্রমের অন্যান্য (জনসংযোগ, সেবামূলক ও গঠনমূলক কাজ ইত্যাদি) দিকটা দেখি – তাহলে আমার কাজ অনেক হাল্কা হয় !” ন’কাকা স্বভাবসিদ্ধ বিনম্রতা ও অত্যন্ত শ্রদ্ধা এবং বিনয়পূর্বক গুরু মহারাজকে বলেছিলেন – ” কি যে বলো তার ঠিক নাই ! তোমার জগৎ ! এর ভালো মন্দের ভার তোমার ! আমরা খাই-দাই, মায়ের নাম করি ৷ তুমি থাকতে__ অন্য কেউ !!” গুরু মহারাজ বললেন – ” তাহলে ন’কাকা ! আমি না থাকলে তুমি দীক্ষা দেবে ! আমি থাকতে দেবে না ! বেশ বাজাও_বাজাও ! একটা ঢাক সবাই মিলে যদি বাজাতে চাও — তাহলে আর কতদিন টিকবে ? একদিন দেখবে ঠিকই ফেটে গেছে ! পূর্ণানন্দ, হরি, মুরারী এদেরকেও বলছি – কেউই রাজী হচ্ছে না ! তবে তুমি দায়িত্ব নিলে নিশ্চিন্ত হতাম !”
গুরু মহারাজের সাথে ন’কাকার পারস্পারিক কথাবার্ত্তা বা মজা করার (তার মধ্যে আধ্যাত্মিক তাৎপর্য্যও নিশ্চই ছিল কিন্তু তা ধরার মত স্থিতি আমার ছিল না !) কিছু অংশ গত সংখ্যার চরৈবেতিতে (শ্রীরামপুরের ঘটনাটা) “কথা প্রসঙ্গ”-তে তুলে ধরা হয়েছিল ৷যেখানে গুরুমহারাজ নিজের বসার আসন ছেড়ে দিয়ে প্রায় মাটিতে বসে পড়েছিলেন এবং ন’কাকাকে দু-বাহু বাড়িয়ে আহ্বান জানাচ্ছিলেন যাতে ঐ আসনে বসে ন’কাকা সেইদিনকার সিটিং টা চালিয়ে দেন। কিন্তু ন’কাকা’ সেদিন বিনয়ের অবতার’-হয়ে গেলেন, তাই গুরুমহারাজ আর খুব একটা সুবিধা করতে পারলেন না! আর ন’কাকা সুযোগ বুঝে তৃষাণ মহারাজের এনে দেওয়া আসনে গুরুমহারাজের পাশে বসে পড়লেন! এখন আরও দু-চারটে ঐরকম ঘটনার উপস্থাপনা করছি !(আগে আলোচনা হোলেও আবার করছি)
গুরু মহারাজকে একবার আশ্রমে একটা চন্দ্রবোড়া সাপে কামড়ে দিয়েছিল ৷ উনি তখন আগের মাটির ঘরটির (এখন ওনার যে ঘরটি রয়েছে , তার আগের ঘর) বাইরের দাওয়ায় খাটিয়া পেতে শুতেন ৷ সে রাত্রিতেও শুয়েছিলেন ৷ একটা চন্দ্রবোড়া সাপ খাটিয়ার পায়া বেয়ে বিছানায় উঠে গরম পেয়ে _ওনার পাশেই শুয়ে ছিল ৷ গুরু মহারাজ পাশ ফিরতেই সাপটির গায়ে স্পর্শ্য বা চাপ লাগাতে – সে গুরু মহারাজকে কামড়ে দিয়েছিল ৷ এই ঘটনাটা গুরুমহারাজ পরের দিন সন্ধ্যায় ন’কাকাদের বাড়ীতে বলেছিলেন – ” জানো তো ন’কাকা ! কাল রাত্রে একটা চন্দ্রবোড়া সাপ আমাকে কামড়ে দিয়েছিল । ঠিক সেই সময় কান্টিপুরের দিকে বাজনা বাজিয়ে একটা বিয়ে যাচ্ছিল ! তারা ওখানে কত আনন্দ করছিল আর এদিকে বিছানায় আমি সাপের বিষের যন্ত্রনায় কষ্ট পাচ্ছি !” গুরু মহারাজের একথা শেষ করার প্রায় সাথে সাথেই এই পিঁড়েতে(দাওয়ায়) অর্থাৎ আমাদের কাছে বসে থাকা ন’কাকা হাততালি দিয়ে (ন’কাকা যে কোন আনন্দের Expression দিতে হাততালি দিয়ে উঠতেন) হেসে উঠে বললেন – ” তা আর কি করবে ! সাপের মাথায় চেপে কত নেচেছ – এখন সাপের কামড় খাও , বিষের জ্বালা ভোগ কর!”
আমরা যারা ওখানে বসে ছিলাম – এ কথা শুনে কিন্তু সেদিন সত্যিই বিস্মিত হয়েছিলাম! ওই কথার এই উত্তর ?? ওনারা পরস্পরকে কেমনভাবে চেনেন – কেমনভাবে নিজেদের জগতের কথার আদান-প্রদান করেন? ___অবশ্য এই ব্যাপার গুলো আমাদের ভাবনার সাথে মেলে না। তাই এর উত্তর কোন দিনই পাবোও না।
আর একদিন সন্ধ্যায় গুরু মহারাজ ন’কাকাদের বাড়ীতে বসে রয়েছেন ! গোটা বাড়ী অন্ধকার (তখনও বনগ্রামে বিদ্যুৎ যায়নি, হ্যারিকেনের আলো জ্বলতো ; গুরু মহারাজ মুখার্জী বাড়ীতে ঢুকলেই আলো কমিয়ে দেওয়া হোত । তখন অবশ্য বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে জেনারেটরের সাহায্যে সন্ধ্যা থেকে রাত্রি ৯-৩০ পর্যন্ত ইলেকট্রিকের বাতি জ্বলত ! সপ্তাহে ১ ব্যারেল করে ডিজেল পুরতো তখন) ৷ গুরু মহারাজ ঐ দিকের পিঁড়েয়(দাওয়ায়) বসে আছেন, বসে বসে সিগারেট খাচ্ছেন – সেই আগুনটা একবার নামছে আবার উঠছে, উঠলে ওটা উজ্জ্বল হয়ে উঠছে_ আমরা বুঝতে পারছি এবার উনি সিগারেটটা টানলেন ৷ অার সেই উজ্জ্বলতায় ওনার মুখমন্ডলটা অনেকখানি দেখা যাচ্ছিল ! এইরকম চলতে চলতে গুরু মহারাজ ন’কাকার বাবার কথা তুললেন ! [ছোটকাকা (গোলকপ্রসাদ মুখার্জী) -র ছেলে বাপী-ই পূর্বশরীরে ন’কাকার বাবা (কালীপ্রসন্ন মুখার্জী মহাশয়) ছিলেন] ৷ গুরু মহারাজ বললেন – ” ন’কাকা ! বুড়োকর্ত্তার কিছু জিনিস তো তোমার কাছে রয়েছে নাকি ? কর্ত্তা কি কি ভালোবাসতো ?” ন’কাকা বললেন – ” হুঁকো খেতে খুব ভালোবাসতো ! তাই হুঁকোটা যত্ন করে রেখে দিয়েছি ; আর একটা মাছ ধরার জাল রয়েছে ! কর্ত্তা (বাবা) জাল ‘খেয়া’ দিতে পারতো ! পাশের ‘জরুলী’ (ন’কাকাদের ডোবা)-তে খেয়া দিয়ে প্রায়ই মাছ ধরে আনতো ! ঐ জালটাও রেখে দিয়েছি !”
আবার কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা ! চারিদিক চুপচাপ ! আবার হঠাৎ করে গুরু মহারাজের গুরুগম্ভীর গলার স্বর নয় – যেন চটুল স্বরের কথা – ” আচ্ছা ন’কাকা ! তুমি তাহলে ওইসব আর এই শরীরে একদম খাও না ?” ন’কাকা হেসে বললেন – ” না – না ! কই মনই তো চায় না ! ছোট থেকে কোনদিনই কোন আকর্ষণ বোধ করিনি !” গুরু মহারাজ আবার চটুল রসিকতা করে বললেন – ” তা হলেও একটু-আধটু ! কখনও মনে হয়নি ! তা – খেয়ে দেখতে পারতে তো ! কতদিনের অভ্যেস ! একেবারে ছেড়ে দিলে ?” ন’কাকা বিনয়ের সঙ্গে আবার একবার বললেন – ” কই, মনে কোন ইচ্ছাই হয় না !” গুরু মহারাজ বললেন – ” তোমরা মহাপুরুষ লোক – ইচ্ছামাত্রই সবকিছু পরিবর্ত্তন করে নিতে পারো ! কিন্তু আমাকে আবার সবকিছুর মধ্যে দিয়েই চলতে হয়! দ্যাখোনা – রায়নার জগাদার ওখানে একদিন আমাকে ৮/১০ বোতল মদ খেয়ে নিতে হয়েছিল !”
ওনাদের এইরূপ কথোপকথন যখন চলছিল তখন হঠাৎ করে মেজোমা (তপিমার মা) বলে উঠলেন – ” তবে বাবা ! ন’ঠাকুরপো কিন্তু ছোলাভাজা খেতে খুব ভালোবাসে !” এই কথা শোনার সাথে সাথে গুরু মহারাজ বলে উঠলেন – ” তা হলে ন’কাকা ! ওই তো তুমি ছোলাভাজাটা তো ছাড়তে পার নি ? তাহলে একটা যখন ছাড়তে পার নি – তাহলে অন্যটাতেই বা দোষ কি ছিল ?” ন’কাকা বললেন – ” হ্যাঁ ! ছোলা ভাজাটা খাই , জানলে [এই ‘জানলে’ -বলাটা ন’কাকাদের পারিবারিক অভ্যাস ! ছোটকাকা (গোলোকপ্রসাদ)-ও কথায় কথায় ‘জানলে’ শব্দটা ব্যাবহার কোরতেন! ] ছোলাভাজা খেতে আমার বেশ ভালোই লাগে ।” গুরু মহারাজ বললেন – ” তোমার দাঁতের গঠনও তো বেশ ভালো । শক্ত, সবল দাঁত না হলে তন্ত্র সাধন হয় না !”
এবার অন্য এক দিনের কথা বলি _সেইদিনও ছিল একই রকমের পরিবেশ। গুরুমহারাজ ঐ পিঁড়ে (দাওয়ায়) – তে বসে রয়েছেন _আর ন’কাকা, মেজোকাকা সহ আমরা কয়েকজন এই পিঁড়ে – তে বসে ছিলাম। হটাৎ করে গুরুমহারাজ ন’কাকাকে বলে উঠলেন _ জানো ন’কাকা! তুমি টোপর মাথায়, নতুন কাপড় চোপড় পড়ে, পাল্কী চড়ে বনগাঁ থেকে ৪/৫ _মাইল দুরে গিয়ে বিয়ে করতে গেছিলে __এইটা ভেবে আমার বেশ কেমন মজা লাগে!_তা ন’কাকা! তুমি বরবেশে অর্থাৎ টোপর মাথায়, পাল্কী চড়ে বিয়ে করতে গেলে তো?”
সেদিন কিন্তু ন’কাকা বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিলেন না _বরং বেশ boldly বলে উঠলেন _তা কি হবে! সে তো গদাইও গিয়েছিল, পাল্কী চড়ে – মাথায় টোপর পড়ে !কামারপুকুর থেকে জয়রামবাটি যায় নি? সেও তো অনেকটাই! আবার পয়সা ছিল না, তাই বাদ্যি-বাজনা হয় নি বলে ‘বগল’ ও বাজিয়েছিল!” গুরুমহারাজ ন’কাকার এই কথাগুলো শুনে কেমন যেন শান্ত হয়ে গেলেন _বললেন,” হ্যাঁ, তা অবশ্য গিয়েছিল! ঠাকুর তো তখন গদাই ই ছিল! গদাই পাল্কী চড়েই বিয়ে করতে গিয়েছিল বটে!”
তারপরেই গুরুমহারাজ বলতে শুরু করলেন _” ভগবানকে যুগে যুগে বারবার বিয়ে করতে হয়েছে! কয়েকবার তো সন্তানাদিও হয়েছিল। সবকিছুর মধ্যে দিয়ে সেই ঈশ্বরের লীলাই প্রকাশিত হয়ে চলেছে। ঈশ্বরের অবতরিত রুপ কে (ভগবান) সব স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। তাছাড়া ভগবান আসেন সাধারণ মানুষের জন্য _তাদেরকে পথের দিশা দেখাতে! অসাধারণ যারা (সাধু-সন্তরা) _তারা তো পথের সন্ধান পেয়েই গেছে। তাদের একটু আধটু সাহায্য করলেই হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে কাছে যেতে হয় _তবে তো তাদের ঠেলে ঠেলে একটুখানি তোলা সম্ভব হবে! এবার সাধারণ মানুষ যদি তাদেরই মতো কাউকে হাতের কাছে পায় _তবে তো তাকে আপন করে নিতে পারবে! প্রচন্ড জ্ঞানী, প্রচন্ড ধ্যানী, সর্বদাই যোগযুক্ত কোন ব্যক্তি _এরকম হোলে সাধারণ মানুষ তাকে accept-ই করবে না! কুষ্ঠরোগীদের দ্বীপে গিয়ে তাদের সুস্থ করে তুলতে হলে _ডাক্তারকে প্রথমেই হাতে-পায়ে ন্যাকড়া বেঁধে কুষ্ঠরোগী সাজতে হবে। না হলে ওখানকার মানুষ ডাক্তারের কাছেই আসবে না!”(ক্রমশঃ)।
জয় গূরূজী ।জয় ন’কাকা ।