গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ জন্মান্তর, পুনর্জন্ম, পূর্বজন্ম ইত্যাদি নিয়ে বিভিন্ন সিটিং-এ যেসব কথা বলতেন – সেগুলিই এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। গুরুমহারাজ বলেছিলেন – “এবার আমার এখানে ভিন্ন ভিন্ন পরম্পরার সাধকেরা এসেছে এবং তারা সন্ন্যাসী, ব্রহ্মচারী হিসাবে এই পরমানন্দ মিশনে কাজ করছে !” আর একবার সিঙ্গুরের সব্যসাচী মান্নার জিজ্ঞাসার উত্তরে বলেছিলেন – ” আমার এখানে যারা কাজ করছে – তাদের মধ্যে তুমি যে বিরোধ দেখছো, আমি সেইভাবে দেখি না ! এটা আমার একটা experiment – এবার আমি defence-এর player-দেরকে offence খেলাচ্ছি এবং offence-এর player-দের খেলাচ্ছি defence-এ ! ফলে position-এর রদবদল হওয়ায় ওদের adjustment-এ একটু অসুবিধা হচ্ছে – এই আর কি ! এর থেকে বেশি কিছু নয় !”
গুরুমহারাজ যা বলেছিলেন, তাতে আমরা এটা জেনেছিলাম যে, পরমানন্দ মিশনের সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারীদের মধ্যে অনেকেই যেমন শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ পরম্পরার লোক রয়েছে, তেমনি নিগমানন্দ পরম্পরা, ভোলাগিরি পরম্পরা, ক্রিয়াযোগী পরম্পরা, প্রভৃতি পরম্পরার লোক‌ও রয়েছে ! গুরুমহারাজ এমনও বলেছিলেন – পূর্ব পূর্ব জন্মের অনেক সন্ন্যাসী পরম্পরার পুরুষ এবং নারী এবার গৃহস্থাশ্রমে রয়েছে, আবার অনেকেই রয়েছে যারা পূর্ব শরীরে গৃহী ছিল – এবার সন্ন্যাস আশ্রমে রয়েছে ।
একদিন বনগ্রাম আশ্রমে বিকালের দিকে সিটিং-এ বসে গুরুমহারাজ বললেন – “আমার এখানেই বসে আছে এমন দু-একজনকে দেখছি যারা অন্য কল্পের লোক ! এদের মুক্তিলাভের নিজস্ব কোনো প্রচেষ্টাই নাই !” তার মানে হচ্ছে_ এই পৃথিবীর সুখ-ভোগ-ঐশ্বর্যের মায়া-মোহে আটকে পড়ে ঐ ধরনের বহু মানুষ ! বারবার জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে ঘুরে ঘুরে বেড়াতেই তারা ভালোবাসে । কিন্তু দু-এক ফোঁটা মধু পিয়াসী তৃষ্ণার্ত পথিকের যেমন তার বিনিময়ে সহস্র মৌমাছির হুল-ফোটানোর যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় – ঠিক তেমনি এই জগৎসংসারেও একটু সুখভোগের জন্য মানুষকে ত্রিতাপ (আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক) জ্বালা সহ্য করতে হয় – এর হাত থেকে কোনোমতেই নিস্তার পাওয়া যায় না !
কিন্তু তবু আমরা, মানুষেরা ওই অল্পসুখ ভোগের নিমিত্ত সহস্র মৌমাছির বিষের জ্বালা সহ্য করতেই অধিক ভালবেসেছি! আর সেইজন্যেই জন্ম-জন্মান্তর ধরে জন্ম-মৃত্যুর চক্রেই পড়ে রয়েছি – উত্তরণের কোনো চেষ্টাই করছি না ! আর আমাদের এই চেষ্টার অভাবের জন্যই মহাপুরুষগণ এবং অবতারগণ বারবার শরীর নেন বা নিতে বাধ্য হ’ন – যাতে ওনারা আমাদের মত আলস্য-প্রমাদে মত্ত জড়ত্বপ্রাপ্ত মানুষদেরকে গতিশীল করতে পারেন, তাদেরকে মায়া-মোহের বাঁধন থেকে মুক্ত করে বিষয়মুখী মনকে ঈশ্বরমুখী করে গড়ে তুলতে পারেন !
আজকের আলোচনার শুরুতেই গুরুমহারাজের বলা যে কথা দিয়ে শুরু করা হয়েছিল – সেই কথাতেই ফিরে যাই ! গুরুমহারাজের সঙ্গে এবার ভিন্ন ভিন্ন পরম্পরার মহা মহা সাধকেরা শরীর নিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে উনি ২/৩ জনের নাম করেছিলেন যাঁরা ওনার সাথে পূর্ব পূর্ব শরীরেও লীলাসঙ্গী হিসাবে ছিলেন! এদের মধ্যে উনি নারীশরীরের দু-একজনেরও নাম করেছিলেন ৷ একজন সন্ন্যাসিনীর কথা বলতে গিয়ে বললেন – ” ও একসময়(পূর্ব পূর্ব কোনো শরীরে) নারীশরীর-ই নিয়েছিল এবং ঘোড়ায় চেপে প্রচন্ড যুদ্ধ করেছিল ৷” ওনার নিজেরও একটা শরীরে যুদ্ধ করার কথা বলেছিলেন ! সেই সময় ওনার সহযোগী যে দুজন ছিলেন তাঁরা এবারও বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনেরই ব্রহ্মচারী-সন্ন্যাসী হিসাবে গুরুমহারাজেরই কাজ করছেন । একটা পাহাড়ী জাতির নৃশংসভাবে বাচ্চাদেরকে পুরুষত্বহীন করার প্রাচীন পদ্ধতির বিরোধের জন্য ওনারা তিনজন ঐ পাহাড়ীদের সাথে বা একটা বিশেষ একটা পাহাড়ী পরম্পরার সাথে লড়াই করেছিলেন। সেই যুদ্ধে ওনার সাথীদের একজন বিশ্রীভাবে আহত হয়েছিলেন – উনি তাকে বাম হাতে আগলে রেখে শুধুমাত্র ডানহাতেই লড়াই করে বিরোধীদের পরাস্ত করেছিলেন এবং অনেকগুলি বালককে ঐ নিষ্ঠুর প্রথার হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন ।
আমাদের আশ্রমের (বনগ্রাম পরমানন্দ মিশন) সাথে যুক্ত এমন দু’একজনকে আমি জানি, যাঁদের পূর্ব জীবনে(পূর্ব শরীরে) স্বামী বিবেকানন্দের সাথে সম্পর্ক ছিল বলে তাঁরা মনে করেন। তাঁরা তাদের পূর্ব শরীরের কথা _মানুষজনকে বলে বেশ একটা গৌরবও অনুভব করেন ! [ক্রমশঃ]