শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সিটিংয়ে নানান বিষয় নিয়ে কথা বলতেন । যারা স্বামী পরমানন্দকে দেখেছেন এবং তাঁর দু-একটা সিটিং শুনেছেন – তারা তো এই ব্যাপারটা ভালোমতোই জানে, আর যারা তাঁকে দেখেনি কিন্তু তাঁর সম্বন্ধে কিছু কথা শুনেছেন অথবা তাঁর সম্বন্ধে লেখা নিয়মিত পড়ছেন – তাদেরও এই ধারণা এতদিনে পাকা হয়ে গেছে !
গুরুমহারাজের সিটিং-এ সাধারণভাবেই নানান মহাপুরুষের জীবন বা জীবনী নিয়েও আলোচনা বারবার ফিরে ফিরে আসতো, কিন্তু যখনই এমনটা হোতো – তখনই আমরা সেইসব মহাপুরুষদের জীবন বা জীবনীর অনেক নতুন নতুন তথ্য জানতে পারতাম এবং তাঁদের জীবনসংক্রান্ত অনেক তথ্য যেগুলি বিভিন্ন গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে – সেগুলিরও কোথায় কোথায় ভুল রয়েছে বা তথ্য বিকৃতি হয়ে রয়েছে – তাও জানতে পারতাম ! আর এইসব শোনার পর নিজেদেরকে বেশ একটা ‘জ্ঞানী’ ‘জ্ঞানী’ ভাব লাগতো – মনে হতো আমরা যতটা জানি, ততটা তো অমুক আশ্রম বা তমুক মিশনের followers-রা বা সেখানকার সাধু-সন্তরাও জানে না ! এটা নিশ্চয়ই ‘অহংকার’ পদবাচ্য বলে বিবেচিত হবে – কিন্তু এই “অহং”– কার ? এই “অহং”-তো তাঁর ! “তাঁর”-ই কথা – যা প্রকৃত শাশ্বত সত্য বা ‘ঋত’ – তা তো সবার সামনে আসবেই ! আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে বা একশো বছর আগে অথবা পাঁচশো বছর আগে কোনো গ্রন্থে কিছু ভুল তথ্য বা তত্ত্ব লেখা হয়ে গেছে, সেই সব বই-এর ঘটনা নিয়ে, কাহিনী নিয়ে হয়তো চলচ্চিত্রায়ণ‌ও হয়ে গেছে ! এর ফলে তা মানুষের মনোজগতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে – এটা সত্য, কিন্তু যেহেতু তা চিরকালীন সত্য নয়, শাশ্বত সত্য নয়, তাই তার পরিবর্তনও ঘটবে ! আর এই পরিবর্তন কে ঘটাবেন – স্বয়ং ভগবানই ঘটাবেন !
ঈশ্বরের শক্তি-ই ভগবান হিসাবে, বিভিন্ন মহাপুরুষ হিসাবে সমাজে আত্মপ্রকাশ করে থাকেন ! তাঁরাই যুগপ্রয়োজনে শাশ্বত সত্যকে সেই যুগের উপযোগী করে ব্যাখ্যা করেন। সমকালীন মানুষ নিজেদের level অনুযায়ী সেগুলি বোঝেন এবং অপরকে বোঝাতে চেষ্টা করতে গিয়ে হয়তো বিভিন্ন প্রবন্ধ লেখেন বা গ্রন্থও লেখেন। ভগবানের কথা বা কোনো মহাপুরুষের কথা যদি তিনি নিজে লেখেন – তাহলে তার মধ্যে একশভাগ সত্যতা বজায় থাকে, ওই লেখার মধ্যেই ঈশ্বরীয় শক্তি সম্পুটিত থাকে। সেইসব লেখা পড়লেই পাঠকের মধ্যে আধ্যাত্মিক শক্তির সরাসরি সঞ্চার হয় ।
এরপরের ধাপ হলো – ঈশ্বরের কৃপাপ্রাপ্ত বা আদিষ্ট কোনো লেখকের লেখা গ্রন্থ ! এইসব গ্রন্থ পাঠ করেও পাঠকেরা শক্তিলাভ করেন, জীবনে চলার পথের দিশা খুঁজে পান ! উদাহরণ হিসেবে বলা যায় “শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত” গ্রন্থের কথা । যে গ্রন্থ পাঠ করে হাজার-হাজার কমবয়সী ছেলেমেয়ে কামনা-বাসনার জগৎ, ভোগের মোহ ত্যাগ করে – সন্ন্যাসের পথে পা বাড়িয়েছেন, এছাড়াও লক্ষ লক্ষ সংসার জীবনে ত্রিতাপ জ্বালায় ক্লিষ্ট মানুষ অনেকটাই শান্তি লাভ করে থাকেন, চরম উষ্ণতার মাঝে যেন শীতলতার স্পর্শ পেয়ে থাকেন । কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে, এইসব গ্রন্থে কিন্তু শাশ্বত সত্যের পরিমাণ বড়জোর শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ, ১০০ ভাগ নয় ! কিন্তু যেহেতু সেই যুগে ওই পরিমাণেই কাজ চলে যাবার কথা – তাই ঈশ্বরীয় শক্তি (ভগবান স্বয়ং বা মহাপুরুষগণ) ঐগুলিকে allow করে গেছেন।
তারপরে যুগ বিবর্তনে যখনই মানুষের চেতনার উত্তরণ ঘটে, আবার ঈশ্বরের অবতরণ হয় অথবা শক্তিশালী কোনো মহাপুরুষ কোথাও শরীর ধারণ করেন – তখন তিনি অনেক সময় আগের আগের প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থগুলির অনেক কথার পরিমার্জন করেন, সেগুলির যুগোপযোগী ব্যাখ্যা করেন ! এতে হয়তো ঐসব গ্রন্থে বর্ণিত মূল কথাটির অর্থ বদলে যায় ! এরফলে কি হয় – নতুন যুগের নতুন চিন্তার যুবক-যুবতীরা সহজেই সেগুলি গ্রহণ করে নেন – কিন্তু পুরনোপন্থীরা সেই পুরাতনকে আঁকড়ে ধরে বিরোধ করতে থাকেন ! যুগ-যুগ ধরে এইটাই হয়ে চলেছে ! প্রাচীনপন্থীদের সঙ্গে নতুনপন্থীদের বিরোধ ! সবাই যদি নতুন যুগের দূতকে (অবতার) সমানভাবে গ্রহণ করতে পারতো – তাহলে এই পৃথিবীতে কোনো বিরোধ-ই থাকতো না – সবাই সবার সাথে সম্প্রীতির সঙ্গে সুখে-শান্তিতে থাকতে পারতো !
কিন্তু তা তো হবার নয় – সংগ্রামশীলতাই জীবনে অগ্রগতির পরিচায়ক। তাই খটমটি লেগেই থাকবে, আর এর মধ্যে দিয়েই জীবন এগিয়ে চলতে থাকবে। এতোটা গৌরচন্দ্রিকা করার প্রয়োজন হোলো এইজন্য যে গুরুমহারাজ বিভিন্ন সিটিং-এ বিভিন্ন মহাপুরুষদের নিয়ে যে সমস্ত আলোচনা করতেন – সেগুলিতেও আমরা দেখেছিলাম অনেক সময় উনি এমন এমন কথা বলেছিলেন, যেগুলি সেইসব মহাপুরুষ সম্বন্ধীয় লিখিত গ্রন্থে উল্লেখিত সব কথার সঙ্গে মেলে না । এইসব নিয়ে আগে আগে আলোচনা হয়েছে, তবু কিছু আগে না বলা কথা নিয়ে, আমরা আগামী কয়েকটা সংখ্যায় আলোচনা করবো ।(ক্রমশঃ)