গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ ভারতবর্ষের প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে, প্রাচীন ভারতের সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে, প্রাচীন শাস্ত্রাদির বিভিন্ন কাহিনীর বিশেষত্ব সম্বন্ধে – অনেক সময় সিটিং-এ আলোচনা করতেন । আমরা সেইগুলোকে একজায়গা করে এখানে আলোচনা করার চেষ্টা করছিলাম ! এইটা করার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো – গুরুমহারাজ যেভাবে এইসব কথা আমাদের কাছে উপস্থাপনা করতেন রং আমাদের মনে ভারতবর্ষের বা ভারতীয় প্রাচীন পরম্পরা নিয়ে গর্ববোধ করতে শিখিয়েছিলেন, এই লেখাগুলি পড়ে পাঠকদের মনেও যাতে সেইরকম ভাবেই ভারতের প্রাচীন পরম্পরা সম্বন্ধে শ্রদ্ধা জাগে, একটা মর্যাদাবোধ তৈরি হয় ৷
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – প্রাচীন ভারতে দুটি বিপরীতমুখী শক্তিশালী গুরুপরম্পরা ক্রিয়াশীল ছিল । একটি বৃহস্পতি পরম্পরা এবং অপরটি শুক্রাচার্য পরম্পরা ৷ একটি দেব পরম্পরা এবং অপরটি দৈত্য বা অসুর পরম্পরা ! একটা ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল পরম্পরা আর অন্যটা ভোগবাদীতা ও স্বার্থপরতাপূর্ণ পরম্পরা ৷ এই দুটি পরম্পরা কিন্তু সবসময়েই সমাজে রয়েছে । ভোগসর্বস্ব (যারা শুধু নিজের সুখেই সুখী, অপরের কথা ভাবে না এইরকম), স্বার্থবাদী মানুষেরাই অসুর অর্থাৎ শুক্রাচার্যের শিষ্য । অপরপক্ষে বিবেকবান, শ্রদ্ধাবান, ত্যাগব্রতে দীক্ষিতরা, যারা অপরকে সুখী দেখে সুখ পায় – তারা দেবমানব অর্থাৎ দেবগুরু বৃহস্পতির শিষ্য !
প্রাচীন কালের ইতিহাস (শাস্ত্রাদি) ঘাঁটলে শুধুই দেখা যায়, যেখানে দেবাসুরের সংগ্রাম চলছে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেবতারা স্বর্গরাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে এখানে-ওখানে ঘুরছে আর দৈত্য বা অসুরেরা স্বর্গরাজ্য অধিকার করে দেবরাজের সিংহাসনে বসে আছে ! এমনকি দেবতাদের স্ত্রীরাও অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে, তাদেরকে রক্ষা করার দায়িত্ব টুকুও করতে পারেনি ! তারপর দেবতারা একত্রিত হয়ে প্রার্থনা শুরু করতেন – সেই প্রার্থনার ফলস্বরূপ কোন ঐশী শক্তির আবির্ভাব ঘটতো এবং তাঁর দ্বারা ঐ সমস্ত আসুরিক শক্তির সাময়িক বিনাশ সাধন হোত – দেবতারা আবার স্বর্গরাজ্য ফিরে পেতো – আবার স্বর্গ ও মর্ত্যে একটা শান্তির বাতাবরণ তৈরি হোত ।
কিন্তু ওই যে বলা হলো সেই শান্তি ছিল সাময়িক ! কারণ শুক্রাচার্য আবার অসুরদের উপর মৃতসঞ্জীবনী ছিটিয়ে দিয়ে তাদেরকে বাঁচিয়ে তুলতেন ! তারা বেঁচে উঠে পুনরায় শক্তির সাধনা শুরু করত এবং শক্তি লাভ করে পুনরায় ভোগ-ঐশ্বর্য্য লাভের উন্মাদনায় মেতে উঠতো – আবার স্বর্গরাজ্য আক্রমণ করতো ! দেবতারা আবার তাদের রাজ্য, তাদের সুখ-শান্তি সব হারিয়ে আবার তারা সাধনায় মত্ত হতো । আবার কোন দধীচি অথবা কোন ঐশী শক্তি তাদেরকে নিজের রাজ্য ফিরিয়ে দিতো ! গুরুমহারাজ এইসব ঘটনার যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন সেটাই এখন আলোচনা করা যাক্ ।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথও ভারতীয় ঋষিদের শিক্ষা গ্রহণ করে লিখেছিলেন – ” কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক–কে বলে তা বহুদূর ! / মানুষেরই মাঝে স্বর্গ-নরক, মানুষেই সুরাসুর !” ভারতীয় প্রাচীন শাস্ত্রাদিতেও এই একই কথা বলা হয়েছে, বিভিন্ন মহাপুরুষরগণও বলেছেন যে, সত্ত্বপ্রধান মানুষেরাই দেব-মানব এবং তমঃপ্রধান মানুষেরাই দৈত্য বা অসুর ! তবে যেহেতু এই প্রকৃতিতে সদাসর্বদাই ত্রিগুণ বিদ্যমান – তাই যে কোনো ব্যক্তির মধ্যেই সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিনটি গুণ সবসময় থাকে ! মানুষের মধ্যে থাকা কাম, ক্রোধ, ঈর্ষা, হিংসা, লোভ, পরশ্রীকাতরতা, স্বার্থপরতা, পাশবিকতা – এইগুলোই তমোগুণের প্রভাব এবং এইগুলিই মানুষের মধ্যে অসুরবৃত্তি ! অপরদিকে মানুষের মধ্যে থাকা শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালোবাসা, করুণা, মায়া-মমতা, ত্যাগ- বৈরাগ্য ইত্যাদিগুলি-ই মানুষের মধ্যে দেবভাব ! বাইরে যেমন সত্ত্বঃপ্রধান দেবমানবদের সাথে তমঃপ্রধান অসুর মানবদের নিত্য লড়াই লেগেই থাকে, ঠিক তেমনি প্রতিটি মানুষের অন্তঃকরণে ভালোগুণ বা ভালো স্বভাবের সঙ্গে তার অন্তর্জগতের অবগুণ বা মন্দস্বভাবের নিত্য দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে ৷ প্রতিটি মানুষের মনোজগতেও তেমনই সু এবং কু -এর দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে ! সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যেটা হয়, সেটা হলো – মানুষের অন্তর্জগতে যে ‘সু’ এবং ‘কু’-এর দ্বন্দ্ব – তাতে ‘কু’-এর জয় হয় ৷ মানুষ কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, হিংসা-স্বার্থপরতার জগতে ফিরে যায় – তার অন্তর্জগতের ভালো গুণগুলি ঢাকা পড়ে যায় । তার বিবেক সুপ্ত হয়ে যায়, তার সৎ বুদ্ধি লুপ্ত হয়ে যায় !
কিন্তু এই মনুষ্যসমাজেরই যে সমস্ত সদস্য শক্তির আরাধনা করেন (ধ্যান-জপ, সাধন-ভজন করেন), তখন তাঁর অন্তর্জগতে ঐশী শক্তি ক্রিয়াশীল হয়ে যায় ! ফলে ওই সাধকের সুপ্ত বিবেক জেগে ওঠে, জাগ্রত বিবেকের প্রহরায় তার অন্তর্জগতের সমস্ত কালো দূরীভূত হয়ে যায় এবং সেখানে শুধুই আলো ঝলমলিয়ে ওঠে ! সেই মানুষ তখন শুধু যে দেবমানব হয়ে ওঠে তাই নয়, সে দেবতা থেকে ঋষিত্বে উন্নীত হয় ! নিজের ভেতরের বা অন্তর্জগতের অসুর অর্থাৎ অশুভ ভাবনা, অনৈতিক কার্যাবলী করার যে প্রবণতা তার উপর যখন সাধনালব্ধ শক্তিতে জাগ্রত বিবেকের নিয়ন্ত্রণ কায়েম হয়, মানুষের আত্মিক উত্তরণ হয় – তখনই অসুর-বিনাশ হয়, সেই শক্তি-ই মহিষাসুরমর্দিনী ! [ক্রমশঃ]
