গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ “জন্মান্তরবাদ”-কে “জন্মান্তরবিজ্ঞান” হিসাবে আমাদের সকলের কাছে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ৷ এখানে সেইসব আলোচনার কিছু কিছু অংশ (যতটা আমার স্মৃতিতে রয়েছে) পরিবেশন করার চেষ্টা করা হচ্ছিলো । “গুরুমহারাজের কথা অমৃত সমান”– এটা তো ধ্রুব সত্য কথা ! তাই তাঁর শ্রীমুখ নিঃসৃত যে কোনো কথাই মানুষের মধ্যে নতুন করে শক্তি যোগায়- সাহস যোগায়- অজ্ঞানতা দূর করে, জ্ঞানের নির্মল আলোয় মানুষের মনোজগতকে প্লাবিত করে – সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই ৷ এছাড়াও এইসব আলোচনাগুলি পুনঃ পুনঃ উপস্থাপনা করার আর একটা উদ্দেশ্য হোলো – বিদেশাগত কিছু ধর্মমত ও কিছু দর্শন এবং উপনিবেশিক ইউরোপীয়দের শেখানো কিছু শিক্ষা – দীর্ঘদিন ধরে ভারতবাসীর একাংশের মনে দৃঢ়মূল হয়ে এমনভাবে গেড়ে বসেছে যে, তারা ভারতবর্ষের প্রাচীনত্ব, এর গৌরব, এর মহিমার কথা – এই ভারতবর্ষ-ই যে সমস্ত ধর্মমতের, সমস্ত দর্শনের, সমস্ত শিক্ষার জনক বা জননী – সেইসব কথা বেমালুম ভুলে বসে আছে ! ফলে কাঞ্চন ফেলে কাঁচকে ধরার মতো, সুধা ফেলে সুরার ন্যায় পানীয়তে আসক্ত হবার মতো – একটা করুণ পরিস্থিতির শিকার আমাদেরই দেশবাসীর একটা বড় অংশ !
এটা বড়ই যন্ত্রণার ! বিভিন্ন মহাপুরুষগণ এদেশে বারবার জন্মগ্রহণ করে, তাদের নিজেদের জীবনকে নিংড়ে নিংড়ে, ক্ষতবিক্ষত করে__ ভারতবর্ষের মহিমাকেই বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন, ভারতবর্ষের প্রাচীন সংস্কৃতি-সাহিত্য, প্রাচীন ভারতের ঋষিদের শিক্ষার গৌরবকে সবার উচ্চে তুলে ধরেছেন, বিপথগামীদের সুপথে আনার জন্য মহামিলনের মন্ত্র উচ্চারণ করেছেন ! ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছেন এমন বহু মহাত্মা-মহাসাধক ভিন্ন ধর্মমতালম্বী হয়ে শরীর ধারণ করেও (বিভিন্ন সুফি সাধক, লালন, নজরুল প্রমুখেরা) ভারতবর্ষের প্রাচীনত্বের গৌরবে গৌরবান্বিত হয়েছেন, তাঁরাও মহামিলনের জয়গান গেয়েছেন । কিন্তু কি আশ্চর্য্য ! ঠিক কিছু কিছু মানুষ – এই সমস্ত শিক্ষাকে সুকৌশলে এড়িয়ে নিজের মনোমতো কোন একটা মতকে বা দর্শনকে অথবা আদর্শকে আঁকড়ে ধরে – ভারতবর্ষের মূল সুর থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে !
গুরুমহারাজ এটাকেই বলেছিলেন “আহাম্মকি” ! উনি তথাকথিত অশিক্ষিত, অনগ্রসর বা দরিদ্র জনজাতির মানুষদের কত প্রশংসা করতেন, বলতেন – খেটে খাওয়া এই মানুষগুলো পবিত্র, এদের অন্ন _শুদ্ধ অন্ন ! এদের বাড়িতে গিয়ে শ্রদ্ধার সাথে দেওয়া অন্ন গ্রহণ করলে মন-প্রাণ পবিত্র হয়ে যায় । এদের মন যেন সাদা কাগজের মতো ! এদেরকে কোনো সুশিক্ষা দিলে _ খুব সহজেই তারা সেটা গ্রহণ করতে পারে ! কিন্তু মুশকিলটা হোল __কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ এই ব্যাপারটা বুঝে তাদেরকে কুশিক্ষায় শিক্ষিত করে বিপথগামী করে তোলে ! এরফলেই আজো পাহাড়-জঙ্গলে বসবাসকারী বহু জনগোষ্ঠী ভারতের মূল সুর থেকে সবসময়ই বিচ্ছিন্ন থাকতে চেয়েছে ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন – এগুলোর পিছনে international politics বা আন্তর্জাতিক রাজনীতি কাজ করে, বহু অর্থ অর্থাৎ কোটি কোটি টাকা এমনকি অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রও এইসব জনগোষ্ঠীকে supply দেওয়া হয় ভারতবিরোধী আন্দোলনকে জিইয়ে রাখার জন্য !
তথাকথিত শিক্ষিতদের কথাও বলতেন গুরুমহারাজ ! উনি বলতেন – এরা বারবার মানুষ হিসাবে জন্মগ্রহণ করায় এরা চেতনায় অনেকটা উন্নত ! কিন্তু দীর্ঘদিনের বিদেশি শাসনের কুফল এবং ভোগ-সুখের স্পৃহা ও অপরকে dominate করে রাখার মানসিকতা _এই মানুষগুলির মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটতে দেয় না ! এরা উত্তরণের সোপানের একটা জায়গায় এসে আটকে পড়ে এবং সেইখানেই horrigentaly ঘুরে ঘুরে মরে ! এদের চেতনার vertical movement আর হচ্ছে না ! উনি উদাহরণ দিয়ে বলতেন – যেমন একটা লোহার দন্ডকে মাটিতে পুঁততে গিয়ে, হাতুড়ি দিয়ে ওই দণ্ডকে horrigentally আঘাত করলে সেটি শুধু সরে সরেই যাবে, কিন্তু কখনোই গভীরে পুঁতবে না ! ওই দণ্ডকে মাটিতে পুঁততে চাইলে হাতুড়িটিকে vertically উপরে তুলতে হবে – তারপর ওই দন্ডটির মাথায় সজোরে আঘাত হানতে হবে – তবেই দণ্ডটি মাটিতে প্রবেশ করবে ৷ ঠিক তেমনিই যেকোনো শিক্ষিত মানুষের (অশিক্ষিতরা তো পড়াশোনা করে জানতে পারে না, তাদের শিক্ষার জন্য মহাপুরুষগণ সরাসরি তাদের কাছে যান।) উচিত মহাপুরুষদের শিক্ষা জীবনে গ্রহণ করে – তার নিজের ভিতরের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগিয়ে তোলা এবং চেতনাকে ঊর্ধ্বমুখী করে তোলা !
ভারতীয় যোগীগণ নিজেদের জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেছেন যে, কিছুদিন যোগাভ্যাসের ফলেই মানুষের শরীরাভ্যন্তরস্থ কুলকুণ্ডলিনীর জাগরন হয়, এবার আরো কিছুদিন অভ্যাসের ফলেই এই শক্তি ঊর্ধ্বগতি লাভ করে । মূলাধার চক্র থেকে ক্রমে ক্রমে স্বাধিষ্ঠান, মনিপুর, অনাহত ইত্যাদি চক্রে এই শক্তি ঊর্ধ্বগতি লাভ করতে থাকলেই যেকোনো মানুষ বুঝতে পারে যে, সে এতদিন তথাকথিত শিক্ষায় কুশিক্ষিত হয়ে কি নরকেই না পড়ে ছিল – আর এখন সে কোন্‌ অপার্থিব জগতের সন্ধান পেয়ে গিয়েছে !!