গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ বলেছিলেন – ” ‘নির্ভয়’ নয় ‘অভয়’ হওয়াই উদ্দেশ্য ৷” ‘ভয়’-এর বিপরীত শব্দ ‘নির্ভয়’ – তাই যেখানে ‘নির্ভয়’ সেখানে ‘ভয়’ ব্যাপারটা আবার আসতেও পারে ! কিন্তু একবার ‘অভয়’ হতে পারলে আর ‘ভয়ে’র কোনো অনুপ্রবেশ ঘটে না ! ‘ভয়’ ভস্মীভূত হলে তবেই ‘অভয়’ হওয়া যায় ৷ মা জগদম্বা-কে বলা হচ্ছে “অভয়া”, তিনিই ‘অভয়’ দান করেন । কারণ জগতে _সমস্ত যা কিছু শক্তি, তা তো দেবার ক্ষমতা শুধু ওই শক্তিময়ীর-ই আছে !
‘ভয়’ সাধারণ জীবের অন্যতম একটি জৈব ধর্ম, কিন্তু সাধনজীবনেও ‘ভয়’ একটি বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করে ৷ সাধারণ মানুষের জীবনে যে সমস্ত ভয়গুলি কাজ করে তার মধ্যে অন্যতম হোল_ কোন কিছু হারানোর ভয়, ধন হারানোর ভয়, মান হারানোর ভয়, position হারানোর ভয়, কোন প্রিয় বস্তু হারানোর ভয়, কোন প্রিয় ব্যক্তিকে হারানোর ভয় ! তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে যে ‘ভয়’ কাজ করে তা হলো আপন অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলার ভয় ! সাধকের জীবনের শেষ ধাপে – এই ভয় এসে উপস্থিত হয় ।
আমরা জানি ‘ভয়’কে জয় করার জন্যই সাধকের যত কিছু সাধনা ! কিন্তু সাধন জীবনের প্রতিটি ধাপে ধাপে নানাবিধ ‘ভয়’ এসে হাজির হয় ৷ গুরুমহারাজ আমাদেরকে একবার বলেছিলেন – ” এই যে জগৎ দেখছিস – এটা হলো মা মহামায়া জগৎ ৷ এটা outward manifestation ! আর একটা রয়েছে inward জগৎ – যেটা মা যোগমায়ার জগৎ । সমস্ত জীবজগৎ মা মহামায়ার অধীনে রয়েছে, মহামায়ার মোহিনী মায়ায় সকল জীব মুগ্ধ ! তা সে যত নিম্নতর জীব-ই হোক বা যত উন্নততর জীব-ই হোক ! নানারকম রূপ-রস-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শের নেশায় জীবকুল মত্ত ! এগুলির কোনোটা না কোনোটায় জীবসকল মজায় মজে থাকে, মত্ত হয়ে থাকে ৷
এখানে নিয়মটা হলো – মা মহামায়া সকলকেই এই ধরনের কোনো না কোনো মজার চুষিকাঠি দিয়ে রেখেছেন ৷ যদি কোন জীব একটা চুষিকাঠি ‘ভালো লাগছে না’ বলে ফেলে দেয় – তাহলে ‘মা’ সঙ্গে সঙ্গে অন্য আর একটা চুষিকাঠি ধরিয়ে দেন এবং তাকে আবার ভুলিয়ে রাখেন । অর্থাৎ মা মহামায়া কাউকেই তার এই মায়ার জগৎ থেকে চলে যেতে দিতে চান না ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ উদাহরণ হিসাবে বলেছিলেন – ” যখন ‘খোলা’-য় খই ভাজা হয়, তখন দু-একটা খই ফটাসৃ ফটাস্ করে ফুটে ‘খোলা’ থেকে একেবারে বাইরে গিয়ে পড়ে । বাকিগুলোকে সেই খোলার তপ্ত বালিতে ভাজুনী নাড়াচাড়া করতে করতে ফোটাবার চেষ্টা করে এবং সবাই ফুটে গেলে ছেঁকে ছেঁকে বাইরে ফেলে ৷”
মহামায়ার জগতেও এমনটাই হয়, দু-একজন উচ্চকোটির সাধকই পারেন মহামায়ার সমস্ত বাঁধন ছিন্ন করে বেরিয়ে যেতে অর্থাৎ যোগমায়ার জগতে সরাসরি প্রবেশ করতে ! আর বাকি জীবেরা তপ্ত খোলায় অহরহ জ্বলে পুড়ে মরার মতো এই জগত-রূপ তপ্ত খোলায় মায়া-মোহ, কামনা-বাসনা ইত্যাদি নানান জ্বালায় জ্বলছে ! মা মহামায়া এই বিশ্বজগতে যে মায়ার খেলা পেতেছেন — মা চান না যে, এই জগতের জীব সেই খেলা ছিন্ন করে চলে যায় । তাই তিনি যে কোনো মূল্যে এখানে থাকা জীবদের নানান প্রলোভন দিয়ে দিয়ে আটকে রাখার চেষ্টা করেন । কোন উন্নত সাধক, জাগতিক প্রলোভন সমূহকে যত বেশি বেশি উপেক্ষা করতে থাকে – মা মহামায়া ততো বেশি বেশি আরো ভোগের সামগ্রীর যোগান দেন, যাতে সে আবার আটকে পড়ে !
সাধকের জীবনে এই ‘ভয়’টাই সর্বাপেক্ষা প্রবল । বাউল গানে রয়েছে – ” সেই না নদীর বাঁকে বাঁকে, কাম-কামিনী কুমির থাকে ….. ” – এখানে জীবন নদীর কথা বলা হয়েছে । নদী পার হোতে গেলে নানান বাধা-বিপত্তি-প্রলোভনের জগতের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় । সেখানে বিবেক-হলুদ গায়ে মেখে নদীতে নামলে আর কুমীররূপী ‘ভয়’ কোন কাজ করে না ৷৷ … [ক্রমশঃ]