শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের শিক্ষা দান এবং শিষ্য-ভক্তদের শিক্ষাগ্রহণ প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিলো । এখন ‘শ্রদ্ধা’ বিষয়ক যে সমস্ত আলোচনা উনি বিভিন্ন সিটিং-এ করতেন, আমরা সেই ব্যাপারে আলোকপাত করার চেষ্টা করবো। “শ্রদ্ধা”- এই শব্দটার সঙ্গে আমরা পরিচিত ছিলাম ছোটবেলা থেকেই। পিতামাতা, গুরুজন, শিক্ষকাদি, বয়স্ক অন্যান্য ব্যক্তিদেরকেও ছোটবয়সে আমরা খুবই মান্যতা দিতাম – কিন্তু সেগুলি “শ্রদ্ধা” কিনা জানতাম না। সেগুলো বোধহয় ছিল “ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা”! প্রকৃত শ্রদ্ধা যে কি জিনিস সেটা বুঝলাম গুরুমহারাজকে দেখার পর থেকে ! বৈষ্ণবশাস্ত্রে একটা কথা রয়েছে “অমানীনা মান দেন…”, –মহাপ্রভু নিজে এটি আচরণ করতেন‌ এবং ভক্তদেরকেও শিক্ষা দিয়েছিলেন_ অ-মানী ব্যক্তিকেও ‘মান’ দান করতে ! এটা বৈষ্ণবদের একটা অন্যতম প্রধান লক্ষণ। মহাপ্রভুকে তো দেখিনি, তাই ওনার অমানী ব্যক্তিকে ‘মান’ দেবার ঘটনা প্রত্যক্ষ করাও হয়নি। কিন্তু গুরুমহারাজকে স্বচক্ষে দেখলাম – অতি ক্ষুদ্র, নগণ্য, যার গৌরব করার কিছুই নাই – এমন ব্যক্তিকেও দেখতাম গুরুমহারাজ কি সম্মান-ই না প্রদর্শন করতেন ! আর ওই সব ব্যক্তিরা অর্থাৎ ভক্তরা তার বিনিময়ে আর কি দিতে পারতো – শুধু “শ্রদ্ধা” ছাড়া ! এই শ্রদ্ধা__ অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা, এই শ্রদ্ধা হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা ! আমরা তো জানতাম যে, আমরা তাঁর ভালোবাসা পাওয়ার অযোগ্য, তবু সেই মহান মানুষটির নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, প্রত্যাশাবিহীন ভালোবাসা পেয়ে – অসম্ভব চেষ্টা করেও চোখের জল আটকাতে পারতাম না !
গুরুমহারাজের প্রতি ভক্তদের শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মধ্যেও যে ‘ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা’ ছিল না তা নয়, কিন্তু তার সঙ্গে__ পিতা-মাতা বা গুরুমশাইদের প্রতি ‘ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা’র পার্থক্য হলো এই যে, গুরুমহারাজের প্রতি একটা ‘ভয়’ কাজ করলেও (সেটা অবশ্যই আমাদের নিজস্ব দুর্বলতার কারণে) সেই ‘ভয়’ জয় করেও আমরা পাগলের মতো ছুটে ছুটে আসতাম তাঁর-ই পদপ্রান্তে একটু বসতে পাবার আশায় ! গুরুমহারাজের মুখে শুনেছিলাম “ভালোবাসার”-ই তিনটি পৃথক পৃথক আঙ্গিক রয়েছে । ছোটদের প্রতি তা নিবেদিত হলে – তার নাম হয় স্নেহ, সমবয়সীদের প্রতি তা নিবেদিত হলে – তখন সাধারণভাবে তাকে বলা হয় প্রেম বা ভালোবাসা (যদিও প্রেমের প্রকৃত অর্থ অনেকটাই ব্যাপক, বিস্তৃত ও গভীর), আর এইটিই যদি সিনিয়র বা বড়দের প্রতি নিবেদিত হয় তখন তা হয় “শ্রদ্ধা”!
গুরুমহারাজ নরশরীরে স্বয়ং ভগবান রূপে বা ঈশ্বরীয় শক্তির বিশেষ প্রকাশ রূপে লীলা করে গেলেন ৷ তাঁর কত শক্তি, কত মহিমা ! তিনি জ্ঞানের, প্রেমের সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি ছিলেন ! সেই হেন গুরুমহারাজ নিজের স্বল্প জীবৎকালে নিজেই আচরণ করে _’অমানীকে মান দেওয়া, নগন্য ব্যক্তিকেও শ্রদ্ধা প্রদর্শন’ _এসব দেখিয়ে গেলেন ! অবশ্য সব অবতার পুরুষরাই এই ধরনের আচরণ‌ই করে যান – না হলে তিনি কিসের ভগবান, কিসের অবতারপুরুষ !
আমরা সাধারন মানুষেরা শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-নির্ধন, গৃহী-সন্ন্যাসী বা ব্রহ্মচারী ইত্যাদি যাই হই না কেন – যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাদের চেতনার উত্তরণ হচ্ছে, বিবেকের জাগরন ঘটছে – ততক্ষণ তো আমরা সেই অনুন্নত সাধারণ মানুষই থেকে যাচ্ছি ৷ মুখে কোনো না কোনো মহাপুরুষের আদর্শের কথা বলা হচ্ছে – কিন্তু নিজের জীবনে তার ঠিক ঠিক প্রয়োগ ঘটছে না,– এ এক চরম আত্মপ্রবঞ্চনা !
গুরুমহারাজ নিজে বারবার বলেছেন – ” সেই জীবনই মরুভূমির মতো – যে জীবনে প্রেমের সঞ্চার হলো না ! যে জীবনে ভালোবাসার বোধ হলো না !” তাহলে “শ্রদ্ধা” যদি ভালোবাসার-ই একটা রূপ বা প্রকাশ হয়ে থাকে তাহলে শ্রদ্ধাহীন মানবও তো শুষ্ক, রুক্ষ, মরুভূমির-ই ন্যায় ! সুতরাং আমরা যারা গুরুমহারাজের আদর্শের সঙ্গে, শিক্ষার সঙ্গে সামান্য হলেও পরিচিত হয়েছি – আমাদের অবশ্যই শ্রদ্ধাবান হয়ে ওঠা উচিত ! আমার সঙ্গে আর একজনের (সে হয়তো সিনিয়রও হতে পারে) আদর্শগত, মতগত, আচরণগত –ইত্যাদি নানান অমিল থাকতেই পারে ! আমি তাকে এড়িয়ে চলতেই পারি – কিন্তু আমার অন্তরের শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হবে কেন ? আমার সৌজন্যবোধের হানি হবে কেন ? ট্রেনে-বাসে লেখা থাকে – “আপনার ব্যবহার-ই আপনার পরিচয়”! সুতরাং আমার বাহ্যিক ব্যবহারে যদি অসৌজন্যতা, রুক্ষতা, অভদ্রতা, শ্রদ্ধাহীনতা ফুটে ওঠে – তাহলে তো মানুষের কাছে আমার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে যাবে ! আর সেক্ষেত্রে শুধু গুরু-ই নয়, আমার বংশপরিচয়, পিতা-মাতার পরিচয়ের প্রতিও মানুষের মনে একটা অনীহার সৃষ্টি হবে । যার জন্য দায়ী হয়ে যাবো আমি নিজে !
এগুলো ভাবতেই হবে। আধ্যাত্মজীবনে যারা প্রবেশ করেছে এবং যারা তাদের নিজেদের জীবনকে কোনো উন্নত আদর্শের সাথে জুড়ে দিয়ে এগিয়ে চলার চেষ্টা করছে – তাদেরকে অন্ততঃ এইসব (ছোটখাটো মনে হলেও) ব্যাপারে খুবই যত্ন দিয়ে ভাবতে হবে । নিজেদের চলার পথের ছোট ছোট বাধাগুলিকে অপসারিত করতেই হবে – তবে তো হবে অগ্রগতি ! আমি আমার গুরুকেই মানি – আর কাউকেই মানি না – এইটা থেকেই তো সাম্প্রদায়িকতার জন্ম হয় ৷ আর এই সাম্প্রদায়িক শক্তি পৃথিবীকে বারবার রক্তাক্ত করেছে, ক্ষতবিক্ষত করেছে ! তবু পৃথিবীর মানুষ আমরা, সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে আমাদের চেতনাকে নিয়ে যেতে চাইছি না – কোনো-না-কোনো ক্ষুদ্রতা, সংকীর্ণতাকে আশ্রয় করছি এবং তাতেই আটকে যাচ্ছি ! এর বাইরে আর যেতে পারছিনা, যেতে চাইছি ও না ! ফলে জন্ম নিচ্ছে__ অসহিষ্ণুতা, হিংসা, পারস্পরিক ঘৃণা এবং অপরের প্রতি অশ্রদ্ধা !
কিন্তু জ্ঞানলাভ হোলে, অদ্বৈত ভাব জাগ্রত হোলে__তখন আর পর কোথায়? তখন তো বোধ হবে আমিই আমাকে অশ্রদ্ধা করছি, আমি আমাকেই অসম্মান করছি__তাই নয় কি!! তাই আমাদের এই যে অপরাপর বোধ, এবং সেই বোধসঞ্জাত বৈষম্যমূলক আচরণ__এইটা দেখে মহাপুরুষগণ বা জ্ঞানীগণ হাসেন এবং আমাদেরকে ‘আহাম্মক’ ছাড়া অন্য আর কোনো কিছুই ভাবতে পারেন না!!!