শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বিভিন্ন সিটিং-এ বিভিন্ন মহাপুরুষদেরকে নিয়ে অনেক সময় এমন এমন কথা বলতেন, যেগুলো শুনে আমরা নিজেরাই অবাক হয়ে যেতাম ! ওনার কথা শোনার পর আমরা যারা সেদিন ওই সিটিংয়ে থাকতাম – তারা সিটিং-এর শেষে আশ্রমের মাঠে গিয়ে, বটতলার ছায়ায় বসে বসে কথাগুলি নিয়েই আলোচনা করতাম, কথাগুলির সঠিক ব্যাখ্যা খুঁজে বের করার চেষ্টা করতাম ! অনেক সময় আমাদের সমবেত আলোচনার মধ্যে দিয়েই উঠে আসতো অনেক সমাধান সূত্র ! আমরা স্পষ্টতই বুঝতে পারতাম যে, গুরুমহারাজ যা বলেছেন – তাই সত্য, সর্বতোভাবে সত্য ! পৃথিবীর যত মহাপুরুষ যে যেখানেই জন্মগ্রহণ করে থাকুক না কেন – তাঁদের সকলের অস্তিত্ব, তাঁদের সকলের জ্ঞান – গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের ন্যায় ঈশ্বরের অবতারগণের মধ্যেই বিদ্যমান থাকে। ফলে ওনাদের সর্বতোভাবে অধিকার থাকে – যেকোনো মহাত্মা-মহাপুরুষ সম্বন্ধে কোনো কথা বলার। নতুন যুগের যুগপুরুষ’ পুরাতনীদের কোনো কার্যকলাপ, যদি সে যুগের যুগোপযোগী বলে মনে না করেন – তাহলে তিনি তো কথা বলবেনই ! তিনি পুরোনো কালের বলে যাওয়া কোনো কথার বা কোনো ঘটনার নতুন আঙ্গিকে – নতুনদের গ্রহণযোগ্য করার মতো করে ব্যাখ্যা করবেনই তো !
এটাই তো ‘চরৈবেতি’! এই নিয়মেই মানব সমাজের অগ্রগতি হয়ে চলেছে। পুরাতনকে অতিক্রম করে ঈশ্বরের অবতারেরা অথবা ঈশ্বরের দূতেরা সমগ্র মানবজাতিকে এগিয়ে নিয়ে চলেন পূর্ণত্বের দিকে! যেটা মানব জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য।
আমরা আগের দিন স্বামী বিবেকানন্দের নিত্যানন্দ মহাপ্রভু সংক্রান্ত একটি ছোট্ট শব্দ প্রয়োগের কথা বলেছিলাম, এছাড়াও স্বামীজী__ আচার্য শঙ্করের রচনার কিছু অংশ পাঠ করে (যদিও সেইসব কথা সম্ভবতঃ প্রক্ষিপ্ত)– আচার্য সম্বন্ধেও কিছু কড়া শব্দ প্রয়োগ করেছিলেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ সমকালীন দুজন তথাকথিত ‘ঋষি’ উপাধিপ্রাপ্ত ব্যক্তি(বঙ্কিমচন্দ্র ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর)-র সম্বন্ধে সরাসরি বেশ কিছু অপ্রিয় সত্য বলেছিলেন। এর ফলে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের লোকেরা শ্রীরামকৃষ্ণকে ভালোভাবে নিতেই পারেনি ! কিন্তু যদি সুস্থ চিন্তার মানুষ আজও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ সহ যে কোনো মহাপুরুষের কথাগুলি বিচার-বিশ্লেষণ করে, তাহলে দেখতে পাবে যে, ওইসব মহাপুরুষরা প্রকৃত অর্থেই “সত্য” বলেছেন, সঠিক কথাই বলেছেন। কি করে তাঁদের কথা সত্য থেকে বিচ্যুত হবে ? এটা তো হতেই পারে না! কারণ জগৎটা তো তাঁরই ! তিনি-ই তো সবার মধ্যে অনুস‍্যূত হয়ে রয়েছেন, সকল জীবের হৃদয়ে রয়েছেন, অন্তরে রয়েছেন অন্তর্যামী রূপে ! তাহলে তাঁর চেয়ে কারো কথা আর কে বেশি জানবে ? যার সম্বন্ধে তিনি বলছেন – সেই হয়তো নিজের সম্বন্ধে অতোটা বেশি জানে না !
গুরুমহারাজ যেদিন সিটিং-এ বলেছিলেন সীতাদেবী রাবণের হাত থেকে মুক্তি লাভ করে পুনরায় যাতে তাঁর স্বামী রামচন্দ্রের সাথে মিলিত হতে পারেন – তার জন্য সমুদ্র দেবতার কাছে কয়েক কলসি সুরা (মদ্য) “মানত” করেছিলেন ! উনি(গুরু মহারাজ) বলেছিলেন – দ্যাখো, যে যে খাদ্যবস্তু নিজে খেতে ভালোবাসে, সে সেটাই তো দেবতাকে মানত করে থাকে! এটাই স্বাভাবিক ঘটনা নয় কি??”
গুরুমহারাজের মুখে এই কথা শুনেই সেদিন ওই সিটিং-এ উপস্থিত একজন বৃদ্ধ মাস্টারমশাই কেঁদে ফেললেন। কাঁদতে কাঁদতে গুরুমহারাজকে উদ্দেশ্য করে বললেন – ” অমন কথা বলবেন না গুরুজী ! ‘সীতা মা মদ ভালোবাসতেন’- এটা সহ্য করতে পারছি না ।” গুরুমহারাজ হেসে উঠেছিলেন, বললেন – ” দেখেছো ! এইজন্যেই যুগে যুগে অবতারগণ অনেক কথা বলতে এসেছিলেন কিন্তু বলতে পারেন নি ! অব্যক্ত কথাগুলি সঙ্গে করে নিয়ে চলে গেছেন ! পরের অবতার শরীরে এসে হয়তো আরও কিছু বলতে পেরেছেন – কিন্তু সবটা নয় ! এইভাবেই এখনো সব কথা বলা হয়ে ওঠেনি ! সত্যের মুখোমুখি হওয়া অতটা সহজ নয় বাবা ! সত্যের উদ্ভাসিত আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায় যে !”
তবে সত্যকে সব সময় সরাসরি মেনে নেওয়ার অন্য অসুবিধাও রয়েছে । ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ যে আবার ১০০ বছর পরে বাউলবেশে বর্ধমানের শরীর নেবেন – এমন কথা ঠাকুর নিজের মুখেই বলেছিলেন । পরবর্তীতে শ্রী শ্রী মা স্বয়ং এবং ঠাকুরের পার্ষদরাও এই কথা খুবই বলাবলি করতেন ! আমরা ছোটবেলায় ক্যালেন্ডারে ছবি দেখতাম বাউলবেশী ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ একতারা হাতে গ্রামের রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছেন ! সে যাই হোক, গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হবার পর প্রথম প্রথম অনেক ব্যক্তির(ভক্ত মানুষ)-ই নানা রকম ভাব জাগতো ! তারা চাইতেন যে – ‘স্বামী পরমানন্দ-ই যে নরশরীরে ঈশ্বরের অবতার স্বয়ং’ – এই কথাগুলো গোটা বিশ্ববাসীকে জানাবেন । আমি সেই সময় এমনও শুনেছিলাম যে, আমাদের আশ্রমেরই কোনো এক দীক্ষিত ভক্ত নাকি আমেরিকা, রাশিয়া, ইংল্যান্ড সহ বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্টের কাছে চিঠিও লিখেছিলেন ৷
সেইরকমই একজন পরমানন্দ ভক্ত কোনো এক রামকৃষ্ণ মিশনের শাখায় গিয়ে সেখানকার ভারপ্রাপ্ত প্রবীণ মহারাজকে বলেছিলেন – ” আপনারা তো জানেন যে, শ্রীরামকৃষ্ণ ১০০ বছরের মধ্যেই আবার শরীর গ্রহণ করবেন । তাহলে আপনাদের তেমন ‘খোঁজ’ নাই কেন ? বর্ধমানে গিয়ে খুঁজলে তো তাঁকে পেতেও পারেন !” সেই প্রবীণ সাধুটি হিসাবের বড় খাতায় মনোনিবেশ করা অবস্থাতেই উত্তর দিয়েছিলেন – ” হ্যাঁ, তা হয়তো পাবো, কিন্তু একজন রামকৃষ্ণ ১০০ বছর আগে জন্মগ্রহণ করে আমাদের জন্য এতো কাজ দিয়ে গেছেন যে – সেগুলোই সামলাতে পারছি না ! তাতে যদি আর একটা রামকৃষ্ণ জন্মে যায় – তাহলে তাঁর কাজটা আবার এর সাথে যোগ হবে, ফলে তখন আমাদের অবস্থাটা কি হবে একবার ভেবে দেখেছেন ? সুতরাং দরকার নাই মশাই – আর একটা রামকৃষ্ণের ! তিনি যদি কোথাও জন্মে থাকেন – তাহলে সেখানেই থাকুন ! আমরা ঐ পুরোনো রামকৃষ্ণ নিয়েই থেকে যেতে চাই !”