গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ পুরাণ, মহাকাব্যে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনা বা গল্প-কাহিনীর মধ্যে যে বৈজ্ঞানিক, সামাজিক বা আধ্যাত্মিক ইত্যাদি বিভিন্ন তত্ত্ব লুকিয়ে রয়েছে সেইসব নিয়ে যা আলোচনা করতেন – সেইসব কথা এখানে বলা হচ্ছিলো ! আমরা আলোচনা করছিলাম দেবাসুরের মিলিত প্রচেষ্টায় সমুদ্রমন্থনের কাহিনী নিয়ে !
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – সমুদ্রকে বলা হয় রত্নাকর । জগৎসংসাররূপ এই সমুদ্রের গভীরেও নানা মনি-রত্নরূপ অরূপরতন লুকিয়ে আছে, যাকে মন্থন করলে বা সঠিকভাবে খুঁজতে পারলে সেগুলি লাভ করা যায় । এই জগৎসংসারের রত্নরাজি হলো – জ্ঞান, যোগ, ঐশ্বর্য, মাধুর্য এবং এই রত্নধারণকারীরা অর্থাৎ জ্ঞানী, যোগী, মহাত্মা, মহাপুরুষগণ-ই হোল এই পৃথিবীর প্রকৃত রত্ন !
এছাড়াও বাউলগণ বলেছেন – ” যা আছে ভাণ্ডে, তাই আছে ব্রহ্মাণ্ডে!” সুতরাং সাধকের শরীরকে মন্থন করলেও সেখান থেকে একে একে রত্নরাজি উত্থিত হয়, আমরা সেই কথাতেই আসবো, আগে পৌরাণিক ঘটনাটির তত্ত্বরূপটি বলে নিই ! আগেই বলা হয়েছিল রত্নাকর সমুদ্র মন্থন করতে মন্থনদন্ড হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল মন্দার পর্বতকে আর রজ্জু হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল বাসুকি নাগকে ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন, সাধকের শরীররূপ সমুদ্রকে মন্থন করতে সাধককে মেরুদন্ড (মন্দার)-কে অবলম্বন করতে হয় এবং কুলকুণ্ডলিনী (বাসুকি নাগ)-কে জাগ্রত করা হয় । শাস্ত্রে বলেছেন কুলকুণ্ডলিনী মূলাধারে সাড়ে তিন পাক কুন্ডলী পাকিয়ে নিদ্রিত অবস্থায় থাকে ৷
এই পৃথিবীকে বলা হয়েছে দুনিয়া ! “দুই নিয়া”_তাই দুনিয়া ! অর্থাৎ এই পৃথিবী হলো দ্বন্দ্বাত্মক – সবকিছুরই opposite রয়েছে ! যেমন সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, দিন-রাত্রি, আলো-ছায়া, ভালো-মন্দ, ধর্ম-অধর্ম, সুর-অসুর – এইরকম সবকিছু ! একমাত্র শাশ্বত, নিত্য, সনাতন সত্য হলো ব্রহ্ম । দুই-কে জয় করে ‘এক’ তত্ত্বে পৌঁছানোই জীবনের উদ্দেশ্য, যেহেতু সেই ‘এক’ থেকেই বহু হয়েছে, তাই আবার সেই উৎসে ফিরে যাওয়া !
সে যাইহোক, এইভাবেই এই পৃথিবীতে সবসময়েই সুরাসুরের সংগ্রাম চলছে অর্থাৎ মানুষের অন্তর্জগতের সু-ভাব এবং কু-ভাবের মধ্যে সদাসর্বদা সংঘাত চলেছেই, আবার বহির্জগতেও যেকোনো ভাবের বিরুদ্ধভাব সবসময়েই রয়েছে !
কিন্তু এই ভাব-অভাবের মধ্যে, দুই বিপরীতমুখী ছন্দের মধ্যে সাম্য আনার যে চেষ্টা তাই সাধনা ! আর সাধকের সাধনাই হলো সমুদ্রমন্থন ! যেখানে মেরুদন্ডের অভ্যন্তরস্থ সুষুন্মামার্গকে কুলকুণ্ডলিনীর জাগরণের দ্বারা নাড়া দেওয়া, আর সেই নাড়ায় সুষুন্মাস্থিত বিভিন্ন গ্রন্থি বা চক্রগুলিকে একে একে জাগ্রত করা ! এক একটা গ্রন্থি (মোট সাতটি গ্রন্থি রয়েছে – মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মনিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ, আজ্ঞা এবং সহস্রার) যখনই মন্থনের ফলে অর্থাৎ সাধনার ফলে জাগ্রত হয়, তখন সেখানে (ওই গ্রন্থিতে) অবস্থিত পদ্মের পাপড়িগুলি প্রস্ফুটিত হয় ৷ মূলাধার চক্রে বা পৃথ্বীগ্রন্থিতে পদ্ম চতুর্দলবিশিষ্ট – এই চারটি পাপড়ি প্রস্ফুটিত হলে সেখানে চারটি বর্ণ প্রকাশিত হয় এবং পৃথ্বীবীজ ‘লং’ বীজ ধ্বনিত হয় । এরপরই রয়েছে স্বাধিষ্ঠান চক্র বা বরুণ গ্রন্থি । সাধকের সাধনায় যখন এই গ্রন্থি জাগ্রত হয় তখন ষড়দলবিশিষ্ট স্বাধিষ্ঠান চক্রের ছয়টি পাপড়ি খুলে যায় এবং ছয়টি অক্ষর প্রকটিত হয় আর বরুণ বীজ ‘বং’ বীজ ধ্বনিত হয় । এই গ্রন্থিতে উত্তীর্ণ হলে সাধকের চতুর্ভুজ নারায়ণ মূর্তির দর্শন হয় ৷
মনিপুর চক্রে বা মনিপুর পদ্মের দশটি পাপড়ি থাকে এবং সেই পাপড়িগুলি প্রস্ফুটিত হলে দশটি বর্ণ প্রকটিত হয় এবং অগ্নিবীজ ‘রং’ ধ্বনিত হয় । সাধকের কুলকুণ্ডলিনী শক্তি মনিপুর চক্র যখন অতিক্রম করে, তখন তার ত্রিনয়ন বিশিষ্ট রুদ্ররূপী মহাকালরূপ দর্শন হতে পারে । অনাহত চক্রে দ্বাদশদল বিশিষ্ট পদ্ম রয়েছে । সাধকের গভীর সাধনায় যখন এই চক্র ক্রিয়াশীল হয় তখন এর বারোটি পাপড়ি প্রস্ফুটিত হয় এবং বারোটি পৃথক পৃথক অক্ষর বা বর্ণ প্রকটিত হয় আর বায়ুবীজ ‘যং’ ধ্বনিত হয় ৷ এই চক্রের দেবতা ‘ঈশান’।
বিশুদ্ধ চক্র বা ব্যােমগ্রন্থির জাগরণ ঘটলে ষোড়শদল পদ্ম প্রস্ফুটিত হয় অর্থাৎ ষোলটি পাপড়ি খুলে যায় এবং ষোলটি বর্ণমালার বর্ণ প্রকটিত হয় আর ব্যোমবীজ ‘হং’ ধ্বনিত হয় । এই গ্রন্থির দেবতা অর্ধনারীশ্বর সদাশিব । এই গ্রন্থি জয় করতে পারলেই সাধকের সদাশিবের দর্শন হয় !
আজ্ঞাচক্রে থাকে দ্বিদল বিশিষ্ট পদ্ম । আজ্ঞাচক্রে উন্নীত সাধক দর্শন করে ওই দুটি পাপড়িতে দুটি অক্ষর বা বর্ণ প্রকটিত হয়, সেগুলি হোল ‘হ’ এবং ‘ক্ষ’ । আর বেদের প্রথম বীজ ‘ওঁ’-কার ধ্বনিত হয় । এখানকার দেবতা “পরমশিব”!
সহস্রারচক্রে সহস্রদল পদ্ম ৷ এই পদ্মের জাগরণ করতে পারেন যাঁরা – তাঁরাই সমাজে মহাত্মা, মহাপুরুষ, মহামানবরূপে পরিগণিত হ’ন ৷ সাধারণ সাধকের ওই গ্রন্থি ভেদ করা সম্ভব হয় না । এ গ্রন্থিকে উদ্দীপ্ত করতে পারলে সহস্রার থেকে সোমরস নিঃসৃত হয় যা মানবদেহের সমস্ত গ্রন্থি, স্নায়ুমণ্ডলকে সবল রাখে, প্রাণবন্ত করে রাখে ।
এবার সমুদ্র মন্থনের ফলে উঠে আসা – উচ্চৈঃশ্রবা, ঐরাবত, কৌস্তভরতন, লক্ষীদেবী – ইত্যাদির রহস্যটা নিশ্চয়ই বোঝা গেল ! সাধকেরাও যখন কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত করে মেরুদন্ড অভ্যন্তরস্থ সুষুন্মা বরাবর বিভিন্ন গ্রন্থিগুলিকে একে একে যখনই জাগ্রত করতে থাকেন – তখন ঐ সাধকের নানারকম দর্শন হতে থাকে, নানান সিদ্ধিলাভ হতে থাকে, নানান কিছু জাগতিক বিষয় প্রাপ্তি হতে থাকে – এইগুলিই রূপকাকারে উচ্চৈঃশ্রবা, ঐরাবত ইত্যাদি । এসব করতে করতে অবশেষে সহস্রার থেকে নিঃসৃত সোমরসামৃতের ক্ষরণ-ই সমুদ্র মন্থনের ফলে প্রাপ্ত অমৃতের ভাণ্ড !
আর ‘হলাহল’ কিন্তু সমুদ্র থেকে ওঠেনি – ওটা এসেছিল বাসুকির কাছ থেকে ৷ এর অর্থ হোল – জগতে যা কিছু দুঃখ, যন্ত্রণা, অপ্রাপ্তি, ব্যথা, বেদনা, জ্বালা – এগুলি কোনটাই মানুষের মনোজগতে বা প্রাণে কোথাও ছিল না – এগুলি সব এসেছে বাইরে থেকে ! মানুষ নিজের প্রকৃত সত্ত্বাকে অবহেলা করে বাইরের জগতের বিষয় বস্তু, বিষয়, ব্যাক্তিকে প্রাধান্য দিতে গিয়েই এগুলি লাভ করেছে এবং জ্বলে-পুড়ে মরছে ! এই ‘হলাহল’-মুক্ত হতে গেলে নীলকন্ঠ শিব হতে হবে অর্থাৎ অন্ততঃ আজ্ঞাচক্র অতিক্রম করতে হবে । তবেই ত্রিলোচন পরম শিবাবস্থা লাভ হবে আর তৃতীয় নয়নের অগ্নিতে সব দুঃখ-জ্বালা-বেদনা পুড়ে ছাই হয়ে যাবে । আর “নীলকন্ঠ”_ হয়ে গেলে চেতনা আর নিম্নমুখী হবে না,ঐ কন্ঠ পর্যন্ত! কন্ঠ পর্যন্ত না নামলে যে ভগবৎ কথা হবে না! বেদ বলবে কে, আর বেদের ব্যাখাই বা কে করবে!! (ক্রমশঃ)