শ্রী শ্রী গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের বলা কথা নিয়ে এবং আমরা যেমনটা তাঁকে দেখেছিলাম – সেইসব নিয়ে এখানে আলোচনা হচ্ছিলো। গুরুমহারাজ বলেছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ যেহেতু গোঁড়া ব্রাহ্মণবংশে শরীর ধারণ করেছিলেন এবং তখনকার যুগে ছোঁয়া-ছুঁয়ি, আচার-বিচার এগুলো সমাজে খুব বেশি প্রচলিত ছিল – তাই সেইসব সংস্কার ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে তাঁর আচরণে রাখতে হয়েছিল। কিন্তু তাঁর এই লীলায় ওইসব কোনো bindings নাই, তিনি শরীর গ্রহণের আগেই মা জগদম্বার কাছে অনুমতি নিয়ে নিয়েছিলেন যে, নানাবিধ সংস্কার, ছোঁয়া-ছুঁয়ি ইত্যাদি থেকে তিনি সম্পূর্ণভাবে মুক্ত থাকবেন ! যার জন্য তিনি পরমানন্দ শরীরে ট্রেনে, বাসে, এরোপ্লেনে বা উড়োজাহাজে, জলজাহাজে পায়ে হেঁটে, সাইকেলে, মোটর সাইকেলে, রিকশায় – যে কোন মাধ্যমকে অবলম্বন করে পৃথিবীর প্রায় সমগ্র অংশ (আমেরিকা মহাদেশ ছাড়া) ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছেন ।
তাঁর ছিল “চলা পা আর মুখ”! তাঁর এই বাউল-মরমিয়া রূপে সুদীর্ঘ যাত্রাপথে তিনি কত শত-সহস্র মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন, কারো কাছে তিনি ধরা দিয়েছেন কারো কাছে থেকে গেছেন অধরা ! বহু মানুষকে প্রথম দর্শনেই কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার মুক্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, আবার হয়তো কোনো স্থানে দীর্ঘসময় ধরে থেকেছেন – কিন্তু তারা বুঝতেই পারেনি যে স্বয়ং ঈশ্বর মানবশরীর ধারণ করে সেখানে কিছুকাল কাটিয়ে গেলেন !
ছোটবেলা থেকে বাবা-মা সহ মাত্র কয়েকজনের কাছে তিনি তাঁর, প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ করেছিলেন । যখন থেকে উনি পথে নেমেছিলেন – তখন উন্নত সাধু-মহাত্মারা অনেকেই ওনাকে ভাবতেন ইনি বোধহয় বালকবেশী কোনো মহাপুরুষ, “কায়াকল্প” বা “কায়াপ্রবেশ” করে বালক শরীরে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন । অবশ্য এটা হওয়াই তো স্বাভাবিক ! কোনো মানুষ সে যতই উন্নত হোক না কেন (সাধন-ভজনের ফলে উন্নত বা জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কারে উন্নত), সে তো মানুষ ! ফলে সে আর একজন মনুষ্যশরীরের ব্যক্তিকে একজন ‘মানুষ’ হিসাবেই ভাববে ! হয়তো কেউ কেউ ভেবে থাকতে পারেন যে, উনি উন্নত মানুষ– মহান মানুষ ! কিন্তু তিনিই যে *সোনার মানুষ*, তিনিই যে *মনের মানুষ, তিনিই যে* সকলের মনোজগতের স্বামী, অন্তরের অন্তর্যামী- অন্তরদেবতা – তা কি করে বোঝা যায় ?
ঈশ্বরের অবতরিত শরীরকেই “ভগবৎশরীর” বলা হয়, আর সেই শরীরধারীই “ভগবান”! যেমন ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, ভগবান স্বামী পরমানন্দ ! কিন্তু তিনি যে “ভগবান”– এই ধারণা হয়তো সমকালীন কোনো কোনো ভক্তের হোতেও পারে – কিন্তু সেটাও ওই ধারণাই (অর্থাৎ ধারণাকেই সীমাবদ্ধ)! তার বেশি কিছু নয় ! কেন একথা বলা হোলো – তার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক । কাশীপুর উদ্যানবাটীতে ১৮৮৬ সালের পয়লা জানুয়ারি সকালের দিকে যে অলৌকিক বা অতিলৌকিক ঘটনাটা ঘটেছিল (যেটি “কল্পতরু” বলা হয় বা “আত্মপ্রকাশের অভয়দান”ও বলা হয়), সেখানে দেখা যায় যে, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তখন চরম অসুস্থ, বিছানা থেকে উঠতেই পারেন না, দুই-চারজন শুদ্ধসত্ত্ব ব্রহ্মচারী ছাড়া তখন ঠাকুরের ঘরে কেউই যান না ! গৃহী ভক্তরা নীচ থেকেই ঠাকুরের শরীরের খোঁজখবর নিয়ে চলে আসেন। সে হেন একটা অবস্থায় __সেদিন গিরিশ ঘোষ, তাঁর ভ্রাতা অতুলচন্দ্র ঘোষ, রাম দত্ত প্রমুখ আরো অনেক (প্রায় ৩০ জন) গৃহী ভক্তরা ইংরেজি বছরের প্রথমদিন হিসাবে কাশীপুর উদ্যানবাটিতে হাজির হয়েছিলেন । ভেবেছিলেন নীচ থেকেই তাদের প্রাণের ঠাকুরকে প্রণাম করে বৎসরের শুভসূচনা করবেন ! কিন্তু ভগবানের লীলার অন্ত কে করতে পারে !
এইসব গৃহীভক্তরা নিজেদের মধ্যেই ঠাকুরের বলা কথাগুলো নিয়ে আলোচনা করছিলেন, ব্রহ্মচারী ভক্তরা তাদের নিজ নিজ কর্মে লিপ্ত ছিলেন – হঠাৎ সকলকে অবাক করে দিয়ে ঠাকুরের উপরের ঘরের রোগশয্যা ছেড়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে একাই নেমে এলেন নিচের উঠোনের একটি আমগাছের তলায় ! ওই অবস্থায় উপস্থিত ভক্তরা (যারা দীর্ঘদিন ধরে কাশীপুরে আসা-যাওয়া করেও ঠাকুরকে চাক্ষুষ করতে পারছিলেন না) হঠাৎ করে তাদের প্রাণের ঠাকুরকে নিজেদের মধ্যে পেয়ে, ছুঁতে পাবার মতো পজিশনে একেবারে হাতের কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল ! বিশেষতঃ ঠাকুর সুস্থ হয়ে গেছেন ভেবে তাদের আর আনন্দের পরিসীমা ছিল না ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ নিচে নেমে এসেই সরাসরি ভক্তপ্রবর গিরিশের কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করে বসলেন – ” হ্যাঁগো গিরিশ ! তুমি যে আমার সম্বন্ধে এখানে-ওখানে নানা কথা বলে বেড়াও, তা–তুমি আমার মধ্যে কি দেখেছো ?” ঠাকুরের মুখে এই কথা শুনেই ভক্ত ভৈরব, নাট্যকার গিরিশ ঠাকুরের পদতলে নতজানু হয়ে বসে বলে ওঠেন – ” ব্যাস-বাল্মিকী যাঁর ইয়ত্তা করতে পারে নি – আমি আর তাঁর কথা বেশি কি বলবো ?”
এরপর তো আপনারা জানেন যে, ঠাকুর ওই কথা শোনার পরই ভাবস্থ হয়ে যান এবং সকলকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠেন – “তোমাদের সকলের চৈতন্য হোক্!” এরপর সকলে তাঁকে প্রনাম করলে তিনি সকলকে স্পর্শ করেছিলেন এবং উপস্থিত সকলের অন্তঃকরণে একটা তীব্র ভাবের প্লাবন সৃষ্টি হয়েছিল! কেউ কাঁদছিলেন, কেউ হাসছিলেন, কেউ স্তবপাঠ করতে শুরু করেছিলেন ইত্যাদি ইত্যাদি!!
যাইহোক, আমরা এতো কথার উপস্থাপনা করলাম গিরিশের ঐ বিখ্যাত কথাগুলিকে (ব্যাস-বাল্মীকি….)তুলে ধরার জন্য ! এই ঘটনা থেকে জানা যায় যে– গিরিশের “ধারনা” যে একদম পাকা ছিল, সঠিক ছিল __এতে কোন সন্দেহ‌ই নাই ! কিন্তু এবার প্রশ্ন _ ‘তাতে কি তিনি নির্বিকল্প সমাধি অবস্থা লাভ করতে পেরেছিলেন ?’ _ পারেন নি তো ! তাহলে ? তাহলে আর এমন বেশি কি হোলো? এরপরেও তো তাকে বা বাকি সকলকে অনেকদিন বাঁচতে হয়েছিল _আর বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই করতে হয়েছিল ! গিরিশসহ, ওখানে উপস্থিত বাকি ভক্তদের তো আর সেই দিনেই মুক্তি ঘটে যায় নি বা মৃত্যুও ঘটেনি!তাই না!!
আমরা অনেকেই জানি যে গিরিশ ধ্যান-জপ কোরতো না – ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে সব সমর্পণ করে দিয়েছিল । কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে, তিনি খুবই সাধন-ভজন করতেন ! বাড়িতে বা দক্ষিনেশ্বরে গিয়ে তো করতেন‌ই এমনকি, ঠাকুরের অন্তর্ধানের পর গিরিশ নিয়মিত অমাবস্যার দিনে কাটোয়ার কাছে অট্টহাস সতীপীঠে সাধনা করতে আসতেন ! এসব কথা প্রমোদ চট্রোপাধ্যায়ের “তন্ত্রাভিলাষীর সাধুসঙ্গ” গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে।৷