গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বনগ্রাম আশ্রমে বা অন্যত্র তাঁর নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে সময় সময় যেসব আলোচনা করতেন –সেইগুলিই এখানে বলা হচ্ছিলো ! একবার সিঙ্গুর আশ্রমে গুরুমহারাজ ওনার অঙ্গসৌষ্ঠবের বিশেষত্ব নিয়ে কথা বলছিলেন ৷ সব্যদা (সব্যসাচী মান্না) ওনার শরীরের বিভিন্ন negative দিকগুলি তুলে ধরছিলো, আর গুরুমহারাজ সাথে সাথেই সেই যুক্তি খন্ডন করে ওনার নিজস্ব মত প্রতিষ্ঠা করছিলেন ! শেষকালে উনি এটাই সিদ্ধান্ত করে দিলেন যে, pure সোনায় যেমন সুদৃশ্য অলংকার তৈরি হয় না, তাতে খাদ মেশাতে হয় – ঠিক তেমনি যে কোনো সুন্দর মূর্তি তৈরি করতে গেলেও দেখবে শিল্পী শেষকালে গালের উপরের দিকে একটু কালো ফোঁটা দিয়ে দিয়ে দেয় এবং তাতেই ওই মূর্তির সৌন্দর্য যেন আরো বেশি করে খুলে যায় !
এই আলোচনা থেকে আমরা এটাই বুঝতে পেরেছিলাম যে, গুরুমহারাজের শরীরের যে খুঁতগুলি ছিল– তা ওনার শরীরের সৌন্দর্য্য বর্ধন করার জন্যই মা জগদম্বা রেখে দিয়েছিলেন ৷ গুরুমহারাজ, চোখের উপরে ওনার ভ্রু-র কথা বলেছিলেন ! ওনার ভ্রু জোড়াও ছিল না আবার পাতলাও ছিল না, বরং বলা চলে সেটা ছিল একদম স্পষ্ট ! একবার তারকেশ্বরে বা যে কোনো শিবস্থানে বাঁকে করে জল বয়ে নিয়ে যাওয়ার আলোচনা প্রসঙ্গে গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ভক্তের জোড়া ভ্রু-ই হোলো জল বওয়ার বাঁক এবং অশ্রুপূর্ণ নয়নদুটি-ই হল জলপূর্ণ দুটি ঘট ! মানুষ যে পায়ে হেঁটে, সারারাত ধরে কষ্ট করে গঙ্গা থেকে বাঁকে করে দু’ঘট জল ভরে নিয়ে গিয়ে শিবের মাথায় ঢেলে শিবকে প্রসন্ন করতে চায় –এটা বোঝার ভুল ! কৃচ্ছসাধনেও হয়তো কিছুটা ফল হয়, কিন্তু প্রকৃতঅর্থে শিব প্রসন্ন হ’ন_ অশ্রুপূর্ণ ঘট থেকে যখন শিবকে প্রসন্ন করার উদ্দেশ্যে দুটি চোখ থেকে জল ঝরে !
আর একবার গুরুমহারাজ বলেছিলেন – জোড়া ভ্রু যেন ধনুক ! যে ধনুক থেকে নয়নবাণ বা নয়নের দৃষ্টিরূপ শর নিক্ষেপ করা যায় । বৈষ্ণব পদকর্তাগণ শ্রীকৃষ্ণের ভ্রূদ্বয়-কে কন্দর্পের ধনুক হিসাবে বর্ণনা করেছেন – যার দ্বারা পঞ্চফুলশর নিক্ষেপ করতেন গোপিবল্লভ বৃন্দাবনবিহারী !
তবে গুরুমহারাজের ভ্রূ-এর movement-এর ফলে যে নয়নবিক্ষেপ হতো_ তার মধ্যে ছিল অসাধারণ এক শিল্প- শৈলী ! এখনও যদি আপনারা গুরুমহারাজের ভিডিওগুলি লক্ষ্য করেন, তাহলে কিছু কিছু দেখতে পাবেন। কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ওনার হাতের movement, ওনার চোখের movement এমনকি পুরো body movement-ও যদি লক্ষ্য করা যায়, তাহলে দেখতে পাবেন – যেন ওনার সমস্ত শরীরই কথা বলছে ! এ এক অদ্ভুত–অসাধারণ ভঙ্গিমা ! ইতালিতে ওনার সিটিং চলাকালীন ওনার সমস্ত body-র এই অসাধারণ movement দেখে – ওখানে উপস্থিত একজন নামকরা আর্টিস্ট গুরু মহারাজকে বলেছিলেন – “আপনি যে body movement-এর সাহায্যে কথাগুলো পরিবেশন করছেন তাতে আপনার মুখের ভাষা বুঝতে না পারলেও (গুরুমহারাজ ইংরেজিতে আলোচনা করছিলেন, কিন্তু সব ইতালিয়ানরা ইংরেজি ভালো জানে না) আপনার gesture দেখেই আপনার সমস্ত কথা বুঝতে পারছি ! শিল্প-শাস্ত্রের দৃষ্টিতে এটা একটা খুব উচ্চমানের Art ! আপনি এই ভঙ্গিমাগুলি কিভাবে শিখলেন ? India-তে এইরকম কোন ইউনিভার্সিটি বা কোন ইনস্টিটিউট রয়েছে – তাহলে আমিও এই কোর্সটা করতে চাই !”
গুরুমহারাজ হেসে উত্তর দিয়েছিলেন – ” না-না-না – সেরকম কোনো ইনস্টিটিউট্ নাই, আর আমি এগুলি প্রকৃতি থেকে শিখেছি ! কোন পার্টিকুলার ইউনিভার্সিটি নয়, আমি শিখেছি ইউনিভার্সাল ইউনিভার্সিটি থেকে !” … [ক্রমশঃ]