গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ ‘জন্মান্তর বিজ্ঞান’ নিয়ে যে সমস্ত আলোচনা করেছিলেন – এখানে সেই নিয়েই আলোচনা করা হচ্ছিলো । বাঙালী কোন এক সাহিত্যিক আলেকজান্ডারের মুখে কথা বসিয়ে লিখেছিলেন – ” সত্য সেলুকাস ! কি বিচিত্র দেশ এই ভারতবর্ষ !” ভারতবর্ষের প্রাচীনত্ব নিয়ে, এদেশের প্রাচীন সভ্যতা-সংস্কৃতি নিয়ে যখন সমগ্র বিশ্বের মনীষীরা সোচ্চার – নিত্য নতুন গবেষণায় এই সত্যগুলি উঠে আসছে, পরিস্ফুটিত হচ্ছে – তখন এই ভারতবর্ষেরই বেশিরভাগ মানুষ – ভারতের প্রাচীনত্ব, এখানকার সুপ্রাচীন সভ্যতা-সংস্কৃতির ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন ! অদ্ভুতভাবে সেইদিক থেকে নিজেদের মুখটা ঘুরিয়ে অন্যদিকে রেখেছে !
গুরুমহারাজ বলতেন – ভারতে বসবাসকারী খ্রিস্টান, মুসলিমরা কি জেরুজালেম অথবা আরব থেকে আসা লোক ? ওরা তো এই দেশেরই মানুষ ! কোনো সময় সমাজের অত্যাচারে বা রাজশক্তির চাপে অথবা রাজ-অনুগ্রহ লাভের জন্য ধর্মান্তরিত হয়েছিল ! কিন্তু তাতে কি হয়েছে ? সত্যকে অস্বীকার করব কেন ? আমার কিসে মঙ্গল – তা জানা সত্ত্বেও সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখবো কেন ? আরও একদল রয়েছে যারা ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতির-ই লোক – কিন্তু কোনো না কোনো বিদেশী দর্শনে বিশ্বাসী ! তারা ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পড়ে না, স্বামী বিবেকানন্দ পড়ে না বা তাঁদের শিক্ষাকে জীবনে গ্রহণ করে না – তারা ইংল্যান্ডের, জার্মানির, রাশিয়ার, চীনের, ইতালির, ফ্রান্সের বিভিন্ন দার্শনিক বা মনীষীদের লেখা বই পড়ে এবং কথায় কথায় সেখান থেকেই ‘কোটেশন’ ঝাড়ে, সেইসব দার্শনিকদেরকে ‘আদর্শ’ মানুষ বলে মনে করে এবং সেই মোতাবেক নিজেদের জীবনকেও তৈরী করে নেয় ৷
এইভাবেই “বিচিত্র এই দেশ – ভারতবর্ষ” ! আমাদের নিজেদের প্রচুর সম্পদ থাকা সত্ত্বেও, আমরা ভারতবাসীরা পুরোনো ঐতিহ্যের ধনে, প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধনে ধনী হওয়া সত্ত্বেও – কেমন যেন ভিখারীর ন্যায় অপরের কাছে ‘ধন’ যাচঞা করছি, অপরের ধনে নিজেদেরকে ধনী ভাবছি !
আর তাতেই আমাদের কি অহংকার ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে তৎকালীন কলকাতার ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতদের গালে থাপ্পর মেরে মেরে বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন যে, বইপড়া বিদ্যাটা কতটা নগণ্য, কতটা তুচ্ছ ! বিদ্যাসাগরের মতো, বঙ্কিমচন্দ্রের মতো, প্রতাপচন্দ্র মজুমদার,মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, কেশবচন্দ্র সেনের মতো __মহা মহা পণ্ডিতদের বইপড়া বিদ্যা বা পণ্ডিতি যে তুচ্ছাতিতুচ্ছ, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন __পাড়াগাঁয়ের পাঠশালার গন্ডী না ডিঙোনো কৈবর্তদের কালীবাড়ির পুরোহিত “ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ” !
কিন্তু তাতেই বা কি হোলো ? আমাদের চোখ থাকতেও যদি আমরা কানা বা অন্ধ সেজে বসে থাকি – তাহলে কি আমরা দেখতে পাবো ? অতি সম্প্রতি এই যুগের যুগপুরুষ ভগবান পরমানন্দ এই বাংলার বনগ্রামে লীলা করে গেলেন ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের বাহ্যিক প্রকাশের সাথে স্বামী পরমানন্দের চরম পার্থক্য ছিল, কিন্তু অন্ততঃ একটা জায়গায় মিল রেখেছিলেন তিনি, আর তা হোলো – উনিও তথাকথিত প্রাইমারি স্কুলের গন্ডি পেরোন নি ! কিন্তু গুরু মহারাজ শুধুমাত্র দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পন্ডিতমহলই নয়, প্রাশ্চাত্যের উন্নত দেশগুলির পণ্ডিতদেরকেও তাঁর জ্ঞানে, তাঁর প্রেমে, তাঁর অলৌকিক আধ্যাত্মিকতায় মুগ্ধ করে রেখেছিলেন ! তবু এতেও আমরা প্রেসিডেন্সি, যাদবপুর, জে.এন.ইউ -এর ডিগ্রীর উল্লেখ করে গর্বে বুক ফুলিয়ে নিজেদেরকে সমাজের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার বলে মনে করি! অন্যান্য ইউনিভার্সিটির ডিগ্রিধারীরাও কম যায় না – তারাও ট্রেনে, বাসে, চায়ের আড্ডায় তাদের নিজ নিজ জ্ঞান-বুদ্ধি নিয়ে কম ডঙ্কা বাজায় না ! আমরা কজন-ই বা ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, ভগবান পরমানন্দের এই অলৌকিক কাজটির কথা স্মরণ করি – কজনই বা বোঝার চেষ্টা করি যে, বইপড়া বিদ্যা নয়, অপরাজ্ঞান নয়, পরাজ্ঞান-ই প্রকৃত জ্ঞান !
গুরুমহারাজও তাঁর নিজের পূর্ব পূর্ব জীবনের অনেক কথাই বলেছিলেন ৷ তিনি তাঁর পার্ষদদেরও বা তাঁর কাছে দীক্ষাপ্রাপ্ত অনেক গৃহী ভক্তদের পূর্ব পূর্ব জীবন নিয়েও কথা বলেছিলেন ! এমনিতেই তিনি বলতেন – “যে কোনো মানুষ যখন আমার কাছে আসে, তখন আমি তার পূর্ব পূর্ব সাত জন্ম দেখে নিই – তারপর তার মূল্যায়ন করি । এইজন্যেই যে কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে তোদের সাথে আমার মূল্যায়ন মেলে না !” হ্যাঁ, এটা সত্যি কথা ! যে কোনো মহাপুরুষের ক্ষেত্রেই এই ব্যাপারটা পরিলক্ষিত হয় – তাঁরা প্রথম দর্শনেই হয়তো কোনো অতিসাধারণ মানুষকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে বসেন, আবার হয়তো সমাজের কোনো মান্যি-গণ্যি ব্যক্তিকেও বিশেষ পাত্তাই দেননি ! এ বড় অদ্ভুত রহস্য !
গুরু মহারাজ শরীরে থাকতেই, আমি আমাদের মিশনের অনেকের কাছেই শুনেছি_তাদের পুর্ব পুর্ব জন্মের স্মৃতি জাগ্রত হয়েছে ! একজনের (সন্ন্যাসী) মুখে শুনেছিলাম _সে নাকি তার পুর্ব জন্মের বাড়িঘর‌ও দেখে এসেছে!! [ক্রমশঃ]