গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের বলা কথা নিয়ে এখানে আলোচনা হচ্ছিলো । এখন আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল _গুরু মহারাজের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গুলি, মা জগদম্বা কোন্ কোন্ পূর্ব পূর্ব মহাপুরুষ, অবতার এমনকি মহীয়সী মায়েদের কাছ থেকে বেছে বেছে নিয়ে তাঁর প্রিয় পুত্রকে সাজিয়েছিলেন – এইসব কথা ! এ যেন মা-দুর্গার আবির্ভাবের সময় সমস্ত দেবদেবীদের তাঁদের নিজ নিজ সর্বশ্রেষ্ঠ জিনিস দান করে তাঁকে সুসজ্জিত করে তুলেছিলেন – এও যেন তেমনই সজ্জা !
তবে গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এই অঙ্গগুলির গ্রহণের কারণ এবং সেই সব অঙ্গগুলির বিশেষত্ব নিয়েও আলোচনা করেছিলেন । যেমন ধরা যাক্ _গুরু মহারাজের কান ছিল ভগবান বুদ্ধের কাছ থেকে নেওয়া বা বলা যায় তাঁর সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ভগবান বুদ্ধ ছিলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রোতা ! তিনি কথা বলতেন খুবই কম – কিন্তু তিনি সবার কথা শুনতেন, সবার কথার মর্যাদা দিতেন, তা সে রাজন্যবর্গ বা ধনী শ্রেষ্ঠীদের কথাই হোক বা অতি দরিদ্র অথবা অতি সাধারণ মানুষের কথাই হোক ! সেই কান – যে কানে পিঁপড়ের চরণধ্বনিও শোনা যায়, আবার অস্ফুট ব্রহ্ম থেকে প্রথম স্ফুট অবস্থা বা উদ্গীত নাদও শোনা যায় ! তাছাড়া গুরুমহারাজ আরও বলেছিলেন – ভগবান বুদ্ধের কান ছিল পুরোটা শরীরের সঙ্গে জোড়া ! সাধারণত মানুষের কানের লতিটা অর্থাৎ নিচের অংশটা শরীর থেকে ছাড়া থাকে, কিন্তু ভগবান বুদ্ধের তা ছিল না – পুরোটাই জোড়া ছিল । গুরুমহারাজেরও এমনটাই ছিল । গুরুমহারাজ বলেছিলেন – এইরকম জোড়া কান মহাপুরুষের লক্ষণ । মৃৎশিল্পী বা ভাস্কররা এই ব্যাপারটা জানে, তাই ওরা মূর্তি তৈরির সময় পুরো কানকে গালের সাথে আটকে দেয় । গুরুমহারাজের মাথার চুল ছিল ভগবান শ্রীচৈতন্যলীলার অন্যতম প্রধান সহচর নিত্যানন্দ প্রভুর চুলের মতো । নিত্যানন্দ প্রভু ছিলেন আজন্ম ব্রহ্মচারী – অবধূত । ছোট বয়স থেকেই পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছেন – সেভাবে কখনোই শরীরের প্রতি যত্ন নেওয়া হয়নি – তথাপি বৈষ্ণবশাস্ত্রে যে বর্ণনা পাওয়া যায় – তাতে দেখা যায় নিত্যানন্দের কুঞ্চিত ঘন, দীর্ঘ কৃষ্ণবর্ণের চুল খোলা অবস্থায় ঘাড়ের দু-পাশে লুটিয়ে থাকতো এবং চূড়া বাঁধা অবস্থায় বনবাসী রামচন্দ্রের মতো লাগতো ! মহাপ্রভুর-ও কুঞ্চিত কেশদাম ছিল, কিন্তু সন্ন্যাস নেওয়ার পর উনি ওনার সেই সুন্দর কেশ কেটে ফেলেন এবং মস্তক মুন্ডন করে নিয়েছিলেন ৷ আজও গৌর-নিতাই -এর যত মূর্তি রয়েছে – সেখানে ওনাদের মূর্তিতে ঘাড়ের দু-পাশ দিয়ে নেমে আসা কুঞ্চিত কেশগুচ্ছের সৌন্দর্য্য-ই ওনাদের মূর্ত্তির শোভাবর্ধন করে ৷
গুরুমহারাজের মাথার চুলের দিকে তাকিয়েও যে কোনো ভক্ত মনে করতো – উনি বোধহয় রোজই ‘হেয়ার ডাই’ করেন ! আমার-ই সামনে অনেককে জিজ্ঞাসা করতে দেখেছি – ” আচ্ছা গুরুমহারাজ ! আপনি কি চুল ‘ডাই’ করেন ?” গুরুমহারাজ কৌতুহলী হয়ে তাকে বলতেন – ” কেন বলো দেখি !” তারা বলতো – ” না – আপনার চুল এতো কালো এবং এত চিকন – তাই মনে হয় !” আমরা গুরুমহারাজের নানারকম কেশবিন্যাস দেখেছি, আপনারাও তাঁর বিভিন্ন ফোটোতে দেখে থাকবেন – উনি কখনো কখনো মস্তক-মুণ্ডন করতেন, কখনো মায়েদের মতো কুঞ্চিত কৃষ্ণ কেশরাশি একেবারে ওনার চওড়া পিঠ-টাকে আবৃত করে রাখতো ! কখনো দেখতাম একেবারে ordinary সাধারণ hair-Style, আবার কখনো বাংলার রুপালি পর্দার নায়কদের মতো ফোলানো চুলে সামনের দিকটা উত্তম-style, কখনো বলিউডি superstar-দের মতো ঘাড়ে লতানো বড় বড় চুল ! কিন্তু চুলের style যেমনটাই হোক না কেন – চুলগুলিতে রোদ্দুর লাগলে এত চিকচিকৃ করত যে, আমাদের-ই এক এক সময় মনে হোতো যে গুরুমহারাজ বোধহয় কোনো hair-cream ব্যবহার করেন ।৷ … [ক্রমশঃ]