গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের বলা বিভিন্ন পৌরাণিক (মহাকাব্য সহ) কাহিনীর ব্যাখ্যা নিয়ে কথা বলা হচ্ছিলো । এখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন লীলার কথা বলা হচ্ছিলো । আগের দিন বলা হয়েছিল শ্রীকৃষ্ণের একেবারে দুগ্ধপোষ্য শিশু অবস্থায় কংসের পাঠানো পুতনা রাক্ষসীর কথা । ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ওই দুগ্ধপোষ্য শিশু অবস্থাতেই পুতনাকে বধ করেছিলেন বা ওই নারী যে ছদ্মবেশী কংসের পাঠানো কোন দুষ্টু মহিলা__ তা সকলের কাছে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন, যাতে করে নন্দরাজা হয়তো ওই পুতনাকে শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল ৷
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সবসময়ই পূর্ণ ! তিনি পূর্ণজ্ঞান নিয়েই জন্মগ্রহণ করেছিলেন । “জন্মগ্রহণ” কথাটা সবার ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয় ঠিকই – কিন্তু সেটা ঠিক নয় ! কারণ সাধারণ মানুষ অর্থাৎ আমাদের মতো অজ্ঞানী মানুষের ক্ষেত্রে বলা উচিত “জন্মানো” বা আমরা পিতা-মাতার দ্বারা জন্ম দেওয়া সন্তান ! কিন্তু একমাত্র ঈশ্বরের বিশেষ শক্তি যখন অবতারিত হয় – তখন তিনি জীব-জগতের প্রতি করুণাবশতঃ জন্ম “গ্রহণ” করেন ! তিনি নিজেই ‘মাতা’ নির্ধারণ করেন বা বলা উচিত তাঁর জন্য আগে থাকতেই ‘মাতা’ নির্বাচন করে রাখা হয় ! তাঁদের জন্মে পিতার ভূমিকা এমন কিছু importent নয় – তবু তাও নির্বাচিত থাকে !
যাইহোক গুরুমহারাজের কথা হচ্ছিলো, উনি বলেছিলেন – ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পূর্ণজ্ঞান নিয়েই জন্মগ্রহণ করেছিলেন । ফলে শিশুবয়সে পুতনা যখন শ্রীকৃষ্ণকে বধ করতে এসেছিল, মাতা যশোদাসহ পরিবারের সকলকে ফাঁকি দিতে পারলেও, পুতনা কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে ফাঁকি দিতে পারেনি ৷ পুরাণে লিখিত রয়েছে যে, পুতনা সুন্দরী গোপিনীর বেশ ধারণ করে এসেছিল এবং শিশু কৃষ্ণকে আদর করার নামে তাকে কোলে নিয়ে কৌশলে স্তন্যপান করানোর চেষ্টা করেছিল । স্তনবৃন্তে মাখানো ছিল ভয়ঙ্কর কালকূট বিষ ! যাতে শিশু স্তন্যপান করতে গেলেই ওই বিষ শিশুর মুখে চলে যাবে এবং শিশুর মৃত্যু হবে ৷
কিন্তু পুতনার এই কৌশল successful হয়নি ! কারণ ওই যে বলা হলো, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জীবনের সবসময়ের জন্যই পূর্ণজ্ঞান বজায় ছিল – তাই তিনি প্রথমেই পুতনা যখন তাঁকে কোলে নিতে চাইলো__ তখনই খুব জোরে জোরে কেঁদে উঠেছিলেন ! গুরুজী বলেছিলেন – শিশুর অন্যতম অস্ত্র হলো “কান্না” ! উনি ওনার নিজের জীবনের কথা উল্লেখ করেই একথা আমাদেরকে বলেছিলেন ! উনি বললেন – ” জানিস ! শিশু সবার ‘কোল’ পছন্দ করে না, অর্থাৎ সবার কাছে যেতে চায় না ! কিন্তু মানুষের শিশুর প্রতি একটা স্বভাব দুর্বলতা রয়েছে, শিশু দেখলেই মানুষ একটু আদর করতে চায় – কোলে না নিলেও একটু গাল টিপে বা চকাস্ করে একটা চুমু খেয়ে আদর করতে চায় ! কিন্তু কোন বয়স্ক মানুষ যখন শিশুকে চুমু খায় – তখন ওই ব্যক্তির দাড়ি বা গোঁফের খোঁচা ওই শিশুর চোখে মুখে লাগে ! আর এতে যে শিশুটির কি ভয়ঙ্কর অসুবিধা হয় _তা সে কি করে প্রকাশ করবে? তাই চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। তার কচি চামড়া ছিঁড়ে যাওয়ার মতো হয় ! এগুলি আমার অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে তোদের বলতে পারছি ! তাছাড়া সাধারণত যে কোনো মহিলা __শিশু দেখলেই কোলে নিতে চায়, কিন্তু সাত্ত্বিক প্রকৃতির শিশু তামসিক প্রকৃতির কোন মহিলার কোলে যেতে পছন্দ করে না ! কারণ ওই ধরণের মহিলার গায়ে একটা বীভৎস বোটকা গন্ধ থাকে – যেটা শুদ্ধসত্ত্ব শরীরের ব্যক্তির(শিশুর) কাছে অসহ্য লাগে ! তাই এইরকম পরিস্থিতি হলেই আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠতাম ! আমার মা ব্যাপারটা বুঝতো, তাই বলতো – ‘আমার ছেলে সবার কোল পছন্দ করে না !’
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল । কৌশলে পুতনা যতবারই শিশু কৃষ্ণকে কোলে নিতে গেছে ততবারই উনি চিৎকার করে কেঁদে ওঠেছিলেন, অর্থাৎ মা-কে জানান দেবার চেষ্টা করেছিলেন যে, ‘এই রমণীকে আমি সহ্য করতে পারছিনা !’ আসলে মানবের শৈশবাবস্থা তো অসহায় অবস্থা ! সে তখন নিজে উঠতে পারে না, কথা বলতে পারেনা, হাত-পায়ের জোর না থাকায় কোনো কিছুর প্রতিবাদ করতে পারে না – তার তখন একমাত্র অস্ত্র বা আত্মরক্ষার উপায় হলো ‘কান্না’ !
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণজ্ঞান থাকলে কি হবে – শিশু শরীরের সীমাবদ্ধতা এবং প্রাকৃতিক অনুশাসনটা তো মেনে চলতে হবে ! আর ওখানেও এটাই হয়েছিল !
ভগবান তাঁর শৈশবের “কান্না” অস্ত্র দিয়ে পুতনাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছিলেন । কিন্তু পুতনা তো trained murderer ! সে শিশুকৃষ্ণকে মারার জন্য সেখানে গেছে – সে এই সবে ভুলবে কেন ? পুতনা কৃষ্ণের কান্না-অস্ত্রকেই capitalise করলো, এবং ক্রন্দনরত গোপালকে মা যশোদা কোলে নেবার আগেই সে নিজের কোলে তুলে নিয়ে শিশুর মুখে তার স্তনবৃন্ত ঢুকিয়ে দিয়ে তাঁকে চুপ করাবার ভান করতে লাগলো । এদিকে স্তনবৃন্তে মাখানো রয়েছে মারাত্মক প্রাণঘাতী কালকূট বিষ – যা একবার পেটে গেলেই অবধারিত মৃত্যু ! এইবার শিশু ভগবান আর কি করেন ! তাঁর মধ্যে অষ্টসিদ্ধি, ষড়ৈশ্বর্য্য বর্তমান, চৌষট্টি সিদ্ধিও বর্তমান – যার মধ্যে ‘সমর কলা’ বা ‘যুদ্ধ কলা’-ও রয়েছে, মার্শাল আর্টের সমস্ত কৌশল তাঁর করায়ত্ত কিন্তু শরীরে তো ততটা জোর নাই ৷ যদিও প্রয়োজনে উনি মহাপ্রকৃতির শক্তিকে নিজের শরীরে আহ্বান করে যেকোনো কাজ করিয়ে নিতে সমর্থ – তবুও সেটাই বা করেন কি করে ? এই জন্য তিনি আচমকা পুতনার স্তনবৃন্ত কামড়ে ধরলেন – সে এমন ‘কামড়’ যে ছাড়াছাড়ির নামটি নাই ! অসহ্য যন্ত্রণায় চিৎকার করে পুতনা তার ছদ্মবেশ খুলে ফেলতে লাগল – ফলে পরিবারের সকলের কাছে তার রাক্ষসী রূপ (তমোগুণসম্পন্না মহিলার রূপ) প্রকট হয়ে গেল এবং তার এই পরিকল্পনা মাঠে মারা গেল ! মা যশোদা তাড়াতাড়ি শিশুকে পুতনার কোল থেকে কেড়ে নিয়ে নিজের কোলে নিয়ে শিশুকে দুধ ধরাতেই কৌশলী শ্রীকৃষ্ণ (যেহেতু শিশু হলেও তাঁর মধ্যে পূর্ণজ্ঞান বর্তমান) মায়ের দুধ দিয়ে তাঁর মুখটা ধুয়ে পরিষ্কার করে সেইটা প্রথমেই ফেলে দিলেন – এইভাবে নিজের মুখ বিষমুক্ত করে নেবার পর নিশ্চিন্তে মাতৃদুগ্ধ পান করতে লাগলেন !”