গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বিভিন্ন সিটিং-এ ভারতীয় প্রাচীন শাস্ত্রাদি থেকে যে সমস্ত কথা-কাহিনীর উল্লেখ করতেন বা ঐ সব শাস্ত্রাদিতে উল্লিখিত কাহিনী ও চরিত্রগুলির আধুনিক ব্যাখ্যা দিতেন – এখানে সেইসব কথাই বলা হচ্ছিলো ৷
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – শুক্রাচার্যের নীতি যারা গ্রহণ করল তাদেরকেই প্রাচীন শাস্ত্রকাররা রাক্ষস, অসুর, দৈত্য, দানব ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করেছেন । অপরপক্ষে বৃহস্পতির নীতি গ্রহণকারীরাই দেবতা অর্থাৎ দেবমানব ! এই দুই দলের মধ্যে কোন দল শ্রেষ্ঠ – তা জানার একটা পরীক্ষা হয়েছিল ৷ উভয় দলই সৃষ্টিকর্তার ব্রহ্মার দরবারে এর মীমাংসার জন্য গিয়েছিল ৷
ব্রহ্মা উভয় দলকেই বললেন – ” বিচার পরে হবে, আগে খাওয়া-দাওয়া করে সকলে সুস্থ হোক !” সেই মতো উপায় দলের সদস্যরাই স্নানাদি সেরে আহারে বসে পড়লো ! আহার্য পরিবেশিতও হল, সকলে আচমন করে খাবার খেতে উদ্যত হয়েছে – এমন সময় ব্রহ্মা বলে উঠলেন – ” দাঁড়াও ! তোমরা কেউ-ই নিজের হাত মুখে পুরে খাবার গ্রহণ করতে পারবে না ! তা করলেই তোমাদের মস্তক খসে পড়বে !” এই কথা শুনে দৈত্য বা অসুরেরা খুবই বিরক্ত হলো, প্রচণ্ড ক্ষুধার সময় সামনে সাজানো খাবার থাকা সত্ত্বেও তারা কিছুই খেতে পারছে না ! কিছুক্ষণ খাবারের গন্ধ শুঁকে এবং খাবারগুলি ঘাঁটাঘাঁটি করে দৈত্য বা অসুরেরা উঠে চলে গেল ।
অপরপক্ষে দেবতারা ব্রহ্মার কথা শুনে একটু হাসলেন এবং পরক্ষণেই তাঁরা পরস্পর পরস্পরের মুখে খাবার তুলে দিতে শুরু করলেন ৷ এর ফলে সবার খাওয়াও হোলো, আবার সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার নির্দেশ পালনও করা হোলো ৷ এই ঘটনার পর মীমাংসাও হয়ে গেল কারা শ্রেষ্ঠ !
এই গল্পটা বলার পর গুরুমহারাজ আমাদেরকে বলেছিলেন – সমাজের সেই সব মানুষেরাই শ্রেষ্ঠ যারা অপরের কথা ভাবে, অপরকে কিছু দেওয়ার কথা ভাবে ৷ সমাজে সবসময়ই দুই প্রকারের মানুষ রয়েছে – একদল ভোগবাদী এবং অপর দল ত্যাগব্রতী ! ত্যাগব্রতীদেরকে নিয়ে কখনোই কোনো দেশে কোনো সমস্যা সৃষ্টি হয়নি, যত সমস্যা হয়েছে ভোগবাদীদেরকে নিয়ে ! উচ্চ-নীচের ভেদাভেদ, বর্ণভেদ, ধর্মভেদ – এইসব ভেদাভেদ সৃষ্টি করে ভোগবাদী মানুষেরা নিজেদের মধ্যেই লড়াই করতে থাকে ৷ তাছাড়া এই দলের মানুষেরা আরো ভোগ, আরো ঐশ্বর্য, আরো ক্ষমতার মোহে উন্মত্ত হয়ে চরম স্বার্থপর হয়ে ওঠে । নিজেদের ছাড়া বাকিদের কথা তো ভাবেই না বরং বাকি সকলকে বঞ্চিত করে নিজের ভোগ-সামগ্রী, সম্পদ-সম্পত্তি, ঐশ্বর্য-ক্ষমতার পরিমাণ বাড়িয়েই চলে ! এইভাবে সমগ্র পৃথিবী জুড়ে সমগ্র মানব সমাজে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, দরিদ্রশ্রেণী ইত্যাদি নানা শ্রেণীর সৃষ্টি হয়ে থাকে ! এই বিভেদ কখনোই ঈশ্বর-সৃষ্ট নয় – এগুলি সবই মনুষ্যসৃষ্ট !
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – কোনো শুদ্ধসত্ত্ব ব্যক্তি (ত্যাগব্রতী শ্রেণীর মানুষ) হয়তো সারাজীবনে কখনোই কোনদিন পুলিশ স্টেশনে বা থানায় যায় না – কারণ তার কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকে না এবং সে অপরের প্রতি কখনোই কোনো অন্যায় করে না ! অনেক সময় এই ধরনের মানুষেরা বিনা দোষে শাস্তি ভোগ করে থাকে বটে – কিন্তু সেটা রাষ্ট্রের তথা সমাজের অপশাসনের ফল ।
এইভাবে ব্যষ্টি থেকে সমষ্টিতেও একই তত্ত্ব ক্রিয়াশীল । বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশগুলিও শুক্রাচার্যের নীতিকেই গ্রহণ করেছে ৷ তারাও নিজের দেশকে উন্নত করে গড়ে তোলার জন্য বিশ্বের বাকি দুর্বল দেশগুলিকে শোষণ করে, লুণ্ঠন করে ! ব্যষ্টিতেও যা – সমষ্টিতেও তা ! এরফলেই দেশে দেশে যুদ্ধ-হানাহানি-রক্তারক্তি ! পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের বেশিরভাগ মানুষ শুক্রাচার্যের নীতি গ্রহণ করতেই অধিক পছন্দ করে এবং ফলস্বরূপ ভোগবাদী হয়ে পড়ে ! আর এইজন্যই মানবসমাজ এখনও উন্নত হয়ে উঠতে পারছে না ! গুরুমহারাজের ভাষায় _’পৃথিবীর মানবের চেতনা যেন নিতান্ত শিশু অবস্থায় রয়েছে, সবে হামাগুড়ি অবস্থা থেকে সদ্য উঠে দাঁড়িয়েছে !’ ফলে এই যে স্বার্থপরতা, এই যে অপরকে বঞ্চিত করে নিজে সুখী হবার প্রবণতা, সমস্ত দেশকে dominate করে নিজের দেশকে উন্নত করার চেষ্টা – এসবই ছেলেমানুষী !
এইসব করতে গিয়েই আজকে কোনো মানুষই সুখী নয়, কোনো দেশে, কোনো সমাজেই শান্তি নাই ! সবার মধ্যে, সব সমাজে শুধুই অশান্তির বাতাবরণ ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন, “এই যে মানুষের চাহিদা – অপরকে বঞ্চিত করে নিজে সুখী হবার বাসনা, ধন-ঐশ্বর্য্য সঞ্চয় করার বাসনা – এটা যেন, কোনো মানব শরীরের একটা বিশেষ অঙ্গ হঠাৎ করে স্ফীত হয়ে যাওয়া – যা দৃষ্টিকটু, অসামঞ্জস্য এবং রোগগ্রস্ত ! যা কোনমতেই ঐ মানবশরীরের সুস্থতার নিদর্শন নয় ৷” আজকের সমাজ-শরীরও ঠিক তেমনই রোগগ্রস্থ, বিকারগ্রস্ত,অসুস্থ !!! [ক্রমশঃ]