গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ, পরমানন্দ মিশনে বা অন্যত্র বিভিন্ন সিটিং-এ মহাকাব্য সহ বিভিন্ন পৌরাণিক আখ্যান গুলির যে সমস্ত বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করতেন_ এখানে সেই গুলি আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা এর আগে রামায়ণের কিছু ঘটনা নিয়ে এখানে আলোচনা করেছিলাম । আজকে আরো দু-চারটে ঐ ধরনের পৌরাণিক ঘটনার উল্লেখ করা যাক্ !
গুরুমহারাজ বলেছিলেন অগস্ত্য মুনির কথা ! যিনি ছিলেন তৎকালীন যুগের একজন অন্যতম উল্লেখযোগ্য সমাজ সংস্কারক ! তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজগুলির মধ্যে ছিল :–১) কোনো অঞ্চলের সমুদ্রের জল পান করে অত্যাচারী অসুর দমন এবং স্থানীয় জনগণকে তাদের হাত থেকে মুক্ত করা ! _2) ইল্বল ও বাতাপি নামক দুইজন অসুরকে নিধন করা! যারা শত শত নিরীহ পথিকদেরকে মেরে ফেলতো !_3 ) গর্বোন্নত বিন্ধ পর্বতকে জব্দ করে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সূর্যালোক যাতে প্রবেশ করতে পারে _ তার ব্যবস্থা করা! এছাড়াও তিনি আরো অনেক সমাজসেবামূলক কাজ করেছিলেন ! এইবার এইসব কাজ সম্বন্ধে গুরু মহারাজ কি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন _এখন সেই সম্বন্ধে আলোচনা করা যাক্!
গুরু মহারাজ বলেছিলেন_ কোনো মুনি বা ঋষি, যাঁরা অন্তঃপ্রকৃতিকে জয় করেছেন, তাঁরা অনায়াসে বহিঃপ্রকৃতিকেও জয় করতে পারেন ! প্রাকৃতিক যেকোনো বিপর্যয়কে থামিয়ে দিতে পারেন বা তার মোকাবিলা করতে পারেন ! তিনি চাইলে প্রকৃতির যেকোনো system-কে নিয়ন্ত্রণও করতে পারেন ! কিন্তু খুব বেশি প্রয়োজন না হোলে তারা কখনই এই ধরনের শক্তি প্রয়োগ করেন না ! বহু মানুষ বা জীব যখন বিপন্ন হয়ে পড়ে অথবা সৃষ্টির ক্রম যখন যে কোনোভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তখনই তাঁরা এই শক্তির প্রয়োগ ঘটান !
উদাহরণ হিসেবে বলা যায় _শঙ্করাচার্যের দ্বারা ঘটানো একটি সত্য কাহিনীর কথা ! আচার্যদেব তাঁর গুরুর জীবন এবং তাঁর আশ্রমকে বন্যার জলের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য __একটি মাত্র কলসির মধ্যে সমস্ত বন্যার জলকে আবদ্ধ করে ফেলেছিলেন !
গুরু মহারাজ বলেছিলেন _”দুটি কথা আছে একটি ‘প্রযত্নশৈথিল্য’ এবং অপরটি ‘অনন্ত সমাপত্তি মনঃ’! এই দুটির মধ্যে ‘প্রযত্নশৈথিল্য’- সিদ্ধি অর্জন করতে পারলেই প্রকৃতির শক্তির উপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অর্জিত হয় ! এর সাধনপদ্ধতির কথাও বলেছিলেন গুরুজী! প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় সেই স্থানে উপস্থিত হয়ে তাঁর মাঝে গিয়ে ধ্যানের অন্তর্লীন অবস্থায় পৌঁছে _ওই বিপর্যয়ের নির্দিষ্ট vibration-এর সঙ্গে নিজের অন্তঃকরণের vibration টিউনিং করতে পারলেই ওই বিশেষ প্রাকৃতিক শক্তি বা সামর্থ্য ওই সাধকের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে যায়। তখন ওই সাধক ইচ্ছামতো প্রাকৃতিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন _আবার প্রয়োজনে ওই একই প্রাকৃতিক শক্তির প্রকাশ ঘটাতে পারেন বা একই ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারেন ! তাছাড়া প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টির জন্য যে মহাশক্তির প্রয়োজন হয়, সেই বিশাল পরিমাণ শক্তি ওই সাধকের মধ্যে চলে আসে! ফলে তিনি সেই সুবিশাল শক্তির সাহায্যে জগত কল্যাণের নিমিত্তে যেকোনো রকম কার্য সমাধা করতে পারেন!
সুতরাং এতোক্ষণ যে সব কথা বলা হলো, তাতে করে এটা বোঝা যাচ্ছে যে, অগস্ত্য মুনির এক গন্ডুষে সমুদ্রের জল পান করে ফেলার যে কাহিনী অথবা জন্য জহ্নুমুনির গঙ্গার ধারাকে নিজের শরীরে প্রবেশ করানোর কাহিনীগুলির মধ্যেও সূক্ষ্মবিজ্ঞান রয়েছে ! কিন্তু সেই বিজ্ঞানের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের এখনও পরিচয় ঘটেনি ! আর সেইজন্যই ঐ ঘটনার মর্মার্থ ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না ! আর প্রাশ্চাত্য-দর্শন বা বিদেশীয় চিন্তা-অনুসারীরা এইগুলিকে হাস্যকর গালগল্প বলে উপহাসাদি করে যাচ্ছে !
গুরু মহারাজ বলেছিলেন অগস্ত্য মুনি শুধুমাত্র একজন সমাজ-সংস্কারক‌ই ছিলেন না, তিনি তৎকালীন যুগের একজন বিখ্যাত technician বা দক্ষ একজন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন ! তিনি নানান কলাকৌশল প্রয়োগ করে বাঁধ নির্মাণ করে বা অন্যদিকে খাল কেটে হয়তো কোনো অঞ্চলের সাগরের কিছুটা অংশের জলকে আটকে দিয়ে _সেই স্থানকে মানুষের হিতার্থে অন্য কোনো কাজে লাগিয়েছিলেন এবং সেই আবদ্ধ স্থানে প্রাপ্ত সামুদ্রিক মাছ বা অন্যান্য সামগ্রীর সাহায্যে সেই অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতিতে সাহায্য করেছিলেন । এই ভাবেই সমুদ্রের ওই অংশের দ্বারা বিপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করাটাকেই _ সামুদ্রিক অসুরদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করার কাহিনী হিসাবে সৃষ্টি হয়েছিল !
অগস্ত্য মুনির আরেকটি উল্লেখযোগ্য মানবকল্যাণের নিমিত্তে কার্য হোল ইল্বল ও বাতাপি নিধন ! এই দুই অসুর পথচারীদের সর্বস্ব লুট কোরতো এবং তাদের মেরে ফেলতো। কাহিনীটা এমন ছিল যে, ওরা ‘ইচ্ছাধারী-সিদ্ধ’ ছিল অর্থাৎ ওরা ইচ্ছামত যা কিছু সাজতে পারতো ! ওদের একজন ভালোমানুষ সেজে পথচারীদেরকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে তাদের বাড়িতে অতিথি হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করে নিয়ে যেত ! আর অন্য জনকে ছাগল বানানো হোতো! তখনকার দিনে তেমন কোনো যানবাহন ব্যবস্থা ছিলনা । রাস্তাঘাটও উন্নত ছিল না । তাই বেশিরভাগ মানুষ পায়ে হেঁটেই দূরবর্তী স্থানে যাতায়াত কোরতো। ফলে রাত্রে মানুষের বিশ্রামের জন্য কোনো না কোনো স্থানের প্রয়োজন হোতো । এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই ছদ্মবেশি অসুর ভালো ভালো কথা বলে অতিথিদেরকে তাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে যেত ! সেখান আগে থাকতেই তার ভাইটিকে ছাগল বানিয়ে রাখা হোতো । এবার তার মাংস কেটে অতিথিকে ভুরিভোজ খাইয়ে দেওয়া হোতো । খাওয়ার পর যেই প্রথম জন, দ্বিতীয় জনের নাম ধরে ডাকতো __ অমনি সেই অসুর অতিথির পেট চিঁরে বেরিয়ে আসতো । এইভাবে লোকটির মৃত্যু হলে, ওরা দুজনে লোকটির সম্পদ ভাগাভাগি করে নিতো এবং লোকটিকে বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে কোন নির্জন স্থানে পুঁতে দিয়ে আসতো!
শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে অগস্ত মুনি এই দুইজনকেই শায়েস্তা করেছিলেন ! উনিও অতিথি সেজেই সেখানে গিয়েছিলেন এবং অসুররূপী ছাগলের মাংস ভক্ষণ করেছিলেন ! কিন্তু তার উদরের প্রবল অগ্নিতেজে ওই মাংস সাথে সাথেই হজম করে নিয়েছিলেন ! ফলে প্রথম অসুরটি যখন দ্বিতীয়টির নাম ধরে ডাকলো, সেদিন কিন্তু অগস্ত্যের পেট ফেটে ওই ছাগলরুপী অসুর আর বেরোতে পারলো না ! সে মারা পড়ে গেল। আর একজনের অভাবে অন্যজনের শক্তিও নষ্ট হয়ে গেল ! এইভাবেই ওই অঞ্চলের মানুষদেরকে এক চরম সমস্যার হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। অগস্ত্য মুনি!( তাঁর বাকি কাজ ও সেগুলোর ব্যাখ্যা পরের দিন।)