গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ, পরমানন্দ মিশন বা অন্যত্র বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী গুলির আধুনিক ব্যাখ্যা করতেন অর্থাৎ সেগুলির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, সামাজিক ব্যাখ্যা এবং তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করে ওইসব ঘটনাগুলি আমাদেরকে বুঝিয়ে বলে দিতেন __এখানে সেইসব আলোচনাই করা হচ্ছিলো।
আমরা আগের দিন ব্রহ্মা এবং তার কন্যা সন্ধ্যার প্রনয়ের কাহিনী নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে _ঘটনার ব্যাখ্যা না করে অন্য দিকে চলে গিয়েছিলাম ! আজকে প্রথমে সেই ব্যাখ্যাটা করে নেওয়া যাক্! গুরু মহারাজ ‘ব্রহ্মা’ শব্দের অর্থ বলেছিলেন theory of creation বা সৃষ্টিতত্ত্ব ! কোনো কিছু ‘সৃষ্টি’ _ মানেই তার পিছনে ঐ সৃষ্টির কারণ রয়েছে ! এটাকেই “সৃষ্টিকর্তা” হিসাবে বা ব্রহ্মা হিসাবে শাশ্ত্রে বর্ণনা করা হয়েছে ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন _ ‘ যে কোনো সৃষ্টির _ যিনি সৃষ্টিকারী, তিনি অবশ্যই তাঁর সৃষ্টিকে ভালোবাসেন, তাঁর সৃষ্টির প্রেমে পড়ে যান ! এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা ! এর মধ্যে নোংরামি খুঁজে পাওয়ার তো কিছু নাই!’
ভারতীয় এইসব কাহিনীর রূপকটি বুঝতে না পেরে বেশীরভাগ মানুষই শুধুমাত্র স্থুল অর্থটাকে ধরে অশ্লীলতার গন্ধ খোঁজে !
বিদেশী সাহিত্যেও এই পৌরাণিক ঘটনাগুলিকে নিয়ে নানা রকম গল্প কাহিনী রয়েছে ! একটা গল্পের কথা গুরু মহারাজ ভগবান স্বামী পরমানন্দের কাছ থেকে আমরা শুনেছিলাম __একজন বিখ্যাত ভাস্কর, রাজার আদেশে শ্রেষ্ঠ নারী মূর্তি বানানোর order পেয়েছিল ! সে পাথর কেটে কেটে একটার পর একটা সুন্দরী, আরো সুন্দরী, আরো আরো সুন্দরী নারী মূর্তি বানিয়ে চলেছিল ! সে চাইছিল তার মনের মাধুরী মিশিয়ে তার মনোময়ী এক নারীকে তৈরি কোরতে ! অবশেষে একদিন সে successful হোলো, কিন্তু সেই মূর্তি সে কাউকে দিতে পারলো না ! কারণ সৃষ্টিকারী নিজেই সেই মূর্তির দিকে তাকিয়ে এতটাই বিমুগ্ধ হয়ে গেল যে, সে এবার চাইলো সেই মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে ! এইজন্য সে নিরন্তর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানাতে থাকলো ! সে আর ঘর থেকে বেরোতো না, কারো সাথে মিশতো না, এমনকি আর কোনদিন কোনো মূর্তিও সে তৈরি কোরলো না ! সবাই ভাবলো ওই শিল্পী বোধ হয় পাগল হয়ে গেছে ! অবশেষে একদিন ওই বিখ্যাত শিল্পীকে পাওয়া গেল মৃত অবস্থায় ! তার শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম অর্থাৎ ঐ পাথরের ভাস্কর্য __সুন্দরী নারীমুর্তিকে জড়িয়ে ধরে সে মরে পড়ে ছিল!!
গুরু মহারাজ একবার আমাদেরকে বলেছিলেন পৃথিবীর কোনো দেশের এমন কোনো সাহিত্য নাই, যার চরিত্রগুলি ভারতীয় মহাকাব্য বা পৌরাণিক কাহিনীগুলির কোনো না কোনো চরিত্রের সঙ্গে না মেলে ! উনি আমাদের challenge করে বলেছিলেন _’তোরা যে কোনো বিদেশি সাহিত্যের, যে কোনো চরিত্রের কথা বল্ _ আমি আমাদের প্রাচীন শাস্ত্র থেকে মূল চরিত্রটি খুঁজে বের করে দিচ্ছি __যেখান থেকে বিদেশি ওই চরিত্রের চরিত্রায়ন হয়েছে ! ওনার শ্রীমুখ থেকে এইসব কথা শুনে আমরা শুধু অবাকই হোতাম না, আমাদের দেশের প্রাচীন পরম্পরার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত‌ও করতাম।।
গুরু মহারাজ দেবরাজ ইন্দ্রের কথাও বলেছিলেন ! ইন্দ্রিয়দের রাজা ইন্দ্র ! মানুষের শরীরে দশ ইন্দ্রিয় রয়েছে__ পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় (হস্ত,পদ, বাক/মুখ, উপস্থ ও পায়ু ) এবং পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়( চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা এবং ত্বক) ___এই দশ ইন্দ্রিয় কে চালনা করে মন ! মন যখন যে ইন্দ্রিয়ের প্রতি নিবেশিত হয়, তখনই সেই ইন্দ্রিয় সঠিকভাবে কাজ করে, অন্যথায় তার দ্বারা কর্মসম্পাদন হোলেও সেই কর্মের কোনো অনুভূতি জন্মে না ! উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ___কোনো মানুষ যদি ছিপে মাছ ধরে, তখন যে সময় তার ছিপের ফাৎনা নাড়াচাড়া করে অর্থাৎ সে বুঝতে পারে যে মাছে টোপ ধরেছে_ তখন ওই ব্যক্তির সেই ব্যাপারে এতটাই মনঃসংযোগ থাকে যে, পাশ দিয়ে বাই-বাজনা সহকারে বিবাহের শোভাযাত্রা চলে গেলেও সে বুঝতে পারে না বা সেই বর্ণময় শোভাযাত্রা দেখার তার কোনো আগ্রহ তৈরি হয় না ! দাবা, পাশা ইত্যাদি খেলায় মত্ত খেলোয়াড়দের পাশেই কোনো বিপদ ঘটে গেলেও_তারা জানতে পারে না ! এমন কথাও রয়েছে যে, দাবা খেলায় মত্ত এক বৃদ্ধের ছেলেকে সাপে কামড়েছে ! তার স্ত্রী দৌড়ে গিয়ে ব্যস্ত-ব্যাকুল হয়ে সেই কথা বলতে গেছে ___কিন্তু বৃদ্ধটি দাবা খেলায় এতটাই মত্ত যে, সে তার স্ত্রীর কথা শুনে বলেছে__ “কে সাপ! কাদের সাপ ! এই দিলাম কিস্তি ! আর এই মাত!!”
এইসব ঘটনায় বোঝা যায় যে, মন যখন যে ব্যাপারে নিবদ্ধ থাকে, তখন সমস্ত জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলি সেখানেই ক্রিয়াশীল থাকে ! তার বাইরে হাজার ঘটনা ঘটে গেলেও মানুষ সেই সব কিছুর অনুভূতি পায় না !
এমনকি আমরা গুরু মহারাজের কাছে এটাও শুনেছিলাম যে, যৌনতাও মানুষের শরীরে ক্রিয়াশীল হয় __মনের ইশারায় ! মনে আসক্তি না থাকলে মানুষের শরীরে সেক্সের উদ্রেক‌ই হয় না!
যাইহোক, এখন আমরা আবার আমাদের আলোচনায় ফিরে আসি! মনকে বলা হয়েছে “একাদশ ইন্দ্রিয়” বা “ইন্দ্রিয়দের রাজা” ! এই মনই শাস্ত্রোক্ত ইন্দ্র ! ইন্দ্রের আরেক নাম পুরন্দর ! এখানে ‘পুর’ মানে হলো দেহ __দেহের অধিপতি হিসেবে এই নাম _ পুরন্দর !
ইন্দ্রের সহস্র যোনী এবং সহস্র চক্ষুর কথা বলেছিলেন গুরুমহারাজ ! উনি বলেছিলেন_” thousand faculties of mind _এটাই কালিয় নাগের সহস্র ফনা বা ইন্দ্রের সহস্র যোনী ! কোনো ব্যক্তি যখন কোনো বিষয়কে দেখে বা অন্য কোনোভাবে অনুভব করে, উপলব্ধি করে __তখন সে ইন্দ্রিয়সকলকে দিয়েই সেই বিষয়ের রূপ-রস-গন্ধ স্পর্শ ইত্যাদির আস্বাদ উপভোগ করতে চায় ! কিন্তু মন যতক্ষণ না তাতে আসক্ত হচ্ছে ততক্ষণ এই কার্য সমাধা হয় না ! মনে প্রতিনিয়ত এই ধরনের হাজার ভোগাকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়ে চলেছে! তাই সহস্রযোনী ! কিন্তু যখন কোনো সাধকের মন সাধনার দ্বারা বা গুরু-কৃপায় অনাসক্ত হয়, তখনও ওই সাধকের মনে সহস্র বিষয় আসে, কিন্তু তিনি যেন শুধু সবকিছু দেখছেন, চিন্তন করছেন, অনুভব করছেন _ কিন্তু কোনো ভোগাকাঙ্ক্ষা নাই ! শুধুই সবকিছু অবলোকন করেছেন __তাই ইন্দ্র তখন সহস্রচক্ষু !!