শ্রী শ্রী গুরুমহারাজের শ্রীমুখ থেকে যেসব কথা তখন আমরা শুনতাম, তার মধ্যে থেকে “শ্রদ্ধা” বিষয়ক কিছু কথা এখানে বলা হচ্ছিলো। প্রকৃতপক্ষে বর্তমান যুগটাই যেন একটা “শ্রদ্ধাহীনতায়” ভুগছে ! আপাতভাবে মনে হয় এটা সত্যি কথা ! আমরা জানি যে, কিছু পেতে গেলে কিছু হারাতে হয় – এক্ষেত্রেও কি বিশ্বের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নতির সুফল পেতে গিয়ে অনেক কিছুর সাথে আমাদেরকে সামাজিকভাবে “শ্রদ্ধা”-কে হারাতে হচ্ছে ? এটা একটা আজকের সমাজের ‘জিজ্ঞাসা’ হতে পারে ! কারণ সত্যি সত্যিই দেখা যাচ্ছে – একেবারে ছোটো বয়স থেকে অর্থাৎ শিশু অবস্থায় যারা রয়েছে, তারাও যেন “কুছ পরোয়া” ভাব নিয়েই জন্মাচ্ছে ! স্কুল-কলেজের শিক্ষক মশাইরাও ব্যাপারটা আত্মস্থ করে নিয়েছেন। তাঁরাও আর কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে “শ্রদ্ধা” আশা করেন না, এছাড়া আজকাল তো আখছার দেখা যাচ্ছে__ higher-education(কলেজ, ইউনিভার্সিটি)-এর শিক্ষকদেরকে প্রায়ই ছাত্র-ছাত্রীদের দ্বারা লাঞ্ছিত বা অপমানিত হতে হয় ! বহু মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা এখন আর কলেজের (সরকারি বা বেসরকারি) প্রফেসরের চাকরি করতেই চাইছে না – শুধুমাত্র ওই কারণে !
কিন্তু গুরুমহারাজ বর্তমানের তরুণ এইসব ছাত্র-ছাত্রীদের কখনো দোষ দেখেন নি ! উনি বলতেন – “এগুলো যুগপ্রভাব !” তাছাড়া উনি আরো বলতেন – ” দ্যাখো, আজ থেকে একশো বছর কি দেড়শো বছর আগে শিশুদের মধ্যে, ছাত্রদের মধ্যে গুরুজনদের প্রতি,গুরুমশায়-দের প্রতি খুবই শ্রদ্ধা ছিল, ভক্তি ছিল – এটা ঠিক কথা ! কিন্তু তাতে কি হোল ? কয়েক হাজার ইংরেজ এসে কয়েক কোটি ভারতবাসীকে, কয়েক শতক ধরে শাসন করলো, শোষণ করলো আর চরমভাবে লাঞ্ছনা এবং অত্যাচার করলো ! তাহলে ঐসব ভ্যাদভ্যদে মার্কা শ্রদ্ধা আর ম্যারম্যারে ভক্তি নিয়ে কি লাভ বল্ তো ? এরচেয়ে আজকের এইসব বেপরোয়া ছেলেরা অনেক ভালো ! আজকের ছেলেমেয়েরা কিন্তু ভারত-ভাগ অথবা অন্যান্য দেশ দ্বারা ভারতবর্ষকে আক্রমণ করাটা মেনে নেবে না ! তারা তখন সকলে একজোট হয়ে যাবে এবং তীব্রভাবে এর প্রতিবাদ করবে এবং প্রতিকারের চেষ্টা করবে!” তার মানে, ওনার কথা শুনে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে, “সাধারণ মানুষের ‘শ্রদ্ধা’- ব্যাপারটা আপেক্ষিক!”
গুরুমহারাজের এই ধরনের কথা শুনে সিটিং-এ উপস্থিত প্রৌঢ় বা বৃদ্ধদের একটু অস্বস্তি হোত – তারা অনেক সময় গুরুমহারাজের কথার মৃদু প্রতিবাদও করতেও চাইতো ! কিন্তু গুরুমহারাজ সুন্দর করে আবার তাদেরকে সবটা বুঝিয়ে বলতেন এবং তখন সবাই তাঁর কথা মেনে নিতে বাধ্য হোতো !
আর হবে নাই বা কেন ? ওগুলো যে গুরুমহারাজের কথা ! ভগবানের কথা ! ন’কাকা (শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়) গুরুমহারাজের প্রসঙ্গ উঠলে প্রায়শঃই বলতেন – ” বাবা ! গুরুমহারাজ হলেন ‘বিশ্বম্ভর’! গোটা বিশ্বের ভার যেমন তাঁর কাঁধে, তেমনি সমগ্র বিশ্বের ভরকেন্দ্রও তিনি !” তা ঠিকই। সমগ্র বিশ্বের ভর ঐ একটিমাত্র মনুষ্য শরীরকে কেন্দ্র করে ক্রিয়াশীল ! এটা ভাবাই তো দুষ্কর। যে কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তি কখনো ভাবতেই পারবে না –আর ভাবতে চেষ্টা করলেও, ভেবে কখনোই কোনো কূল-কিনারা পাবে না ! ভাবতে ভাবতে একটা সময় আসবে যখন মাথাটা দুদিকে চেপে ধরে বসে পড়বে, আর বলবে – ” নাঃ! এর চেয়ে বেশি আর ভাবা যাচ্ছে না! এর বেশি আর আমার বুদ্ধিতে কুলোচ্ছে না !” এইটাই হয় । ভগবানের লীলার (তাঁর কাজকর্মের) কোনদিনই কোনো সীমা-পরিসীমা করা যায় না ! ভগবানের লীলার সঠিক ব্যাখ্যাও করতে পারে না সাধারণ মানুষ ! তাই ভগবানকেই পুনরায় শরীর নিয়ে এসে – তাঁর আগের শরীরের কাজের ব্যাখ্যা করতে হয় ৷
যাইহোক, আমাদের কথা হচ্ছিল “শ্রদ্ধা” নিয়ে ৷ আগেই বলা হয়েছে – গুরুমহারাজের সঙ্গে যারা দু-একদিনও মিশেছে তারা জানে যে, গুরুমহারাজ সকলকেই কি বিশেষ মর্যাদাই টা না দিতেন ! একটা ছোট্ট শিশু থেকে, গ্রামের কোনো সাধারণ মানুষ বা কোনো বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সবার প্রতি ছিল গুরুমহারাজের অপার্থিব মর্যাদাবোধ ৷ এই মর্যাদাবোধটাই তো প্রকৃত শ্রদ্ধা ! সকলকেই গুরুমহারাজ সমান মর্যাদার চোখে দেখতেন – অবশ্য‌ই এর কারণ হোলো উনি সকলকে ব্রহ্মের প্রকাশ হিসাবে দেখতেন ৷ এইজন্যে উনি মানুষই শুধু নয়_ মনুষ্যতের প্রাণী, গাছপালা এমনকি জড়পদার্থকেও যথাযোগ্য মর্যাদা দিতেন বা দিতে পারতেন ! যেটা আমাদের অর্থাৎ সাধারণ মানুষের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়!গুরুমহারাজ সদাসর্বদা জানতেন যে, ‘তিনিই ঈশ্বরের শক্তির পূর্ণ প্রকাশ, তিনি স্বয়ং ব্রহ্মের পুরুষোত্তম রূপ – তাই তিনিই পারতেন তাঁর নিজের উপর পূর্ণ শ্রদ্ধা রাখতে এবং অপর যে কোন ব্যক্তি, যে কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদ, এমনকি জড়বস্তুর প্রতিও পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে !
এই জন্যই বলা হচ্ছিলো _ঐরকমটা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে করা কখনোই সম্ভব নয় ! তার কারণ আমরা তো আমাদের স্বরূপ জানি না – আমরা তো নিজেদের একটা খন্ডরূপে, অংশরূপে, স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেই বসে আছি ! আমরা নিজেদেরকে শিক্ষিত বা অশিক্ষিত, ধনী বা নির্ধন, উচ্চ বা নীচজাত, এই ধর্মাবলম্বী বা অন্য ধর্মাবলম্বী – ইত্যাদি নানাকিছু ভেবে বসে থাকি ! ফলে আমাদের মধ্যে সম্পূর্ণভাবনা আসবে কি করে ? সকলের প্রতি শ্রদ্ধা করার সংস্কার বা প্রবণতা আমাদের থাকবে কি করে? আমরা আমাদের মনের মতো বা মনের কাছাকাছি কাউকে পেলে অথবা আমার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কিছু সিনিয়রদের (যাদের কাছ থেকে আমরা কিছু পেয়ে থাকি)-কে আমাদের মতো করে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে থাকি(যেটা প্রকৃত অর্থে শ্রদ্ধা নাও হোতে পারে) ! তার বাইরে আর যেতে পারি না – বাকি সকলকেই generalise করে ফেলি ! এমনকি আমি যে ধর্মীয় আদর্শের সাথে যুক্ত – সেইটা ছাড়া এবং সেই আদর্শের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিরা ছাড়া – বাকিদেরকে চরম অশ্রদ্ধা জানাতে কসুর করি না ! উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদেরকেও দেখা যায় – সে যেটা বুঝেছে, সে যে আদর্শকে গ্রহণ করেছে – সেইটা ছাড়া বাকি যা কিছু সেগুলিকে বক্তব্যের মাধ্যমে, লেখার মাধ্যমে ইত্যাদি নানাভাবে ছোট করার চেষ্টা করে ! – এই ভাবেই চলছে আমাদের মানবসমাজ! মহাপুরুষগণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন, আর আমরা বেশিরভাগ তথাকথিত শিক্ষিত ও সভ্যরা __তাঁদের চেষ্টায় জল ঢালার প্রাণপণ আয়োজন করে চলেছি!!
আমাদের এই আহাম্মকি কবে শেষ হবে!!!??