গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ একবার যখন দক্ষিণ ভারতীয় ভক্তদেরকে এবং বনগ্রাম আশ্রমের কিছু ভক্তদেরকে নিয়ে পেরেন্টাপল্লী গিয়েছিলেন –সেই সময়কার কিছু স্মৃতিকথা আলোচনা করা হচ্ছিলো । সেইসময় গুরুমহারাজ পেরেন্টাপল্লী আশ্রমের বাইরে যে দুটি বড় পাথরখন্ড ছিল, তার একটিতে বসে সিটিং করতেন এবং ওনার সাথে যারা গেছিলো তারা সকলেই স্বয়ং ভগবানের শ্রীকণ্ঠনিসৃত সেই মহাবাণী শ্রবণ কোরতো । এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা ! চেনা-পরিচিত তথাকথিত নগরসভ্যতা থেকে, বিলাস-বৈভবপূর্ণ এবং আরামের উপকরণ সম্বলিত গৃহ থেকে, তথাকথিত আত্নীয়-বন্ধুবান্ধব সমন্বিত লোকসমাজ থেকে বহুদূরে_ গোদাবরীর তীরে_ দুর্গম অঞ্চলে পপি পাহাড়ের কোলে বসবাসকারী সহজ-সরল আদি অধিবাসীদের মাঝে গিয়ে উন্মুক্ত-উদার প্রকৃতির কোলে বসে মহাপুরুষের মুখনিঃসৃত বাণী শোনার বিরল অভিজ্ঞতা সেদিন যাদের হয়েছিল – তারা যেন প্রাচীনকালের নৈমিষারণ্যে কোনো-না-কোনো ঋষি আশ্রমে বৈদিক আলোচনা বা স্বয়ং শুকদেবের মুখ থেকে ভাগবতের অমিয় ব্যাখ্যা শোনার অনুভূতি লাভ করেছিলেন ।
সেই শিলাখণ্ডে বসে সেদিন গুরুমহারাজ ওনার পেরেন্টাপল্লীতে পূর্বে পূর্বে একাকী যখন আসতেন, সেইসব দিনের কথা আলোচনা করেছিলেন । উনি বলেছিলেন, সেইসময় তিনি রাত্রিবেলায় একাকী ওই বড় পাথরখণ্ডটিতে বসে বা শুয়ে রাতের পর রাত কাটাতেন । এক এক রাতে যখন আকাশে পূর্ণচন্দ্র বিরাজ করতো, জ্যোৎস্নাপ্লাবিত হয়ে উঠতো পাহাড়-জল-বনাঞ্চল, এক মায়াময় মধুর পরিবেশ সৃষ্টি হোতো – তখন গুরুমহারাজের হৃদয়েও আনন্দের জোয়ার বইতো_উনি আত্নানন্দে বিভোর হয়ে একা একাই উদাত্ত কণ্ঠে বাউলগান গাইতে শুরু করতেন । কোনো মানুষশরীরের শ্রোতা সেখানে কেউ থাকতো না, কিন্তু হয়তো বন দেব-দেবীরা সূক্ষ্মশরীরে ভগবানের শ্রীকন্ঠের গান শুনতে আসতেন, আর আসতো বনের জন্তু-জানোয়াররা ! ওখান থেকে একটু দূরে ঝরনা রয়েছে, বনের নিরীহ প্রাণীরা (হরিণ, শশক ইত্যাদি) যেমন সেখানে জল খেতে আসতো, তেমনি আসতো হিংস্র প্রাণীরাও ! এদের মধ্যে ছিল বাঘ, চিতা, ভল্লুক ইত্যাদি ।
আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, এই সমস্ত হিংস্র প্রাণীরা গুরুমহারাজের গান শুনে ঐ প্রস্তর খন্ডটির চারিপাশে এসে জড়ো হোতো এবং নিশ্চিন্তে সকলে পাশাপাশি বসে গুরুজীর গান শুনতো । গুরুজী তন্ময় হয়ে একমনে গান গাইতেন । তাই প্রথমটায় ওদের উপস্থিতি টের পেতেন না । পরে যখন ওনার তন্ময় ভাবটা কাটতাে – তখন উনি একটা বোঁটকা গন্ধ পেয়ে চারিদিকে তাকিয়ে দেখতেন_ অনেকগুলি প্রাণী তাঁর বসে থাকা পাথরখণ্ডটির পাশে পাশে নিশ্চিন্তে বসে রয়েছে । গুরুমহারাজের কাছাকাছি থাকার সুবাদে, ঐশ্বরিক প্রেমের প্রবাহে স্নাত হয়ে তারাও সাময়িকভাবে হিংসা ভুলে যেতো !
ভোরের উদীয়মান সূর্যের লালিমা যখন পূর্ব দিগন্তকে একটু একটু করে রাঙিয়ে তুলতো, দু-একটি ঘুম-ভাঙানিয়া পাখি যখন নিজেদের নীড় ছেড়ে বেরিয়ে এসে প্রথম শিস্-ধ্বনি দিতে শুরু করতো – তখন গুরুমহারাজ গান গাওয়া বন্ধ করতেন । আর গান বন্ধ হলেই সেই প্রাণীগুলি নিজের নিজের স্থান ত্যাগ করে, পুনরায় ফিরে যেতো গভীর জঙ্গলে । ওরা গুরুমহারাজের সান্নিধ্যে এসে হিংসা ভুলে যেতো ! এমনও হয়েছে যে হয়তো চিতার ন্যায় হিংস্র প্রাণীদের পাশ দিয়েই হরিণশিশু নিশ্চিন্তে মায়ের সাথে যেখানে ভগবানের (গুরুমহারাজের) স্বকন্ঠের সংগীত শ্রবণ করার জন্য সেখানেই এসে হাজির হয়েছে – চিতারা সেদিকে ফিরেও চাইছে না – কেমন যেন তন্ময় হয়ে বসে রয়েছে !
ভগবানের লীলা বোঝার সাধ্য কার ! যে ভগবানের লীলা বুঝতে পারে – সে ভগবানের প্রিয় হয়ে ওঠে, ‘ভগবানের ভক্ত’- হিসাবে সেও ভগবানের নামের সঙ্গে নিজের নামটি যুক্ত করে ফেলে ! যুগে যুগে এমনটাই ঘটেছে ! এইভাবেই ভক্ত-ভগবানের কত শত লীলাকাহিনী গড়ে উঠেছে – তার কি কোন ইয়ত্তা আছে ! তবে আমরা গুরুমহারাজের যে ঘটনাটা উল্লেখ করলাম – সেই ঘটনার সেখানে গুরুমহারাজ স্বয়ং ছাড়া কোন স্থূলশরীরের মানুষ সেখানে উপস্থিত থাকতো না – সেখানে হয়তো সূক্ষ্মশরীরের প্রাচীন মুনি-ঋষিরা উপস্থিত থাকতেন (কারণ পেরেন্টাপল্লীর আশ্রম সংলগ্ন স্থানটি বহু প্রাচীনকালে মুনি-ঋষিদের তপস্যাস্থল ছিল), আর সজীব স্থূলশরীরে থাকতো বন্যপ্রাণীরা ! হিংস্রপ্রাণী এবং শান্ত নিরীহ প্রাণীদের নিশ্চিন্ত সহাবস্থান যে পরমপ্রেমিক মানুষটির উপস্থিতির ফলে ঘটতো – সেই মানুষটিই ভগবান পরমানন্দ ! নরশরীরে নবরূপে ঈশ্বরের সাক্ষাৎ অবতরণ ৷ [ক্রমশঃ]
