গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বিভিন্ন সময়ে আলোচনার সময় পৌরাণিক আখ্যানগুলির যে সমস্ত সামাজিক, বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করতেন – সেইগুলি এখানে বলা হচ্ছিলো । আমরা আগে হিরণ্যাক্ষের কথা বলেছি – এবার হিরণ্যকশিপুর কথা ! গুরুমহারাজ “হিরণ্য” কথাটির উপর জোর দিয়েছিলেন, উনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, হিরণ্য বা স্বর্ণবর্ণ ছিল তখনকার পৃথিবীর তৎকালীন পরিবেশ-পরিস্থিতি । ঋষিরা গল্পাকারে কিছু ঘটনার উপস্থাপনা করে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, এগুলি পৃথিবীর একদম আদিম অবস্থার রূপ বোঝাতে বা তখনকার কোন বিশেষ অবস্থা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছিল । হিরণ্যকশিপুকে যিনি বিনাশ করেছিলেন – তিনিও নৃসিংহ বা নরসিংহ এই প্রতীকের মাধ্যমে জীবের পশু অবস্থা থেকে বিবর্তনে মানুষ অবস্থায় আসার ক্রম-কে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে ! ভারতবর্ষ থেকেই সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান বা যাবতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি ভারতের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল, এইজন্যেই মিশরের পিরামিডের সামনে পশু-মানবীয় মূর্তি ‘স্ফিংস’ রয়েছে ! ইউরোপের গ্রীস বা দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে প্রাচীন শিল্পকলায় মনুষ্য শরীর কিন্তু পশুর মুখ – এমন মূর্তি পাওয়া যায় । সুতরাং ডার‌উইনের থিয়োরিও যে ভারতবর্ষের প্রাচীন গ্রন্থ থেকেই নেওয়া_সেটা বলাই বাহুল্য!
এবার “দৈত্যকুলে প্রহ্লাদে”র কথায় আসা যাক ! ‘প্রহ্লাদ’ এখানে জেনেটিক উৎক্রমণের প্রতীক ! তাই দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ ! মানুষের বিবর্তনে, অনুন্নত চেতনার মানুষ থেকে উন্নত চেতনার মানুষে উন্নীত হবার ক্রম-ই হলো প্রহ্লাদ ! জন্ম থেকেই প্রহ্লাদকে কত পরীক্ষা দিতে হয়েছিল, বারবার তার প্রাণসংকটকাল উপস্থিত হয়েছিল এবং প্রতিবারই এর জন্য দায়ী ছিল তার বাবা হিরণ্যকশিপু ! অসুর থেকে সুরে, disharmony থেকে harmony-তে আসাটাই প্রকৃতির অগ্রগতির ক্রম ! আর এইটাই ওই কাহিনীর মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে ৷
পুরাণাদি শাস্ত্রে আরো এই ধরনের একটি বালক ভক্তের কাহিনী রয়েছে, সেটি হলো – ‘ধ্রুব’! রাজা উত্তান পাদের ছেলে । তাকেও ছোটবেলা থেকেই নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল এবং সেই প্রহ্লাদের মতোই খুব ছোট বয়সে ‘হরি’-র দর্শন লাভ করেছিল । গুরুমহারাজ এই দুজনের কথাই উল্লেখ করেছিলেন ৷ প্রহ্লাদের শিক্ষার জন্য দুজন আচার্য নিয়োগ করা হয়েছিল, তারা হলো শুক্রাচার্যের পুত্র “ষন্ড”ও “অমর্ক”! বাংলায় যে “ষন্ডামার্কা” কথাটি রয়েছে – সেটা এই দুইজনের নাম থেকে এসেছে ! এরা হয়তো একটু বড়োসড়ো চেহারার মানুষ ছিল এবং আচার-ব্যবহারও একটু রূঢ় ছিল ! কিন্তু তারা দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের শিক্ষায় প্রহ্লাদকে শিক্ষিত করতে পারে নি ! কাহিনীতে রয়েছে – ‘ক’ শেখাতে গিয়ে প্রহ্লাদ “কৃষ্ণ” শিখেছিল ! এইসব ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, প্রহ্লাদ পূর্ব থেকেই শিক্ষিত ছিল – এই শিক্ষা পূর্ব পূর্ব জন্মের শিক্ষা !!
‘মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ধ্রুবের ঈশ্বরলাভ’– নিয়ে নারদ প্রশ্ন তুলেছিল ! উত্তরে ভগবান নারদকে ধ্রুবের কঙ্কালের পাহাড় দেখিয়েছিলেন ! এগুলির মাধ্যমে জন্মান্তরের সত্যতা বা প্রমাণের কথাই বলা হয়েছে ৷ একটা জন্মের বিচারে কোন ব্যক্তির বয়সের সঠিক বিচার হয় না বা তার seniority-র মূল্যায়ন হয় না ! জন্ম-জন্মান্তরের বিচারে যে senior – সেই প্রকৃত senior !
গুরু মহারাজ রামায়ণের “অহল্যা উদ্ধারে”র কাহিনীর উল্লেখ করেছিলেন ! উনি বলেছিলেন “অ–হল্যা” অর্থাৎ এমন ভূমি, যে ভূমিতে হলকর্ষণ করা যায় না ! তার মানে হচ্ছে – এমন কোন ভূমি যা অনুর্বর, পাথুরে অঞ্চল – তাই বলা হচ্ছে অহল্যা পাষাণ হয়ে ছিল – রামের পাদস্পর্শে সে আবার জীবন-যৌবন ফিরে পেল অর্থাৎ রামচন্দ্র সেই অনুর্বর পাথুরে ভূমিকে কিভাবে উর্বর করা যায়, কিভাবে চাষযোগ্য করে গড়ে তোলা যায় – তার ব্যবস্থা করেছিলেন এবং ওই অঞ্চলের মানুষের সুস্থ-সুন্দর জীবন যাপনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন ।
রামচন্দ্র সেইসময় সমগ্র ভারতবর্ষ (তৎকালীন ভারতবর্ষ) শুধুমাত্র স্ত্রী এবং প্রিয় ভ্রাতাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছিলেন ! এই পরিভ্রমণ কালে উনি নানা রকম বাধা-বিপত্তি সমস্যার মধ্যে দিয়ে তৎকালীন ভারতবর্ষের তিনটি সুসভ্য সমাজব্যবস্থা অর্থাৎ আর্য্য, দ্রাবিড় এবং কোল(অযোদ্ধার রাজবংশ, সুগ্রীব বা বালির রাজবংশ এবং নিষাদ রাজ গুহকের রাজবংশ) সভ্যতার মধ্যে মিলন-সাধন ঘটিয়েছিলেন শুধুমাত্র বন্ধুত্বের দ্বারা, পারস্পরিক সহযোগিতার দ্বারা ! এমন বন্ধুত্ব যে, রামচন্দ্রকেসীতা উদ্ধারের জন্য অযোধ্যা থেকে সৈন্য আনতে হয়নি, স্থানীয় বন্ধু রাজারাই সৈন্য সাহায্য করেছিল ৷ সর্বোপরি শত্রুপক্ষ লঙ্কাপুরীর শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরাও রামচন্দ্রকে চরমভাবে সাহায্য করেছিল ! এইটাই ভারতবর্ষ ! হিংসার দ্বারা নয়, প্রেমের দ্বারা – ভালোবাসার দ্বারা মানুষের হৃদয় জয় করাটাই আর্য ঋষিদের শিক্ষা !
‘সীতা’ কথাটির অর্থ কৃষি, লাঙ্গল ইত্যাদি । সীতার জন্মবৃত্তান্তেও পাওয়া যায় রাজর্ষি জনকের হলচালনার সময়ে জমি থেকে সীতাকে পাওয়া গিয়েছিল ৷ এইজন্যেই সীতাকে বলা হয় ধরিত্রীর কন্যা ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন– ‘সীতা’ হোল “কৃষিবিদ্যা” ৷ রামচন্দ্র আর্য্যদের উন্নত কৃষিবিদ্যাকে নিয়ে ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানে, অন্যান্য সমাজে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন । লঙ্কার রাজা (তৎকালীন ভারতবর্ষের সংস্কৃতির চাইতে পৃথক সংস্কৃতিবিশিষ্ট রাষ্ট্র ! তাই ওদেরকে ‘রাক্ষস’ বলা হয়েছে । এরা শুক্রাচার্যের দর্শনে বিশ্বাসী ছিল ৷) এই কৃষিবিদ্যা ছলে-বলে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল নিজের রাজ্যে ! দ্রাবিড়ীয় সৈন্যদের সহায়তায় তাদের জন্য‌ই ওই বিদ্যা পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল ৷
রামচন্দ্রের ‘বনবাস’ ব্যাপারটাও এইজন্যেই, নদীতীরবর্তী ফাঁকা জায়গা,যা কোনো বনাঞ্চলের ধারে অবস্থিত, এমন কোনো স্থান থেকেই এই বিদ্যার সঠিক রুপায়ন সম্ভব হয় ! পরবর্তীতে অর্থাৎ রাম রাজা হবার পরেও দেখা যায় যে ‘সীতা’কে পুনরায় তপোবনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল অর্থাৎ সেখানেও নতুন কোন কৃষি গবেষণাগার সৃষ্টি হয়েছিল ।
এইভাবেই মহাকাব্য ও পৌরাণিক কাহিনীগুলির বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিতেন গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ ! যেগুলি শুনে ভারতের প্রাচীন শাস্ত্রগুলির উপর আমাদের শ্রদ্ধা বেড়ে যেতো ৷ এই সমস্ত ব্যাখ্যাগুলি যত তাড়াতাড়ি সমাজে ছড়িয়ে পড়বে এবং Young gernaration গ্রহণ করবে – ততোই ভারতবর্ষের পক্ষে মঙ্গল এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে গোটা পৃথিবীর পক্ষেও মঙ্গল হবে ! (ক্রমশঃ)