গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ মানবজীবনের উদ্দেশ্য অথবা Purpose of Life যে_ ‘পূর্ণতা’, সেই সম্বন্ধে অনেক কথা-ই বলেছিলেন ৷ তার মধ্যে যেটুকু বুঝেছিলাম সেটাই এই কদিন ধরে আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছিলাম । ‘পূর্ণতা’- মানেই সবটা ! এই সবটা-র মধ্যে ভালো-মন্দ, আলো-অন্ধকার, পরাজ্ঞান-অপরাজ্ঞান ইত্যাদি সবকিছুই পড়ে যায় ৷ গুরু মহারাজের কাছে শুনেছিলাম – উপনিষদে রয়েছে, যে ব্যক্তি শুধুমাত্র অপরাজ্ঞান (জগৎ জ্ঞান) নিয়ে রয়েছে সে অন্ধকারে প্রবেশ করছে, আর যে ব্যক্তি শুধুমাত্র পরাজ্ঞান (ঈশ্বর জ্ঞান) নিয়ে রয়েছে – সে গভীরতর অন্ধকারে প্রবেশ করছে ৷ সুতরাং বহুপূর্বেই ভারতীয় ঋষিরা পূর্ণত্বের ধারণা দিয়ে গিয়েছিলেন_বলে গিয়েছেন যে, কোন ব্যক্তি “পূর্ণ” মানেই_তাঁর মধ্যে জগৎজ্ঞান এবং ঈশ্বরজ্ঞান দুই-ই বিদ্যমান ।
গুরুমহারাজও একবার বনগ্রাম আশ্রমে সিটিং-এ আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন – “গ্রামাঞ্চলের ‘গাদী’ খেলা (ফিয়েঁ দাড়ি বা নুন-দাড়িও বলা হয়) হয় দেখেছিস ! মাঝামাঝি দাগ টেনে দুদিকে ছয়টা বা আটটা বড় বড় ঘর তৈরি করা হয় ৷ একপক্ষ যখন ‘মোর’ হয়, তখন তারা অপরপক্ষকে ঘর থেকে বেরোতে দেয় না – আটকাবার চেষ্টা করে । এবার কোনো কারণে ওই বিপরীত পক্ষটি ‘মোর’ হয়ে গেলে, তখন তারা আবার তাদের প্রতিপক্ষকে আটকাবার চেষ্টা করে এবং প্রথমপক্ষ ঘর থেকে বেরোবার চেষ্টা করে ।
আমি দেখেছি মানব সমাজেও এটাই হয়ে চলেছে ! এই জন্মে কেউ নাস্তিক – ঈশ্বর বিশ্বাসীদেরকে সে খুব বিরোধ করছে, সেই আবার পরের জন্মে আস্তিক হয়ে জন্মগ্রহণ করছে এবং ঈশ্বর বিশ্বাসীদের স্বপক্ষে খুব বাক-বিতণ্ডা করছে ! এই জন্মে কেউ হয়তো সন্ন্যাস আশ্রমে রয়েছে অথচ গৃহী বা গৃহস্থদের জীবন নিয়ে সমালোচনা করছে, তাদেরকে হেয় করছে, কথায় কথায় ছোট করার চেষ্টা করছে – সেই ব্যক্তিকেই দেখছি আবার পরের জন্মে নতুন শরীর পেয়ে চুটিয়ে সংসার করছে ! মহামায়ার জগতে এ যেন বিচিত্র বিধান !”
যাইহোক, গুরু মহারাজের কাছে এইসব আলোচনা শুনে আমরা যেটুকু বুঝেছিলাম – তা হল মানুষ জন্ম-জন্মান্তরের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে করতে প্রকৃত অর্থেই Senior হয়ে ওঠে, জগতের ভালো-মন্দ, আলো-অন্ধকার, কালো-সাদা সবকিছুর অভিজ্ঞতা সঞ্চয়কারী ব্যক্তিই সাধনার গভীরে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে আত্নজ্ঞান লাভ করে পূর্ণত্ব অর্জন করতে সমর্থ হয়।
তবে এই তত্ত্ব Accending অর্থাৎ পৃথিবীর উন্নত মানব বা সাধকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য – অবতারপুরুষের তত্ত্ব আলাদা, তাঁরা প্রথম থেকেই পূর্ণ, শুধু লোকশিক্ষার জন্য কিছুটা সাধন-ভজন করে একবার ঝালিয়ে নেন – এইমাত্র ! গুরুমহারাজ উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন – ” যেমন ধর্ তুই টাকা পকেটে নিয়ে-ই বাজারে গেছিস – কিছু কেনার জন্য, কিন্তু বাজারে পৌঁছে কোন মালের দরদাম করার আগে একবার বাইরে থেকেই পকেটে হাতটা ঠেকিয়ে দেখে নিলি – টাকাটা সত্যি সত্যি রয়েছে কি না ! এটাই ‘বোধে বোধ’ ।”
কথা হচ্ছিল Accending বা পৃথিবীর সাধারণ মানুষ, যারা সাধন-ভজনের দ্বারা উন্নত থেকে উন্নততর হয়ে উঠছে – তাদের কথা ! গুরু মহারাজ বলেছিলেন – Accending সাধক নিজেকে দ্বাদশ কলা পর্যন্ত নিজেকে প্রকাশ করতে পারে – তারপর আর পারে না । আগেই বলা হয়েছিল – ব্রহ্ম নিজেকে অষ্টকলায় ‘মানুষ’ হিসাবে প্রকাশিত করেন। জন্মজন্মান্তরের অভিজ্ঞতা অর্জন করে মানুষ যখন প্রকৃত অর্থে উন্নত হয়ে ওঠে , তখন সেই মানুষের মধ্যে বিবেক এবং ভালবাসা পূর্ণমাত্রায় জাগ্রত হয় এবং তখন‌ই তিনি দশম কলায় প্রকাশিত ‘দেবতা’ পদবাচ্য হয়ে ওঠেন । মানবশরীরে থেকেও তিনি যেন অন্য মানুষ, কেননা আমাদের মতো সাধারন মানুষেরা শুধু সমাজ থেকে-সংসার থেকে কতটা পেতে পারি তার হিসাব করি, সর্বদা “দাও-দাও” করছি ! কিন্তু এই”দেবতা” হয়ে ওঠা মানুষেরা সর্বদা “নাও-নাও” করেন, কত বেশি সমাজকে দিতে পারেন – তার জন্য সদা সচেষ্ট ! বিদ্যাসাগর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, হাজী মুহাম্মদ মহসিন বা দেশপ্রেমিকেরা(যারা বিন্দুমাত্র সুখের ইচ্ছা ত্যাগ করে দেশের সম্মান রক্ষায় জীবনকে উৎসর্গ করে থাকেন )– তাঁরা সবাই দেবতা !
এরপর ওই ধরনের সাধকদের জীবনে আরও গভীর সাধনার ফলে যদি ‘জ্ঞান এবং বৈরাগ্যে’-র প্রকাশ ঘটে তাহলেই তাঁরা দ্বাদশ কলায় প্রকাশিত ‘ঋষিত্ব’ অর্জন করেন অর্থাৎ তাঁরা সিদ্ধ হ’ন ৷ ছোলা বা অন্যান্য শষ্য সিদ্ধ হলে যেমন আর অঙ্কুরিত হয় না, তেমনি এঁদেরও আর জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে ঘুরে ঘুরে মরতে হয় না ! এখন থেকে এঁরাও মুক্ত-স্বাধীন ! কুৎসিত দর্শন-কিলবিলে গুটিপোকা গুটি কেটে মুক্ত হয়ে যেমন রঙবাহারী প্রজাপতি হয়ে পাখা মেলে উদার আকাশে উড়ে যায়, তেমনি এই সাধকেরাও পূর্ণত্বের divine রঙে রঙবাহারী হয়ে ওঠেন, দূর-দূরান্ত থেকে সেই রঙের আভা দেখে দলে দলে সাধারণ মানুষ ছুটে আসতে থাকে সেই মহামানবের চরণতলে ! যেমনটা আমরা স্বচক্ষে দেখলাম_সহস্র সহস্র মানুষ ছুটে ছুটে আসতো গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের প্রেমের টানে!
গুরু মহারাজ বলেছিলেন – Accending-এর চূড়ান্ত ধাপ ঋষিত্ব বা সিদ্ধ অবস্থা ! পৃথিবী গ্রহের কোন শরীর এর উপরে আর উঠতে পারে না । উনি স্বামী নিগমানন্দের উদাহরণ দিয়েছিলেন_যিনি Accending-এর সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিলেন (একথা নিগমানন্দ স্বামী ও বারবার বলে গেছেন)। ঋষিত্ব অর্জনের পর তখন অবশ্য অন্য তত্ত্ব কাজ করে –এরপর আর কোন সাধন নাই,ভজন নাই, practically কোন প্রচেষ্টা-কোন প্রযত্ন‌ও নাই! সেখানে শুধু অপেক্ষা-অপেক্ষা আর অপেক্ষা ! আর মাঝে-মাঝে দরজায় শুধু একটু টোকা মারা !” গুরু মহারাজ বলেছিলেন___”Knock the door – But the door is opened !” অর্থাৎ কোন পুরুষকার কাজ করছে না,তাই সে দরজা খোলার চেষ্টা ও করছে না! কিন্তু ঐ দরজা খোলা হবে __ কখন খোলা হবে,কার দ্বারা খোলা হবে – তার জন্যই অপেক্ষা ! একদিন না একদিন তো দরজা খুলবেই,আর দরজা খুললেই – আর সেখানে ব্যক্তির পৃথক identity নাই, ‘ব্যক্তি-অহং’ নাই – তখন ‘আমি – তুমি’ একাকার ! তুমিই আমি_আমিই তুমি!
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ !
🙏🌺ওঁ নমঃ শ্রীভগবতে পরমানন্দায় নমো নমঃ🌺🙏