গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের বলা নানান কথা নিয়ে এখানে আলোচনা হচ্ছিল । বেশ কয়েকদিন ধরে পরমানন্দ ভক্তদের অনেকেই আমাকে অনুরোধ করছিলেন_ গুরুমহারাজের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি যে বিভিন্ন দেব-দেবী বা মহাপুরুষদের কাছ থেকে নেওয়া – সেই প্রসঙ্গে কিছু লিখতে ৷ শ্রী রমেন্দ্র (রমেন চক্রবর্তী) ‘শ্রুতি’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডে এই ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন ৷ কিন্তু তিনি বলেছেন যে, উনি বনগ্রাম আশ্রমের চরৈবেতি কার্যালয়ে বসে স্বামী স্বরূপানন্দ বা অন্যান্যদের করা আলোচনা থেকে যা শুনেছিলেন – সেটাই লিখেছেন ! তার মানে, উনি সরাসরি গুরুমহারাজের কাছে শোনেন নি । কিন্তু গুরুমহারাজ তাঁর শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যাপারে বহুবার এবং বহু জায়গাতেই আলোচনা করেছেন । বনগ্রামে তো করেছেনই – আজিমগঞ্জে করেছেন, দিল্লী বা লখনৌ অর্থাৎ উত্তর ভারতেও এই নিয়ে আলোচনা করেছেন। কিছুদিন আগে সিঙ্গুর থেকে প্রকাশিত বাৎসরিক ম্যাগাজিনে(সম্পাদক _তপন কুমার দে।), আমাদের আশ্রমের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত রবীন্দ্রনাথ হালদার (রবীন হালদার) কবিতার আকারে উনি যতটা শুনেছিলেন _সেটা লিখেছেন৷
আজিমগন্জে গুরু মহারাজ এক একসময় মাসাধিককাল কাটাতেন।তখন অন্তরঙ্গ মুহূর্তে উনি অল্পসংখ্যক ভক্তদের কাছে ওনার নিজের ব্যাপারে বহুকিছু disclose করতেন। আজিমগঞ্জের সৌমেন এবং মিতার সাথে আমার বেশ কিছুদিন আগে এই ব্যাপারে কিছু কথা হয়েছিল ৷ ওরা বলল গুরুমহারাজ আজিমগঞ্জে যখন এই ব্যাপারে আলোচনা করেছিলেন – তখন কোন্ অঙ্গ কার কাছ থেকে নেওয়া তাই শুধু বলেন নি – সেই সেই অঙ্গগুলির বিশেষত্ব কি এবং তাঁর শরীরেই বা এই অঙ্গগুলিকে কেন গ্রহণ কোরতে হোল__তারও বর্ণনা দিয়েছিলেন ! লখ্ণৌর সৌরভ (পুন্ডীরজীর ছেলে, বনগ্রাম আশ্রমের একজন ব্রহ্মচারী) -এর সাথে এই ব্যাপারে একদিন আলোচনা করেছিলাম ৷ আলোচনাটা ছিল গুরুমহারাজের গাত্রবর্ণ নিয়ে ৷ কারণ আমি শুনেছিলাম – গুরুমহারাজ বলেছিলেন, “এবার আমার গাত্রবর্ণ স্বামী বিবেকানন্দের গাত্রবর্ণের মতো এবং তৃষাণের গায়ের রং ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের গায়ের রং-এর মতো” ৷
সৌরভ মহারাজ এ ব্যাপারে আমার মত-টাই সমর্থন করেছিল –! সৌরভ বলেছিল লখ্ণৌতে (অথবা দিল্লিতে) ও যা শুনেছিল, তাতে গুরুমহারাজের মুখ থেকে ওনার শরীরের অঙ্গের বর্ণের কথায় হযরত মুহাম্মদের নাম আসেনি । আমরা এই ব্যাপারটা জানতাম যে, গুরুমহারাজ কখনোই একই আলোচনা দুবার করতেন না ৷ ওনার আলোচনার সময় বিষয়বস্তুর কিছু না কিছু পরিবর্তন, সংযোজন, পরিমার্জন ইত্যাদি হোতোই ! তাই একথা ধরেই নেওয়া যায় যে, গুরুমহারাজের গায়ের রং ছিল স্বামী বিবেকানন্দের গায়ের রং-এর মতো !
তবে একথা ঠিকই – যেটা সবার সাথেই মিলছে (আমার শোনা, সৌরভজীর শোনা, আজিমগঞ্জের ভক্তদের শোনা এবং রমেন বাবুর লেখা) যে গুরুমহারাজের বক্ষদেশ স্বামী বিবেকানন্দের বক্ষদেশের ন্যায় ছিল । এখানে বক্ষদেশ বলতে যে অর্থে শুধু যে বুকের গঠন সুপ্রশস্থ তাই নয়,– এখানে ‘বক্ষ’ বলতে স্বামীজীর হৃদয়বেত্তাকেও বোঝানো হয়েছে ! সর্বজীবের জন্য অসম্ভব ব্যথার বোধ, সমগ্র বিশ্ব তথা বিশ্ববাসীর প্রতি বিগলিত করুণা – যেমনটা স্বামীজীর ছিল – এবার স্বামী পরমানন্দ সেই বেদনা এবং করুণার প্রবাহ বুকে করে এনেছিলেন এবং স্বামীজীর মতই সকলের মঙ্গলের জন্য কাজ করতে করতেই শরীর ছেড়ে দিয়ে অমৃতলোকে বা চিন্ময়লোকে তাঁর নিজের নিত্যসত্তা অবস্থায় ফিরে গেলেন ৷
তবে গুরুমহারাজ ওনার উচ্চতা বা height বোঝাতে বলেছিলেন – ওনার উচ্চতা পৃথিবীর সকল প্রকার জাতির মানুষের গড় height ! অর্থাৎ আফ্রিকার তুৎসু উপজাতিদের গড় উচ্চতাই হল সাত ফুট ; আবার পিগমি, এস্কিমো, ব্যান্ডর – ইত্যাদি জনজাতিদের উচ্চতা তিনফুট থেকে সাড়ে তিনফুট । এইভাবে সমগ্র মানবজাতির গড় উচ্চতাই ছিল স্বামী পরমানন্দের শরীরের উচ্চতা ! উনি একবার বললেন – ” এবার আমার আকৃতি মধ্যমাকৃতি ।” এই ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে উনি কোনো কোনো সময় ওনার শরীরের উচ্চতার সাথে হযরত মুহাম্মদের উচ্চতার সাদৃশ্যের কথা বলেছিলেন। আবার কখনো বলেছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উচ্চতার কথা_যিনিও মধ্যমাকৃতি ছিলেন ।
উনি আরও বলেছিলেন_ যীশুর চক্ষুর সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত ওনার চক্ষু ! এই চোখ করুণার চোখ – যীশুর চোখ দিয়ে সদা-সর্বদা যেন করুণা ঝরে ঝরে পড়তো – তাই বলা হয় ‘করুণার যীশু’ ! এবার মা জগদম্বা গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দকে সাজাবার সময় দিয়েছিলেন সেই করুণার যীশুর চোখ দুটি! নীলচে চক্ষু অথচ স্বচ্ছ এবং গভীর ! গুরু মহারাজ কারো দিকে তাকালে যেন তার ভিতর পর্যন্ত দেখতে পেতেন ! … [ক্রমশঃ]