গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ বনগ্রাম পরমানন্দ মিশন বা অন্যত্র বিভিন্ন সিটিং-এ মহাকাব্যসহ পৌরাণিক কাহিনীগুলির বৈজ্ঞানিক, সামাজিক বা তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করতেন । সেগুলিকেই এক জায়গা করে এখানে পরিবেশন করা হচ্ছিলো।
আমরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন লীলা কাহিনী নিয়ে আলোচনা করছিলাম । গুরুমহারাজ আমাদেরকে বলেছিলেন, রামায়ণের ঘটনাগুলো( রামচন্দ্রের জন্ম বা তাঁর অন্যান্য লীলা) ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় 10 হাজার বছর আগে ! রামচন্দ্র ঘুরতে ঘুরতে (বনবাসকালে) বঙ্গদেশে এসেছিলেন ! এমনকি এসেছিলেন এই বনগ্রামেও! এখন যেখানে পরমানন্দ মিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে_ সেই স্থানে গিয়েছিলেন ! বনগ্রামের বর্তমান মুখার্জি বাড়ির কালীতলাতেও গিয়েছিলেন! তখনও ওই স্থান শক্তিক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত ছিল ।
গুরু মহারাজের কাছে শুনেছিলাম __মহাভারতে বর্ণিত ঘটনাবলী ঘটেছিল, আজ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে ! ভগবান শ্রীকৃষ্ণও বঙ্গদেশে এসেছিলেন! গৌড়বঙ্গের রাজা বাণের কন্যা ঊষার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের নাতি অনিরুদ্ধের বিবাহ নিয়ে একটা অশান্তি সৃষ্টি হয়েছিল ! সেইটা মেটাতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে বঙ্গদেশে আসতে হয়েছিল!
এখনকার অনেক পন্ডিত ব্যক্তির ধারণা রয়েছে যে, প্রাচীনকালের গ্রন্থকারদের ভৌগোলিক জ্ঞান ছিল না ! কিন্তু এই ধারণা ভুল ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন, মহাভারতে যে সমস্ত স্থানের এবং যে সমস্ত জাতির উল্লেখ রয়েছে _সেগুলি বর্তমানের নামের সঙ্গে মিল নাই বলেই সাধারন মানুষ বুঝতে পারেনা যে, তৎকালের প্রায় সমস্ত পৃথিবীর সভ্য জাতিগুলির সাথে, ভারতবর্ষের মানুষের যোগাযোগ ছিল। মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে কুরু বংশের নৃপতিরা, কৃষ্ণের দাদা বলরাম এবং দানবীর কর্ণ পশ্চিমে সিন্ধুদেশ, গান্ধার (বর্তমান আফগানিস্থান), ভগদত্ত নগরী (বর্তমান ইরাকের রাজধানী বাগদাদ), ইরান-তুরান( বর্তমান তুরস্ক), পূর্বতন সোভিয়েত রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন দেশ (কাজাকাস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান ইত্যাদি স্থান)-গুলিতে সেনা-অভিযান করে নিজেদের পছন্দের মানুষকে সেখানকার শাসনকর্তা হিসাবে বসিয়ে এসেছিলেন! এই সব record মহাভারতে রয়েছে!
এছাড়াও গুরুমহারাজ বলেছিলেন স্থলপথে আরো দূরবর্তী দেশগুলোর সাথেও ভারতের যোগাযোগ ছিল! বর্তমান স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলির সাথে ভারতের তৎকালীন রাজাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল! কারণ মহাভারতে রয়েছে উত্তরকুরু (নর‌ওয়ে) থেকে কৌরবদের জন্য, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ঘোড়া সরবরাহ করা হয়েছিল। তাছাড়া রামায়ণের উল্লেখ পাওয়া যায় ময়দানব, মারিচ প্রমুখরা “ময়”–অঞ্চলের লোক ছিল, যা আজকের দক্ষিণ আমেরিকার মেক্সিকো! ওখানে প্রাচীন “মায়া” সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া যায় ! ঐ সমস্ত অঞ্চলে তখন অত্যাধুনিক space-ship তৈরি হোতো। Higher technology-তে ওরাও খুবই উন্নত ছিল ।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হাতে থাকা সুদর্শন চক্র এবং বলরামের লাঙ্গল বা “হল” সম্বন্ধেও অনেক কথা বলেছিলেন গুরুমহারাজ! সেসব কথা যখন শুনেছিলাম তখন ওনার কথা note করে রাখার অভ্যাসটা আমার তৈরি হয়নি ! তাই detail-এ আর বলতে পারবো না, তবে এটা খুবই মনে আছে যে, উনি বলেছিলেন, ওই দুটি ছিল অত্যন্ত আধুনিক অস্ত্র এবং যা voice control দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হোত । ‘হলধারী বলরাম জমি চাষ করে বেড়াচ্ছে’, এমন উল্লেখ মহাভারতে কম‌ই রয়েছে কিন্তু ওনার কাঁধে থাকা যন্ত্রটি নিয়ে উনি লড়াই করেছেন__ মহাভারতে এমন কথা লেখা আছে ! আর তাছাড়া জমি চাষ করার যন্ত্র নিয়ে সবসময় কেউই ঘুরে বেড়ায় না ! ওটার যে অন্য প্রয়োগ ছিল _সেটা একটু চিন্তা করলে সহজেই বোঝা যায়!
শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন চক্র নিয়ে পাশ্চাত্যে প্রচুর গবেষণা হয়েছে । এমনকি বিভিন্ন হলিউড সিনেমায় এই ধরনের যন্ত্রের ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে! কিন্তু প্রকৃত সুদর্শন চক্রের কার্যকারিতার যে বর্ণনা মহাভারতে পাওয়া যায়__ ঠিক তেমনটি কোনো অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের আবিষ্কার এখনো আধুনিক বিজ্ঞানীরা করে উঠতে পারেনি ! গুরু মহারাজ বলেছিলেন,এই যন্ত্রটি সুর্যরশ্মি থেকে শক্তি সংগ্রহ করতে পারতো।
আগেই বলা হয়েছে যে, মুসলমান রাজত্বকালে এবং ইংরেজদের সময়ে ভারতীয় প্রাচীন শাস্ত্রাদিতে অনেক শ্লোক, অনেক কথা বা কাহিনী ইচ্ছা করে তৎকালীন পণ্ডিতদের দ্বারা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান কালের নিন্দুকেরা বেছে বেছে সেই সব উদ্ধৃতি অথবা গল্প-কাহিনীগুলির অবান্তরতার স্বপক্ষে যুক্তি দেখায় । কিন্তু রচনাশৈলী, শব্দের প্রয়োগ বা ব্যবহার ইত্যাদি বিচার করলেই পণ্ডিতেরা বুঝতে পারবে যে, ওইসব শাস্ত্রের কোন্ কোন্ স্থানে শ্লোকগুলি বা কাহিনীগুলি প্রক্ষিপ্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে !
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এদিকের সমস্ত কাজ সেরে যখন দ্বারকা নগরী নির্মাণ করে সেখানে যদুবংশের রাজা হয়ে বসলেন __তখনও কোনো সময়ে তিনি স্বস্তিতে থাকতে পারেননি ! ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অনেকগুলি বিবাহ করেছিলেন এবং তাঁর অনেক ছেলেমেয়ে বা নাতিপুতি ছিল । তাদের নিজেদের মধ্যেই প্রচুর অশান্তি লেগে থাকতো! পাশের রাজ্যের আভীর জাতির লোকদের সাথেও দ্বারকার শত্রুতা ছিল । কৃষ্ণ আভীর রমনীদের কে বিবাহ করেছিলেন, যাতে তাদের মধ্যে সখ্যতা তৈরি হয় । কিন্তু তা হয়নি ! কৃষ্ণের মৃত্যুর পর আভীর দস্যুরা কৃষ্ণ মহীষীদের(আভীর রমণীদের) হরণ করে নিয়ে গিয়েছিল তাদের নিজেদের কমিউনিটিতে!
দ্বারকার কাছেই প্রভাস তীর্থ রয়েছে । সেখানে শ্রীরাধিকার সাথে বৃদ্ধ বয়সের শ্রীকৃষ্ণের শেষবারের মতো সাক্ষাৎ হয়েছিল বলে কোনো কোনো শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে । কিন্তু তাদের মধ্যে যখন সাক্ষাৎ হয়েছিল _ শ্রীরাধিকার তখন সম্পূর্ণ ব্রহ্মজ্ঞানী অবস্থা ! স্থুলে সাক্ষাৎকার হোলেও তাদের মধ্যে বৈখরীতে বা স্থুলে কোনো কথা হয়নি ! যা হয়েছিল তার ‘পশ্যন্তি’ বা ‘পরা’য় !
শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যু নিয়েও কথা বলেছিলেন গুরুমহারাজ ! উনি বলেছিলেন __মৃত্যুর আগে শ্রীকৃষ্ণের গাছে চড়ে বাঁশি বাজানোর গল্পটা ঠিক নয় ! শ্রীকৃষ্ণের তখন বৃদ্ধ বয়স (কারণ সেই বয়সে শ্রীকৃষ্ণের নাতিদের বিবাহ হয়ে গেছিল), ওই বৃদ্ধ বয়সে কেউ গাছে চড়ে না, আর বাঁশিও বাজায় না! যেভাবেই হোক, জ্বরা ব্যাধের তীরের আঘাতে বিষক্রিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল ।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এমনভাবে দ্বারকা নগরীটি সমুদ্রের ধারে নির্মাণ করিয়েছিলেন, যাতে অল্পকালের মধ্যেই ওই নগরী সমুদ্রগর্ভে পতিত হয় ! এখনো সমুদ্রগর্ভে শ্রীকৃষ্ণের নির্মিত দ্বারকা নগরীর চিহ্ন পাওয়া যায়!
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর নিজের বংশের সমস্ত মানুষের ইহকাল পরকালের ভার তাঁর নিজের উপরেই নিয়েছিলেন। তাই শ্রীকৃষ্ণের দেহান্তের পর যদুবংশের লোকেরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে সকলেই মারা পড়েছিল এবং কৃষ্ণ গতি প্রাপ্ত হয়েছিল।