গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বিভিন্ন সিটিং-এ পৌরাণিক (মহাকাব্যসহ) কাহিনীগুলির যে সমস্ত বৈজ্ঞানিক, সামাজিক বা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করতেন – সেইগুলি এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো । আগের দিন মহাভারতের কর্ণের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল । কর্ণ ছিলেন ‘কানীন পুত্র’ অর্থাৎ ‘কন্যা অবস্থায় জাত পুত্র’। তার মানে হচ্ছে কর্ণের জন্মের সময়ে, কর্ণের মাতা কুন্তীর তখনো বিবাহ হয়নি বা এক কথায় বলা যায় কুমারীকালীন সময়ে কর্ণের জন্ম হয় । মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে যে, কুন্তি সূর্যদেবের কাছ থেকে ‘বরলাভ’ করে তাঁর কৃপায় উনি কর্ণকে পুত্র হিসাবে পেয়েছিলেন । গুরুমহারাজ আলোচনা করেছিলেন – সেই সময়কার সমাজে নারীদের বেশ কিছু স্বাধীনতা ছিল, বিশেষত: স্বামী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বা সন্তান উৎপাদনের নিমিত্ত পুরুষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ! তাছাড়া তৎকালীন সমাজে একটা প্রথা খুবই চালু ছিল – সেটা ছিল “ক্ষেত্রজ সন্তান” উৎপাদন ! অর্থাৎ উন্নত আধার বিশিষ্ট ব্যক্তি (ঋষি, মুনি, দেবতা ইত্যাদি)-র দ্বারা কোনো না কোনো বংশে সন্তান উৎপাদন করিয়ে সেই বংশের genetic ধারাকে উন্নত গুণবিশিষ্ট করে নেওয়া !
এইরকমই ঘটনা ঘটেছিল মা কুন্তির জীবনে । প্রথম জীবনে উনি পরীক্ষামূলকভাবে কোনো সূর্য-উপাসক মহাতেজী ব্যক্তিকে(স্বয়ং সূর্য নয়) জীবনে কামনা করে এই ব্যাপারটির সম্বন্ধে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন । পরবর্তীকালে যখন ওনার পান্ডুর সাথে বিবাহ হলো, তখন দেখা গেল “পান্ডু” ছিল পুরুষত্বহীন । ফলে বংশরক্ষার জন্য, তৎকালীন সমাজের কিছু আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত এবং মহান পাঁচজন মানুষ (দেবতা)-দের দ্বারা পঞ্চপান্ডবের জন্ম দিয়েছিলেন(কারণ তখনকার সমাজে নারীদের এই স্বাধীনতা ছিল) । আজকের সমাজের দৃষ্টিতে বিচার করলে এগুলিকে ব্যভিচার বলা যেতে পারে – কিন্তু আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে হস্তিনাপুর সাম্রাজ্যের সমাজ ব্যবস্থায় এই system-টা সমাজ-স্বীকৃত ছিল ! তাই এগুলিকে সমাজের মানুষ খারাপ তো ভাবতোই না, বরং ওই নারীর উদার মানসিকতাকে খুবই মান্যতা দিতো ! এইজন্যেই “অহল্যা, দ্রোপদী, তারা (বালির স্ত্রী), কুন্তি ও মন্দোদরী”- এই পাঁচজনের বর্তমানের সামাজিক দৃষ্টিতে সতীত্ব না থাকলেও – এদেরকে মহান করা হয়েছে এবং প্রত্যহ এই “পঞ্চকন্যা”-কে স্মরণ করার জন্য শ্লোকও রচনা হয়েছে – “পঞ্চকন্যা স্মরে নিত্যং….”!
কর্ণের “কবজ-কুণ্ডল” নিয়েও গুরুমহারাজ কথা বলেছিলেন ৷ উনি বলেছিলেন এটি কোন তাবিজ-মাদুলি নয় – এটা ছিল বিশেষভাবে নির্মিত “জ্যাকেট”! এখন যেমন ‘বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট’ রয়েছে – ওইটি ছিল আরও উন্নত প্রযুক্তির জ্যাকেট ! আর ‘কুণ্ডল’- মানে কানের ‘দুল’ নয়, ওটাও বিশেষভাবে নির্মিত শিরস্ত্রাণ – যাতে গলা থেকে মাথা পর্যন্ত কোনো আঘাত না লাগে । যোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্রে শিরস্ত্রাণ ও জ্যাকেট ব্যবহার করে, কিন্তু কর্ণের ব্যবহৃত জ্যাকেট এবং শিরস্ত্রাণ ছিল বিশেষভাবে নির্মিত ! তাই অর্জুনের সাথে যুদ্ধের আগে চতুর চূড়ামণি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কৌশল অবলম্বন করে ওই কবজ ও কুণ্ডল কর্ণের কাছ থেকে সরিয়ে ফেলেছিলেন !
মহিষাসুরের কথা বলেছিলেন গুরুমহারাজ ! বলেছিলেন – মাহিস্মতি নগরের সম্রাট ছিল মহিষাসুর । ঐ স্থান বর্তমানে কর্ণাটকের মহীশূর ! নারীদের হাতে অত্যাচারী সম্রাট নিহত হবার ঘটনা ইতিহাসে নতুন কিছু নয় । যখনই কোনো শক্তিশালী রাজা, সম্রাট, জমিদার বা অন্য কেউ নারীদের উপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়েই চলে – তখন নারীশক্তির মধ্যে থেকেই কেউ না কেউ উঠে আসে এবং ওই অত্যাচারীকে ধ্বংস করে ! ইতিহাসে এমন অনেক নজির রয়েছে ! গুরুমহারাজের কাছে শুনেছিলাম হযরত মোহাম্মদের নাতি “হাসান” (হাসান-হোসেন দুই ভাই, যাদেরকে স্মরণ করে মহরম পালন করা হয়) যখন সম্রাট হয়েছিলেন, তখন তাঁকে রাজপ্রাসাদেই বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করেছিল এক নারী ! বেশিরভাগ ভয়ঙ্কর যুদ্ধ যেগুলি মহাকাব্য বা পুরাণে উল্লেখ রয়েছে – সেগুলি সংঘটিত হবার পিছনে অন্যতম ভূমিকা ছিল পুরুষের দ্বারা অত্যাচারিতা কোনো না কোনো নারীর ! কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের জন্য দায়ী দুর্যোধন-দুঃশাসনের দ্বারা লান্ছিতা দ্রৌপদী, রাম-রাবণের যুদ্ধের জন্য দায়ী _লঙ্কেশ্বর রাবনের দ্বারা নিগৃহিতা সীতা ইত্যাদি অনেক উদাহরণ রয়েছে। এমনকি বাইরের দেশের প্রাচীন গ্রন্থ,যেমন _গ্রীক মহাকাব্য “ইলিয়াড– ওডিসি”-তেও দেখা যায় ‘হেলেন’-এর জন্যই ‘ট্রয়ের যুদ্ধ’!
ভারতে প্রথম মুসলিম সাম্রাজ্য কায়েমকারী মোহাম্মদ ঘোরীর ভারতে অনুপ্রবেশের অন্যতম কারণও ছিল ওই অঞ্চলের শক্তিশালী রাজা পৃথ্বীরাজের স্ত্রী সংযুক্তা ! কারণ গান্ধার অঞ্চলের রাজা জয়চাঁদের কন্যা সংযুক্তাকে যদি পৃথ্বীরাজ জোর করে তুলে এনে বিবাহ না কোরতো, তাহলে জয়চাঁদ, অম্ভি ইত্যাদি রাজারা পৃথ্বীরাজের সাথে বেইমানি করে ঘোরীর সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবককে সাহায্য করতো না এবং পৃথ্বীরাজেরও পরাজয় হোতো না ! আর ভারতবর্ষও ধীরে ধীরে বিদেশীদের হাতে চলে যেতো না !
একটা অদ্ভুত ঘটনার কথা শুনেছিলাম গুরুমহারাজের কাছ থেকে – সেটা হোলো মহাভারতে উল্লেখিত শ্রবণকুমারের পিতা-মাতার প্রতি অদ্ভুত ভক্তির কথা ! যে একটা ‘বাঁকে’-র দু’ধারে প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড়, মালপত্র সমেত বৃদ্ধ বাবা ও বৃদ্ধা মাকে দুই দিকে দুটি বড় বড় ঝুড়ির মধ্যে বসিয়ে, কাঁধে করে ভারতবর্ষের বিভিন্ন তীর্থস্থানগুলি দর্শন করাতে নিয়ে যেতেন, তা সেইসব স্থান যতই দুর্গম হোক না কেন ! শোনা যায় মহাভারতের এই ঘটনাটি বালক অবস্থার মোহনদাস গান্ধীকে খুবই প্রভাবিত করেছিল এবং তিনিও এই কাহিনী শ্রবন করার পর থেকে তার পিতা-মাতার প্রতি আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল বা ভক্তি বিগলিত হয়ে পড়েছিলেন ।
যাইহোক, এই হেন ভক্তি-পরায়ণ,নিষ্ঠা-পরায়ণ শ্রবণকুমারের জীবনে মাত্র একবার মতিভ্রম হয়েছিল এবং তিনি তার পিতামাতার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তাদের উদ্দেশ্যে দু’চারটে কটু কথাও বলতে শুরু করেছিলেন ৷ এই ঘটনায় বিস্মিত হয়ে শ্রবণকুমারের পিতা (তিনি একজন জ্ঞানী ব্যাক্তি ছিলেন। তাঁর স্থান-কাল-পাত্র সম্বন্ধে সম্যক ধারণা ছিল।) শ্রবণকুমারকে একটা গাছতলা দেখে ভার নামাতে বলেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করেন – এখন যে স্থানে তারা এসে পৌঁছেছেন সেই স্থানটির নাম কি ? সেই স্থানটি ছিল ময়নগর অর্থাৎ বর্তমান মীরাট (উত্তরপ্রদেশ)! তখন উনি বুঝতে পারলেন – ছেলের এই মতিভ্রমের কারণটা কি – ওখানে তখন কোনো এক মুনি অপমানিত হয়েছিলেন, তাই তিনি ওই স্থানের মানুষদের অভিশাপ দিয়েছিলেন – যাতে “ওখানকার জল পান করলে, খাদ্য খেলে (শ্রবণকুমার ক্লান্ত ছিল বলে জল পান করেছিল) মানুষের মধ্যে থেকে মানবিকতাবোধ চলে যাবে”! শ্রবণকুমারের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল । এইটা বুঝে শ্রবণকুমারের বৃদ্ধ পিতা যখন শ্রবণকুমারকে অনুরোধ করেছিলেন – যাতে সে তাদেরকে ওখানেই ত্যাগ না করে_ একটু বাড়ির দিকে এগিয়ে দেয় । শ্রবণকুমার তাতে রাজি হয়েছিলেন এবং ময়নগরের সীমানা ছাড়িয়ে আসতেই তাঁর মনের আবার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছিল! তখন তিনি পিতা-মাতার কাছে ক্ষমা-প্রার্থনা করে ময়নগরের রাস্তা বাদ দিয়ে, অন্য রাস্তা ধরে পুনরায় তীর্থদর্শনের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়েছিলেন ৷
গুরুমহারাজ বলেছিলেন এখন অবশ্য মীরাট অঞ্চলে ঐ অভিশাপ কার্যকরী নয় – কোন অভিশাপকারীর ক্ষমতা অনুযায়ী অভিশাপ ক্রিয়াশীল থাকে – তারপর নির্দিষ্ট সময় অন্তর (সাধারণতঃ তিন generation, অথবা অধিকপক্ষে সাত generation ! তারপর আবার মহাপ্রকৃতি স্থান বা পাত্রকে(তার উপর অভিশাপ লাগু হয়েছিল) পুনরায় পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেয় । উনি বললেন – ” মীরাটে আমাদের আশ্রমের অনেক ভক্ত রয়েছে । আমি অনেকবার ওখানে গেছি । মীরাটের পরিবেশ পরিস্থিতি এখন ঠিক হয়ে গেছে।” (ক্রমশঃ)
এইরকমই ঘটনা ঘটেছিল মা কুন্তির জীবনে । প্রথম জীবনে উনি পরীক্ষামূলকভাবে কোনো সূর্য-উপাসক মহাতেজী ব্যক্তিকে(স্বয়ং সূর্য নয়) জীবনে কামনা করে এই ব্যাপারটির সম্বন্ধে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন । পরবর্তীকালে যখন ওনার পান্ডুর সাথে বিবাহ হলো, তখন দেখা গেল “পান্ডু” ছিল পুরুষত্বহীন । ফলে বংশরক্ষার জন্য, তৎকালীন সমাজের কিছু আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত এবং মহান পাঁচজন মানুষ (দেবতা)-দের দ্বারা পঞ্চপান্ডবের জন্ম দিয়েছিলেন(কারণ তখনকার সমাজে নারীদের এই স্বাধীনতা ছিল) । আজকের সমাজের দৃষ্টিতে বিচার করলে এগুলিকে ব্যভিচার বলা যেতে পারে – কিন্তু আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে হস্তিনাপুর সাম্রাজ্যের সমাজ ব্যবস্থায় এই system-টা সমাজ-স্বীকৃত ছিল ! তাই এগুলিকে সমাজের মানুষ খারাপ তো ভাবতোই না, বরং ওই নারীর উদার মানসিকতাকে খুবই মান্যতা দিতো ! এইজন্যেই “অহল্যা, দ্রোপদী, তারা (বালির স্ত্রী), কুন্তি ও মন্দোদরী”- এই পাঁচজনের বর্তমানের সামাজিক দৃষ্টিতে সতীত্ব না থাকলেও – এদেরকে মহান করা হয়েছে এবং প্রত্যহ এই “পঞ্চকন্যা”-কে স্মরণ করার জন্য শ্লোকও রচনা হয়েছে – “পঞ্চকন্যা স্মরে নিত্যং….”!
কর্ণের “কবজ-কুণ্ডল” নিয়েও গুরুমহারাজ কথা বলেছিলেন ৷ উনি বলেছিলেন এটি কোন তাবিজ-মাদুলি নয় – এটা ছিল বিশেষভাবে নির্মিত “জ্যাকেট”! এখন যেমন ‘বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট’ রয়েছে – ওইটি ছিল আরও উন্নত প্রযুক্তির জ্যাকেট ! আর ‘কুণ্ডল’- মানে কানের ‘দুল’ নয়, ওটাও বিশেষভাবে নির্মিত শিরস্ত্রাণ – যাতে গলা থেকে মাথা পর্যন্ত কোনো আঘাত না লাগে । যোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্রে শিরস্ত্রাণ ও জ্যাকেট ব্যবহার করে, কিন্তু কর্ণের ব্যবহৃত জ্যাকেট এবং শিরস্ত্রাণ ছিল বিশেষভাবে নির্মিত ! তাই অর্জুনের সাথে যুদ্ধের আগে চতুর চূড়ামণি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কৌশল অবলম্বন করে ওই কবজ ও কুণ্ডল কর্ণের কাছ থেকে সরিয়ে ফেলেছিলেন !
মহিষাসুরের কথা বলেছিলেন গুরুমহারাজ ! বলেছিলেন – মাহিস্মতি নগরের সম্রাট ছিল মহিষাসুর । ঐ স্থান বর্তমানে কর্ণাটকের মহীশূর ! নারীদের হাতে অত্যাচারী সম্রাট নিহত হবার ঘটনা ইতিহাসে নতুন কিছু নয় । যখনই কোনো শক্তিশালী রাজা, সম্রাট, জমিদার বা অন্য কেউ নারীদের উপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়েই চলে – তখন নারীশক্তির মধ্যে থেকেই কেউ না কেউ উঠে আসে এবং ওই অত্যাচারীকে ধ্বংস করে ! ইতিহাসে এমন অনেক নজির রয়েছে ! গুরুমহারাজের কাছে শুনেছিলাম হযরত মোহাম্মদের নাতি “হাসান” (হাসান-হোসেন দুই ভাই, যাদেরকে স্মরণ করে মহরম পালন করা হয়) যখন সম্রাট হয়েছিলেন, তখন তাঁকে রাজপ্রাসাদেই বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করেছিল এক নারী ! বেশিরভাগ ভয়ঙ্কর যুদ্ধ যেগুলি মহাকাব্য বা পুরাণে উল্লেখ রয়েছে – সেগুলি সংঘটিত হবার পিছনে অন্যতম ভূমিকা ছিল পুরুষের দ্বারা অত্যাচারিতা কোনো না কোনো নারীর ! কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের জন্য দায়ী দুর্যোধন-দুঃশাসনের দ্বারা লান্ছিতা দ্রৌপদী, রাম-রাবণের যুদ্ধের জন্য দায়ী _লঙ্কেশ্বর রাবনের দ্বারা নিগৃহিতা সীতা ইত্যাদি অনেক উদাহরণ রয়েছে। এমনকি বাইরের দেশের প্রাচীন গ্রন্থ,যেমন _গ্রীক মহাকাব্য “ইলিয়াড– ওডিসি”-তেও দেখা যায় ‘হেলেন’-এর জন্যই ‘ট্রয়ের যুদ্ধ’!
ভারতে প্রথম মুসলিম সাম্রাজ্য কায়েমকারী মোহাম্মদ ঘোরীর ভারতে অনুপ্রবেশের অন্যতম কারণও ছিল ওই অঞ্চলের শক্তিশালী রাজা পৃথ্বীরাজের স্ত্রী সংযুক্তা ! কারণ গান্ধার অঞ্চলের রাজা জয়চাঁদের কন্যা সংযুক্তাকে যদি পৃথ্বীরাজ জোর করে তুলে এনে বিবাহ না কোরতো, তাহলে জয়চাঁদ, অম্ভি ইত্যাদি রাজারা পৃথ্বীরাজের সাথে বেইমানি করে ঘোরীর সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবককে সাহায্য করতো না এবং পৃথ্বীরাজেরও পরাজয় হোতো না ! আর ভারতবর্ষও ধীরে ধীরে বিদেশীদের হাতে চলে যেতো না !
একটা অদ্ভুত ঘটনার কথা শুনেছিলাম গুরুমহারাজের কাছ থেকে – সেটা হোলো মহাভারতে উল্লেখিত শ্রবণকুমারের পিতা-মাতার প্রতি অদ্ভুত ভক্তির কথা ! যে একটা ‘বাঁকে’-র দু’ধারে প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড়, মালপত্র সমেত বৃদ্ধ বাবা ও বৃদ্ধা মাকে দুই দিকে দুটি বড় বড় ঝুড়ির মধ্যে বসিয়ে, কাঁধে করে ভারতবর্ষের বিভিন্ন তীর্থস্থানগুলি দর্শন করাতে নিয়ে যেতেন, তা সেইসব স্থান যতই দুর্গম হোক না কেন ! শোনা যায় মহাভারতের এই ঘটনাটি বালক অবস্থার মোহনদাস গান্ধীকে খুবই প্রভাবিত করেছিল এবং তিনিও এই কাহিনী শ্রবন করার পর থেকে তার পিতা-মাতার প্রতি আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল বা ভক্তি বিগলিত হয়ে পড়েছিলেন ।
যাইহোক, এই হেন ভক্তি-পরায়ণ,নিষ্ঠা-পরায়ণ শ্রবণকুমারের জীবনে মাত্র একবার মতিভ্রম হয়েছিল এবং তিনি তার পিতামাতার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তাদের উদ্দেশ্যে দু’চারটে কটু কথাও বলতে শুরু করেছিলেন ৷ এই ঘটনায় বিস্মিত হয়ে শ্রবণকুমারের পিতা (তিনি একজন জ্ঞানী ব্যাক্তি ছিলেন। তাঁর স্থান-কাল-পাত্র সম্বন্ধে সম্যক ধারণা ছিল।) শ্রবণকুমারকে একটা গাছতলা দেখে ভার নামাতে বলেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করেন – এখন যে স্থানে তারা এসে পৌঁছেছেন সেই স্থানটির নাম কি ? সেই স্থানটি ছিল ময়নগর অর্থাৎ বর্তমান মীরাট (উত্তরপ্রদেশ)! তখন উনি বুঝতে পারলেন – ছেলের এই মতিভ্রমের কারণটা কি – ওখানে তখন কোনো এক মুনি অপমানিত হয়েছিলেন, তাই তিনি ওই স্থানের মানুষদের অভিশাপ দিয়েছিলেন – যাতে “ওখানকার জল পান করলে, খাদ্য খেলে (শ্রবণকুমার ক্লান্ত ছিল বলে জল পান করেছিল) মানুষের মধ্যে থেকে মানবিকতাবোধ চলে যাবে”! শ্রবণকুমারের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল । এইটা বুঝে শ্রবণকুমারের বৃদ্ধ পিতা যখন শ্রবণকুমারকে অনুরোধ করেছিলেন – যাতে সে তাদেরকে ওখানেই ত্যাগ না করে_ একটু বাড়ির দিকে এগিয়ে দেয় । শ্রবণকুমার তাতে রাজি হয়েছিলেন এবং ময়নগরের সীমানা ছাড়িয়ে আসতেই তাঁর মনের আবার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছিল! তখন তিনি পিতা-মাতার কাছে ক্ষমা-প্রার্থনা করে ময়নগরের রাস্তা বাদ দিয়ে, অন্য রাস্তা ধরে পুনরায় তীর্থদর্শনের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়েছিলেন ৷
গুরুমহারাজ বলেছিলেন এখন অবশ্য মীরাট অঞ্চলে ঐ অভিশাপ কার্যকরী নয় – কোন অভিশাপকারীর ক্ষমতা অনুযায়ী অভিশাপ ক্রিয়াশীল থাকে – তারপর নির্দিষ্ট সময় অন্তর (সাধারণতঃ তিন generation, অথবা অধিকপক্ষে সাত generation ! তারপর আবার মহাপ্রকৃতি স্থান বা পাত্রকে(তার উপর অভিশাপ লাগু হয়েছিল) পুনরায় পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেয় । উনি বললেন – ” মীরাটে আমাদের আশ্রমের অনেক ভক্ত রয়েছে । আমি অনেকবার ওখানে গেছি । মীরাটের পরিবেশ পরিস্থিতি এখন ঠিক হয়ে গেছে।” (ক্রমশঃ)
