গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ বিভিন্ন সময়ে আলোচনা করতেন – মানব জীবনের উদ্দেশ্য বা Purpose of Life প্রসঙ্গে ! উনি বলতেন – ” এই যে মানুষ অন্যান্য জীব অপেক্ষা উন্নত! কিন্তু চতুষ্পদ প্রানীদের সাথে এই দ্বিপদ প্রাণীরা কোন দিক থেকে উন্নত ? বুদ্ধি খাটিয়ে অন্যান্য পশুদেরকে নিজেদের আয়ত্তে আনতে সমর্থ হয়েছে বলে ? এটাতো একটা আদিম প্রবৃত্তি ! সব উন্নত জীবই চায় – তার থেকে অনুন্নতরা তার অধীনে থাকুক ! শক্তিশালী মানুষরা তাদের থেকে দুর্বলতর মানুষদেরকেও পদানত করে রাখতে চায়। বহুকাল থেকে ক্রীতদাস, ভূমিদাস প্রথা চালু ছিল এই মানব সমাজেই ! এখনও শক্তিশালীরা, (রাজনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে ইত্যাদি) ধনশালীরা__যে কোনো ভাবে দুর্বলদেরকে তাদের অধীনে রাখতে চায় ! এমনকি ধর্মীয় নেতারাও ছলে-বলে-কৌশলে সাধারণ মানুষদেরকে dominate করে রাখতে চায় ! সুতরাং অপরকে dominate করে নিজেকে জাহির করা – এটা জীবের একটা আদিম বৃত্তি ! এতে কোন গৌরব নাই ! গৌরব সেখানেই – যখন একটা মানুষের প্রতি প্রেমে-ভালোবাসায়-শ্রদ্ধায়, সহস্র-সহস্র মানুষ ছুটে চলেছে তাঁর সান্নিধ্য লাভের জন্য, তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ! এখানে কোন জোর-জবরদস্তি নাই, কোন শাসন-বারণ নাই, শুধু অহেতুক ভালোবেসে মানুষের দল ছুটে ছুটে আসে ৷
এই ধরনের মহামানবেরাই মানব সমাজে উন্নত মানুষ – তাই তো এঁরা যুগ যুগ ধরে শত-সহস্র মানুষের কাছে আদর্শস্বরূপ হয়ে থাকেন। আর মানবের Purpose of Life হচ্ছে ওই সকল মহাপুরুষদের ন্যায় অবস্থা প্রাপ্তির প্রচেষ্টা ! এই জীবনকেই মহাজীবনে রূপান্তর ঘটানো ! না হলে আর কি হলো ? শুধু জন্মলাভ, কিছুকাল এই জগতে কাটানো _তারপর মৃত্যু ! ব্যস – হয়ে গেল ?? কিন্তু ভারতীয় সনাতনপন্থী ঋষিগণ-জ্ঞানীগণ বলে গেছেন (যদিও সেমেটিক চিন্তায় নাই)– একটা জীবন বা জীবনকাল অথবা একটা মৃত্যু-ই শেষ কথা নয়, বারবার জীবের জন্ম হয় এবং কিছুটা জীবনকাল কাটিয়ে আবার মৃত্যু হয় – এইভাবেই চুরাশি লক্ষ যোনি ভ্রমন করে এই দুর্লভ মানব জীবন লাভ হয় । ” পুনরপি জনমম্ পুনরপি মরণম্, পুনরপি জননী জঠরে শয়নম্ “– এই বারবার জন্ম-জীবনকাল-মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানব (সকল জীবসহ) অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে থাকে । এইভাবে সমাজে দেখা যায় অনেক মানুষ ছোটবয়সে থেকেই বেশ অভিজ্ঞ, বেশ পাকা, প্রথম থেকেই নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা সম্পন্ন অথবা ছোট বয়স থেকেই ধর্মপরায়ণ – ইত্যাদি ইত্যাদি ! তাছাড়া দেখা যায় একই ক্লাসে সব ছেলেই পড়াশুনায় উন্নত হয় না (সবাই ফার্স্ট-সেকেন্ড হয় না), একই পরিবার, একই পিতা-মাতার সন্তান সমবুদ্ধিসম্পন্ন বা সম মনোভাবাপন্ন হয় না এবং পরবর্তীকালে সকলেই বিদ্যাশিক্ষা, সুখ-সমৃদ্ধির দিক থেকে সমানভাবে জীবন-যাপন কাটাতেও পারে না ! এসব থেকে ভারতীয় ঋষিদের জন্মান্তর রহস্য এবং প্রারব্ধ কর্মের ভোগ স্বরূপ জন্মলাভের যে তত্ত্ব তা প্রমাণিত হয় ।
মানুষ যে মৃত্যুর পর মানুষ হয়েই জন্মাবে – তারও কোন স্থিরতা নাই, মানুষ শরীর লাভ করার পর যদি তার পশুর ন্যায় আচরণ বা স্বভাব হয় – তাহলে শাস্তিস্বরূপ তার পরবর্তী জন্ম ইতর যোনিতেও হতে পারে । তাছাড়া গুরুমহারাজের কাছে আমরা এটাও শুনেছিলাম যে, মহাপাতক (গুরুদ্রোহিতা, পিতা-মাতার প্রতি অমানবোচিত আচরণ ইত্যাদি) করলেও মানুষ নিম্ন যোনি প্রাপ্ত হয় । বিহারের জামালপুর স্টেশনে দশ পয়সা ভিক্ষা চাওয়ায় বালক রবীনকে (গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দকে) যে লোকটি সজোরে পেটে লাথি মেরেছিল – সেই লোকটির পরবর্তী সাতটি জন্ম শূকর যোনিতে শরীর ধারণ করতে হয়েছিল (মহাপ্রাকৃতিক নিয়মেই এটা হয়েছিল । গুরু মহারাজ ওই ব্যক্তিকে কোন অভিশাপ দেন নি ৷)
মাত্র কয়েক বৎসরের মধ্যেই ওই সাত বার শূকর যোনিতে গমনাগমনের ব্যাপারটা ঘটে গিয়েছিল! কারন একটা পুরুষ শূকর দুই-আড়াই বছরের মধ্যেই Mature হয়ে যায় এবং মাংসের জন্য তাকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয় (ওই শুকরটিকে প্রতিবারই পিছন দিক থেকে উত্তপ্ত লোহার রড ঢুকিয়ে হত্যা করা হয়েছিল) !
গুরুমহারাজ কুড়ি বছর বয়সের পর (ওই ঘটনাটা যখন ঘটেছিল তখন গুরুজীর ১০/১১ বছর বয়স) বনগ্রামে আসেন এবং পঁচিশ বছর বয়সে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন । আর তারও পরে বনগ্রামে ওনার কুঠিয়ায় একদিন বসে থাকতে থাকতে ওনার হঠাৎ করে ওই লোকটির কথা মনে পড়ে যায় এবং সাথে সাথেই ওনার চোখের সামনে একটা flashing হয় ! গুরু মহারাজ পরিস্কার দেখতে পান যে, ওই ব্যক্তি শূকর শরীরে “ঘোঁৎ-ঘোঁৎ” করতে করতে ঘুরে বেড়াচ্ছে ! উনি আরও দেখলেন যে এইটি ওর সপ্তম শরীর – বাকি ছয়টি শরীরও শূকরের এবং প্রতিবারই ঐরকম(পিছন দিকে উত্তপ্ত লোহার রড ঢুকিয়ে) নির্মমভাবে মৃত্যু ! গুরুমহারাজ এটা দেখে মা জগদম্বার কাছে প্রার্থনা করেন – ওর মুক্তির জন্য ! ৺রী মা গুরুজীর আবেদন Accept করেন এবং ওই ব্যক্তি শূকর যোনি থেকে পুনরায় এখন মনুষ্যশরীরে ফিরে এসেছে ।
সুতরাং গুরু মহারাজের ঘটনাবহুল জীবনের শিক্ষা থেকেও আমরা জানতে পারি যে, মানবজীবন লাভ করে ভালো কাজ করলে তার ভালো ফল পাওয়া যায় এবং খারাপ কর্ম বা অমানবোচিত কাজ করলে মানুষকে পরজন্মে দুর্ভোগ পোহাতে হয় । বারবার মানুষের এই যে জন্ম-জন্মান্তর__এটাই মানুষকে জগত এবং জীবনের শিক্ষা দেয় এবং তাকে উন্নত মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করে । এইজন্যেই গুরুমহারাজ বলতেন – “জীবন যেন এক অভিসার বা যাত্রা, যা জন্ম-জন্মান্তর রূপ অভিজ্ঞতার সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে এগিয়ে চলেছে পূর্ণতার দিকে ।” … [ ক্রমশঃ]