গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ মহারাজের বলা কথা নিয়ে আমাদের আলোচনা চলছে – চলবেও এভাবেই ! আমরা নিদ্রার ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে শ্রীমদ্ভগবতগীতার অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণকে যথাক্রমে গুঢ়াকেশ এবং হৃষীকেশ বলা হয়েছে – তার উল্লেখ করেছি, কিন্তু কেন বলা হয় – তা এখনও ব্যাখা করে বলা হয়নি, পরে হবে । কারণ এখন চলছে মানবজীবনে – কোন অবস্থায় কতটা নিদ্রার প্রয়োজন সেই সব কথা !গুরুমহারাজের কাছে শুনেছিলাম বার্ধক্য যন্ত্রণার কথা ! উনি বলেছিলেন – বৃদ্ধাবস্থায় রোগযন্ত্রণা বা মৃত্যুযন্ত্রণার থেকেও কোন বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার মারাত্মক যন্ত্রণার কারণ হয় – বিছানায় শয্যাশায়ী অবস্থায়,তারই অতিপ্রিয় জনেদের উপেক্ষা এবং অবহেলা !
গুরুমহারাজ একটা চিত্র বর্ণনা করেছিলেন সেটি এখানে বলছি । বলেছিলেন – ” ধর্ – গ্রামের কোন বৃদ্ধ পিতা তার একমাত্র ছেলেকে খুব কষ্টে-সৃষ্টে (কষ্টে-সৃষ্টে অর্থাৎ সংসারের অল্প আয়ের বেশিরভাগটা ওই ছেলের লেখাপড়া, শহরে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে গিয়ে পুরো পরিবারটিকেই খুবই টেনে-টুনে সংসার চালাতে হয়েছে, ইচ্ছা থাকলেও কোনদিনই ভালো খাওয়া বা ভালো কাপড় পড়া হয়ে ওঠেনি, বাইরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া-আসা বা কোন শখ-আহ্লাদ মেটানো হয়ে ওঠেনি) বড় করেছে, লেখাপড়া শিখিয়েছে,– ছেলেটি যাইহোক কিছু একটা চাকুরীও পেয়েছে ৷ মাসান্তে ছেলে একবার বাড়ি আসে, ছেলের বাড়ি আসার দিন সকাল থেকেই বৃদ্ধ বাবা বারবার ছেলের মা-কে মনে পাড়াচ্ছে – ‘আজ খোকা আসছে, তাহলে ওইটা রান্না করো, এইটা কি আমি আনতে যাবো !’ মা বলছেন – ‘সে তো সন্ধ্যার পরে লাস্ট বাসে আসবে, এখন থেকে অস্থির হয়ো না তো ! এখন ঠান্ডা পড়েছে – তোমার অসুস্থ শরীরে হাঁপানির টানটা বেড়েছে – তুমি চুপ করে বসে থাকো ! সব ব্যবস্থা আমি করে নিচ্ছি !’ তবু দুপুরের পর থেকেই বৃদ্ধ পিতা এক-একবার বাড়ির বাইরে গিয়ে দেখে আসছে! বাসস্ট্যান্ড থেকে কেউ ফিরলে তাকে জিজ্ঞাসা করছে – ‘ হ্যাঁরে ! আমাদের খোকা কি বাস থেকে নামলো ?’ ওই ব্যক্তির অসম্মতিসূচক ঘাড় নাড়া দেখে বৃদ্ধ আবার তার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ছে । এইরকম দু’চারবার দেখেই গিন্নি শাসনের সুরে বলে ওঠে – “ওই শুরু হয়ে গেল তোমার ‘আনবাড়ি-টান’ অবস্থা ৷ ছেলে তোমাকে সাধে বকে না – বুঝলে ! তোমার অসুস্থ শরীর নিয়ে বারবার দৌড়ে দৌড়ে বাড়ির বাইরে যাবার দরকারটা কি ! খোকা ঠিক সময়েই আসবে – সে কখন আসে তা কি তুমি জানো না ?” বৃদ্ধ বাবা বলে – ” না, তা নয় ! অনেক সময় তো আগের ট্রেনটাও ধরতে পারে – তাহলে একটু আগে আসবে, তাই খোঁজ নিচ্ছিলাম ।” বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বৃদ্ধ বেশ কয়েকবার ‘ঘর-বার’ করে ক্লান্ত হয়ে বিছানায় বসে হাঁপাতে লাগল – শীতের সন্ধ্যায় একটু শীতল বাতাস লাগলে কাশিটা বাড়ে ! তবু ঘর থেকে মুখ বের করে মাঝে মাঝেই গিন্নীর কাছে খোঁজ রাখছে – ” খোকা কি এলো ?” গিন্নি তো জানে বুড়োর স্বভাব – তাই এক-একবার উত্তর দেয় – এক-একবার দেয় না ! সন্ধ্যায় বৃদ্ধর জপ-তপ হয়ে যাবার ফাঁকেই ছেলে বাড়ি এসেছে – কাঁধের ব্যাগ রেখে, হাত-পা ধুয়ে, জামা-কাপড় পাল্টানো হয়ে গেছে ৷ মা একটু মিষ্টি-জল খাইয়ে চা বসিয়ে দিয়েছে । তারপর মা বললেন – ” খোকা ! চা খেয়ে তোর বাবার ঘরে একবার যাবি ! জানিস তো মানুষটাকে – বড়ই ‘আবাতালে’ মানুষ ! দুপুর থেকেই ছটফট করছে – বারবার বাইরে যাচ্ছে, আর তুই বাস থেকে নামলি কিনা লোকের কাছে খবর নিচ্ছে ! সন্ধ্যার পর কাশিটা শুরু হলো – তাই ঘরে ঢুকে কাঁথামুড়ি নিয়েছে – যা একবার বাবার সাথে দেখা করে আয় ।”
ছেলে তার ব্যাগটা খুলে একটা কাশির পেটেন্ট সিরাপ এবং ডাক্তারের গোটা কতক প্রেসক্রিপশনের ওষুধ – ইত্যাদি নিয়ে বাবার ঘরে গিয়ে বলল, ” বাবা ! তোমার শরীর এখন কেমন ? মা বললো – ঠান্ডাটা আবার লাগিয়েছো ? এমন করলে কাশির সিরাপে কি কাজ হবে ? বার বার করে কাশছো – এমন করলে কিন্তু পরের মাস থেকে এইসব ওষুধ আনা বন্ধ করে দেবো – বলে দিলাম ! নিয়ম করে থাকো – তবে তো শরীর সুস্থ থাকবে ! কষ্টটা তুমি পাও না আমি পাই – এগুলো বুঝতে পারো না ! এ মাসে একটা হরলিক্স এনেছি, মাকে বলেছি সকাল-বিকাল এক কাপ করে দিতে ! মা ভুলে গেলেও তুমি যেন চেয়ে নিয়ে খেও ! বুঝলে ! আমি আসছি ।”– এই বলে ছেলে ঘর থেকে চলে গেল ।”
বৃদ্ধ বাবার বুকের মাঝে এক রাশ কথা জমা হয়ে ছিল – সেগুলো একটাও বলা হোল না। সে ভেবেছিল – ছেলেটাকে একটু বুকে জড়িয়ে ধরে, বুকটাকে জুড়োবে – সেটাও হোল না! ছেলেটা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই একটা গভীর যন্ত্রণাভরা দীর্ঘশ্বাস পড়লো বৃদ্ধের – চোখের কোণ থেকে গড়িয়ে পড়লো একফোঁটা গরম জল! … (এই কাহিনীর বাকিটা পরের দিন।)…[ক্রমশঃ]
গুরুমহারাজ একটা চিত্র বর্ণনা করেছিলেন সেটি এখানে বলছি । বলেছিলেন – ” ধর্ – গ্রামের কোন বৃদ্ধ পিতা তার একমাত্র ছেলেকে খুব কষ্টে-সৃষ্টে (কষ্টে-সৃষ্টে অর্থাৎ সংসারের অল্প আয়ের বেশিরভাগটা ওই ছেলের লেখাপড়া, শহরে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে গিয়ে পুরো পরিবারটিকেই খুবই টেনে-টুনে সংসার চালাতে হয়েছে, ইচ্ছা থাকলেও কোনদিনই ভালো খাওয়া বা ভালো কাপড় পড়া হয়ে ওঠেনি, বাইরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া-আসা বা কোন শখ-আহ্লাদ মেটানো হয়ে ওঠেনি) বড় করেছে, লেখাপড়া শিখিয়েছে,– ছেলেটি যাইহোক কিছু একটা চাকুরীও পেয়েছে ৷ মাসান্তে ছেলে একবার বাড়ি আসে, ছেলের বাড়ি আসার দিন সকাল থেকেই বৃদ্ধ বাবা বারবার ছেলের মা-কে মনে পাড়াচ্ছে – ‘আজ খোকা আসছে, তাহলে ওইটা রান্না করো, এইটা কি আমি আনতে যাবো !’ মা বলছেন – ‘সে তো সন্ধ্যার পরে লাস্ট বাসে আসবে, এখন থেকে অস্থির হয়ো না তো ! এখন ঠান্ডা পড়েছে – তোমার অসুস্থ শরীরে হাঁপানির টানটা বেড়েছে – তুমি চুপ করে বসে থাকো ! সব ব্যবস্থা আমি করে নিচ্ছি !’ তবু দুপুরের পর থেকেই বৃদ্ধ পিতা এক-একবার বাড়ির বাইরে গিয়ে দেখে আসছে! বাসস্ট্যান্ড থেকে কেউ ফিরলে তাকে জিজ্ঞাসা করছে – ‘ হ্যাঁরে ! আমাদের খোকা কি বাস থেকে নামলো ?’ ওই ব্যক্তির অসম্মতিসূচক ঘাড় নাড়া দেখে বৃদ্ধ আবার তার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ছে । এইরকম দু’চারবার দেখেই গিন্নি শাসনের সুরে বলে ওঠে – “ওই শুরু হয়ে গেল তোমার ‘আনবাড়ি-টান’ অবস্থা ৷ ছেলে তোমাকে সাধে বকে না – বুঝলে ! তোমার অসুস্থ শরীর নিয়ে বারবার দৌড়ে দৌড়ে বাড়ির বাইরে যাবার দরকারটা কি ! খোকা ঠিক সময়েই আসবে – সে কখন আসে তা কি তুমি জানো না ?” বৃদ্ধ বাবা বলে – ” না, তা নয় ! অনেক সময় তো আগের ট্রেনটাও ধরতে পারে – তাহলে একটু আগে আসবে, তাই খোঁজ নিচ্ছিলাম ।” বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বৃদ্ধ বেশ কয়েকবার ‘ঘর-বার’ করে ক্লান্ত হয়ে বিছানায় বসে হাঁপাতে লাগল – শীতের সন্ধ্যায় একটু শীতল বাতাস লাগলে কাশিটা বাড়ে ! তবু ঘর থেকে মুখ বের করে মাঝে মাঝেই গিন্নীর কাছে খোঁজ রাখছে – ” খোকা কি এলো ?” গিন্নি তো জানে বুড়োর স্বভাব – তাই এক-একবার উত্তর দেয় – এক-একবার দেয় না ! সন্ধ্যায় বৃদ্ধর জপ-তপ হয়ে যাবার ফাঁকেই ছেলে বাড়ি এসেছে – কাঁধের ব্যাগ রেখে, হাত-পা ধুয়ে, জামা-কাপড় পাল্টানো হয়ে গেছে ৷ মা একটু মিষ্টি-জল খাইয়ে চা বসিয়ে দিয়েছে । তারপর মা বললেন – ” খোকা ! চা খেয়ে তোর বাবার ঘরে একবার যাবি ! জানিস তো মানুষটাকে – বড়ই ‘আবাতালে’ মানুষ ! দুপুর থেকেই ছটফট করছে – বারবার বাইরে যাচ্ছে, আর তুই বাস থেকে নামলি কিনা লোকের কাছে খবর নিচ্ছে ! সন্ধ্যার পর কাশিটা শুরু হলো – তাই ঘরে ঢুকে কাঁথামুড়ি নিয়েছে – যা একবার বাবার সাথে দেখা করে আয় ।”
ছেলে তার ব্যাগটা খুলে একটা কাশির পেটেন্ট সিরাপ এবং ডাক্তারের গোটা কতক প্রেসক্রিপশনের ওষুধ – ইত্যাদি নিয়ে বাবার ঘরে গিয়ে বলল, ” বাবা ! তোমার শরীর এখন কেমন ? মা বললো – ঠান্ডাটা আবার লাগিয়েছো ? এমন করলে কাশির সিরাপে কি কাজ হবে ? বার বার করে কাশছো – এমন করলে কিন্তু পরের মাস থেকে এইসব ওষুধ আনা বন্ধ করে দেবো – বলে দিলাম ! নিয়ম করে থাকো – তবে তো শরীর সুস্থ থাকবে ! কষ্টটা তুমি পাও না আমি পাই – এগুলো বুঝতে পারো না ! এ মাসে একটা হরলিক্স এনেছি, মাকে বলেছি সকাল-বিকাল এক কাপ করে দিতে ! মা ভুলে গেলেও তুমি যেন চেয়ে নিয়ে খেও ! বুঝলে ! আমি আসছি ।”– এই বলে ছেলে ঘর থেকে চলে গেল ।”
বৃদ্ধ বাবার বুকের মাঝে এক রাশ কথা জমা হয়ে ছিল – সেগুলো একটাও বলা হোল না। সে ভেবেছিল – ছেলেটাকে একটু বুকে জড়িয়ে ধরে, বুকটাকে জুড়োবে – সেটাও হোল না! ছেলেটা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই একটা গভীর যন্ত্রণাভরা দীর্ঘশ্বাস পড়লো বৃদ্ধের – চোখের কোণ থেকে গড়িয়ে পড়লো একফোঁটা গরম জল! … (এই কাহিনীর বাকিটা পরের দিন।)…[ক্রমশঃ]
