গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ যখন যেখানেই থাকতেন – তখন সেখানেই তাঁর শ্রীমুখনিঃসৃত অমৃতবাণীর ঝর্ণাধারায় উপস্থিত ব্যক্তিরা স্বতঃসিঞ্চিত হতেন ! কিন্তু গুরুজীর বলা কথাগুলি, সিটিং-এ উপস্থিত ওই ব্যক্তিগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো না, সেগুলি খুব দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তো ! কিভাবে ? সেটাই বলছি ! যারা গুরুমহারাজের কথাগুলো শুনতেন , তারাও ছটফট করতেন কখন সেই কথাগুলি – যারা শোনেনি তাদেরকে বলার জন্য ! আবার এমন অনেক ‘জিজ্ঞাসু ভক্ত’ ছিল যারা – তাদেরকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কথাগুলো বের করে নিতো ! গুরুমহারাজ একবার একটা বড় দল নিয়ে দক্ষিণভারত ট্যুর করেছিলেন। উনি সেবার নন্দীয়ালের সত্যমজীর ব্যবস্থাপনায় ওখানকার অনেক ভক্তদের সাথে, এখানকার ভক্তদের নিয়ে পেরেন্টাপল্লীসহ আরো কিছু কিছু জায়গা গিয়েছিলেন !
সেবার বনগ্রাম থেকে মুখার্জিবাড়ির মায়েরাও (মেজমা অর্থাৎ তপিমার মা, ন’কাকিমা প্রমুখেরা) গিয়েছিলেন ৷ সেইসময় বনগ্রাম আশ্রমের ব্রহ্মচারী প্রলয় মহারাজ (চিন্ময়ানন্দ ব্রহ্মচারী)-ও গুরুমহারাজের সাথে গিয়েছিলেন । আমার দীর্ঘদিন বনগ্রাম আশ্রমে যাতায়াতের সুবাদে এবং বিশেষতঃ বেশ কয়েকবছর বনগ্রাম পরমানন্দ হাইস্কুলে শিক্ষকতা করায়, আশ্রমে পাকাপাকিভাবে থাকার সুবাদে – আশ্রমের প্রায় সমস্ত মহারাজ, ব্রহ্মচারীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন হয়ে গিয়েছিল ৷ প্রলয় মহারাজের সাথেও হয়েছিল ৷ তাই কথায় কথায় প্রলয় মহারাজের সাথেও গুরুমহারাজের কিছু কিছু স্মৃতিকথা আলোচনার মাধ্যমে বেড়িয়ে আসতো। প্রলয় মহারাজের আদি বাড়ি ছিল নবদ্বীপে । ওখানকার তৎকালে একঝাঁক তরতাজা যুবক ভক্ত পরমানন্দ মিশনে আসতো। এদের মধ্যে প্রলয় মহারাজ ছাড়াও ছিল – রবীন মালাকার, শিবু, গৌড়, নিতাই, দেবাশীষ, কাজল ডাক্তার প্রমুখেরা ! নবদ্বীপে, যে কবার গুরুমহারাজ গিয়েছিলেন – তারমধ্যে একবার মাত্র আমার ওখানে যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল – বাকি সময়ের বিভিন্ন কথা তখন আমি রবীন মালাকার, কাজল ডাক্তার এবং প্রলয় মহারাজের মুখ থেকে শুনতে পেতাম । যেকোনো একবার পঙ্কজ বাবু (স্বামী পরমাত্মানন্দ নামে যিনি পরে শিলিগুড়িতে আশ্রম করেছিলেন বা করিমপুরেও ছিলেন)-ও নবদ্বীপে ওই দলের সাথে গুরুমহারাজকে নিয়ে আনন্দ করেছিলেন, রাত্রে নৌকাযোগে গঙ্গায় ভ্রমণে অংশীদার হয়েছিলেন ৷
যাইহোক, এসব কথা থাক্, আমরা আসি প্রলয় মহারাজের মুখ থেকে শোনা গুরুমহারাজের সাথে পেরেন্টাপল্লী সহ দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘোরার অভিজ্ঞতার কথা ! পেরেন্টাপল্লীতে গুরুমহারাজ প্রথমবার গিয়েছিলেন সূক্ষ্মশরীরে স্বামী বাউলানন্দ মহারাজের স্থূলশরীর ত্যাগের দিন ! তারপরেও গুরুমহারাজ বেশ কয়েকবার একা-একা অথবা ভক্তদের সাথে ওখানে গিয়েছিলেন । প্রথম দিকে উনি যখন একা-একা ওখানে যেতেন, তখন উনি মূল মন্দিরের বাইরে থাকা দুটি বড় প্রস্তরখন্ডের একটিতে বসে ধ্যান করতেন বা শুয়ে-বসে ওখানটাতেই বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে দিতেন। এর কারণ হিসেবে গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ওই শিলাখণ্ডের উপর বসেই স্বামী বাউলানন্দের কত দিন, কত মাস, কত বছর যে কেটে গেছে – তার ঠিক নেই ! তাই ওই স্থানটি highly charged ! গুরুমহারাজ সেবার(যেবার প্রলয় মহারাজরা সঙ্গে গিয়েছিলেন।) ওই শিলাখণ্ডের উপরে বসেই বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোচনাও করতেন।
গুরুমহারাজ বলেছিলেন, পেরেন্টাপল্লী আশ্রম সংলগ্ন যে জঙ্গল রয়েছে, সেখানে অনেক রকম বন্যপ্রাণীরা বাস করে । ওখানে প্রচুর ময়ূরও রয়েছে। ওখানকার পুরুষ ময়ূরগুলির শরীরের গঠন বেশ মজবুত এবং আকারেও বড়। একবার গুরুমহারাজের সাথে মিহির মহারাজ (স্বামী প্রজ্ঞানন্দ) পেরেন্টাপল্লী গিয়েছিলেন। কোনো কারণে একটি পুরুষ ময়ূর মিহির মহারাজের উপর বিরক্ত হয়ে এক ধাক্কা মেরেছিল । তাতে মিহির মহারাজ পড়ে গিয়েছিলেন – যদিও মিহির মহারাজ গাঁট্টাগোট্টা চেহারার এবং যথেষ্ট শক্তিশালী ছিলেন। গুরুমহারাজ আরো বলেছিলেন যে, ওই জঙ্গলে প্রচুর জংলি কাঁঠাল গাছ রয়েছে । ওখানকার কাঁঠালগুলির ‘কোয়া’ বেশি বড় হয় না – শুধুই ভুঁতি আর চাঁপকলি এবং ‘কোয়া’-গুলিতে বড় বড় বীজ – শাঁস নেই বললেই চলে ।
এরফলে ওগুলি স্থানীয় মানুষদের আহার হিসেবে বিশেষ কাজে আসে না । বীজগুলি সিদ্ধ করে ওরা খেতে পারে – অন্য কিছুই কাজে লাগে না । পাকা কাঁঠাল পাখি, কাঠবিড়ালি ইত্যাদির আহার্য — তবে বড় বড় কাঁঠালগুলি পেকে নিচে পড়ে থাকে ! তখন সেগুলি ওখানকার শেয়ালে খুব খায় । হয়তো ইউরোপীয়রা যখন এদেশে এসেছিল তখন এই দৃশ্য দেখেই কাঁঠালের ইংরেজি নাম দিয়েছিল Jackle-fruit, যা থেকে এসেছে Jackfruit ! … [ক্রমশঃ]