শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ ‘জন্মান্তর বিজ্ঞান’ প্রসঙ্গে বিভিন্ন সিটিং-এ যে সমস্ত কথা বলেছিলেন – সেগুলিই এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো ! একবার গুরুমহারাজ কথাপ্রসঙ্গে জয়দীপকে উদ্দেশ্য করে বললেন – ” দ্যাখ্ জয়দীপ ! তুই পূর্ব পূর্ব শরীরে (পূর্ব পূর্ব জন্মে) অনেক ধ্যান-জপ করেছিস্ – কিন্তু তাতে তুই তৃপ্ত হোতে পারিস নি ! তুই ভগবানের সঙ্গ চেয়েছিলি – এবার তাই পেয়েছিস্ ! আর কি চাস্ বল্ !” জয়দীপ অবশ্য কোনো উত্তর দেয় নি – চুপ করেই ছিল ! কিন্তু এই ঘটনাটার উল্লেখ করে আমি এটাই বলতে চাইলাম যে, গুরুমহারাজ তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষজনের (সরাসরি বা আকারে-প্রকারে) পূর্বজন্মের শরীরের কথা বলে – এই বর্ত্তমান শরীরের সঙ্গে সম্পর্কের উল্লেখ করতেন । টগরদাকে বলেছিলেন – ” তুই আমার মানসপুত্র !” মদন মহারাজ (স্বামী চিৎবিলাসানন্দ) এবং উদয় মহারাজ (স্বামী স্বরূপানন্দ) সম্বন্ধে বলেছিলেন – ওরা আমার পূর্বশরীরের প্রিয়জন ছিল ! তৃষাণ মহারাজ (স্বামী পরমেশ্বরানন্দ), পুতুল মা (রামকৃষ্ণপ্রাণা), মুরারী মহারাজ (স্বামী নিস্কামানন্দ) সমন্ধেও গুরুমহারাজ নানা সিটিং-এ অনেক কথাই বলেছিলেন ! ন’কাকাকে বলেছিলেন – “মহাভৈরব” বা “বনগাঁয়ের বুড়োশিব”।
সুতরাং গুরুমহারাজের ভক্তবৃন্দের “জন্মান্তর” নিয়ে কোনো সংশয় নাই এবং থাকার কথাও নয় ! কারণ আমাদের প্রায় সকলেরই এই ব্যাপারে ধারণা স্পষ্ট হয়ে গেছে ! তাছাড়া আমাদের মধ্যে প্রায় সবারই এই ধারণা স্পষ্ট যে, উনি পরমানন্দ শরীরে ঈশ্বরের বিশেষ শক্তিরই অবতরণ । গুরুমহারাজের কাছ থেকে আমরা এটা শিখেছিলাম যে, সাধারণ মানুষের মতো অবতারদের “পুনর্জন্ম”– এই ব্যাপারটা হয় না ! ওটি সম্পূর্ণ পৃথক তত্ত্ব ! সচ্চিদানন্দ সাগরের এক একটা বড় বড় তরঙ্গ বা ঢেউ যেন এক একজন অবতার ! একটা তরঙ্গ সচ্চিদানন্দ সাগরে উঠছে, সেটা অনেক উঁচু হয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে, উপকূলভাগের অনেকটা অঞ্চলকে প্লাবিত করছে – তারপর আবার ফিরে যাচ্ছে ওই সচ্চিদানন্দ সাগরেরই বুকে । তারপর হয়তো আবার একটা ঐরূপ বড় তরঙ্গ বা আরও বড় সুনামির ফলে সৃষ্ট আরো বড় তরঙ্গ সচ্চিদানন্দ সাগরে উঠছে এবং তা আরো উঁচু হয়ে – আরো বেশি উপকূলভাগকে প্লাবিত করছে – তাই বলে কখনই বলা যায় না পূর্বের তরঙ্গটিই সাগরে মিশে গিয়ে ওইটিই আবার নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে ! কিন্তু তরঙ্গগুলি তত্ত্বতঃ একই ! একই সচ্চিদানন্দ সাগরের পৃথক-পৃথক তরঙ্গ – এই যা তফাৎ ৷ সাধারণ জীব যেন ওই সচ্চিদানন্দ সাগরেরই বুদ্বুদ ! সাধারণ জীবের স্মৃতি থাকে না, সে জানেনা যে সে স্বরূপতঃ সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মই ! কিন্তু অবতার পুরুষদের সদাসর্বদা সেই ‘বোধ’ বিদ্যমান থাকে – এটাই মূল পার্থক্য ! নিজে জানেন বলেই – অপরকে জানাতে পারেন, নিজের ‘বোধ’ রয়েছে বলেই বাকিদেরকে বোধের রাজ্যে পৌঁছে দেন ৷
আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার থাকে – যা কামনা-বাসনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, চাওয়া-পাওয়ার দ্বারা তৈরি হয় । এইটাই একজন্ম থেকে অন্যজন্মে অর্থাৎ পরবর্তী শরীরে সঞ্চারিত হয় ৷ আমাদের মনোজগতের ওই কামনা-বাসনার অন্ত হয় না বলেই আমাদের জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ঘুরে বেড়ানোও শেষ হয় না ! যেদিন কঠোর সাধনার দ্বারা কোনো সাধক আজ্ঞাচক্রে স্থিত হবে অথবা কোনো মহাপুরুষের সান্নিধ্যে এসে, তাঁর কৃপায় এগুলো থেকে মানুষ মুক্ত হবে – তখনই মানুষের জন্ম-মৃত্যুর চক্রের এই অসহায় আবর্তন বন্ধ হবে । কিন্তু অবতারপুরুষ বা উন্নত মহাপুরুষদের এই ধরনের কামনা-বাসনা সঞ্জাত কোন সংস্কার থাকে না – তাই তাদের জন্ম-মৃত্যুর যে সাধারণ চক্র, তাতে পড়তে হয় না ৷ তাঁরাও শরীর ধারণ করেন – কিন্তু অন্য নিয়মে ! জগতের প্রয়োজনে, মানবজাতির কল্যানের জন্য যখন যেখানে প্রয়োজন – মা জগদম্বার (মহাবিশ্ব প্রকৃতি) ইচ্ছায় তাঁরা তখন সেখানেই শরীর ধারণ করে থাকেন ৷ এখানে দেশ-কাল-পাত্রের কোন সীমারেখা থাকে না । তবে অবতার পুরুষ এবং যোগসিদ্ধ নিত্যমুক্ত মহাপুরুষগণের‌ও শরীর ধারণের নিয়ম আলাদা! যোগসিদ্ধ মহাপুরুষগণ আলাদা identity বজায় রাখেন শুধুমাত্র জীবকল্যান বা জগৎকল্যানের জন্য‌ই! তাঁদের এই জগৎ থেকে কোনো চাওয়া পাওয়াই নেই!
এমনও গুরু মহারাজ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, যারা ভিন্ন ভিন্ন নামে ইউরোপে ‘নবজাগরণ’ ঘটিয়েছিল, তারাই ১০০ বা ২০০ বছর পরে, ভারতবর্ষের প্রাক স্বাধীনতা কালে (অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের আগে বা just পরে) শরীর নিয়ে – এখানকার মানুষের চেতনার উত্তরণে সাহায্য করেছিল ৷
আমরা সাধারন মানুষেরা তো সেই অর্থে – বোকা-আহাম্মক ! এই মহাবিশ্বপ্রকৃতির বা মা জগদম্বার লীলা-রহস্যের কিছু না বুঝেই “অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী”- হয়ে শুধুই বৃথা তর্ক-বিতর্ক করে মরি । এসব না করে যদি ভারতীয় ঋষি-মহাত্মা-মহাপুরুষদের শিক্ষা জীবনে গ্রহণ করে একটু অন্তর্মুখী হই – তাহলে নিজে নিজেই অনেক রহস্য জানতে পারবো এবং অন্তরেই শান্তির সন্ধান পাবো ।৷