শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের বিভিন্ন সিটিং-এ করা আলোচনা নিয়ে এখানে কথা হচ্ছিলো ৷ আমরা এখন প্রধানতঃ আলোচনা করছিলাম মানুষের ‘চরিত্র’ নিয়ে। ‘চরিত্রবান’ ব্যক্তিই সমাজের অলংকার ! অলংকার যেমন নারী বা পুরুষের শরীরে শোভাবর্ধন করে, ঠিক তেমনই চরিত্রবান পুরুষ বা চরিত্রবতী নারীর সংখ্যা যে সমাজে যত বেশি সেই সমাজ তত সভ্য, তত সুসংস্কৃত, ততটাই অলংকৃত, শোভাবর্ধক। চরিত্রবান মানুষ মানেই উন্নত মানুষ ! আর উন্নত মানুষ মানেই আধ্যাত্মিক মানুষ !
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – প্রকৃতপক্ষে চারটি জীবনচর্যা উন্নত মানুষের পরিচায়ক। সেইসব মানুষই আধ্যাত্মিক বা উন্নত যাদের জীবনে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যাদের জীবনে ত্যাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যাদের জীবনে প্রেম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং যাদের জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গুরুমহারাজ মানব জীবনের ওই চারটি শ্রেষ্ঠ জীবনাদর্শের আচরণ কেমনটি হবে, তারও দিকনির্দেশ করে দিয়েছিলেন। উনি বলেছিলেন – ‘সত্যে’ প্রতিষ্ঠিত হোতে হলে সাধককে সদাচারী হোতে হবে (এখানে ব্যক্তি না বলে সাধক বলা হোলো, কারণ নিষ্ঠা ভরে জীবনাদর্শের ঐ চারটি আচরণ-ই তো সাধনা) ! ‘সদাচারী’- এই কথাটি ছোট্ট কিন্তু এর ব্যাপ্তি যে কতটা, তা লিখে শেষ করা যাবে না!!
বৌদ্ধশাস্ত্রে সৎবাক্য, সৎকর্ম, সৎসংকল্প – ইত্যাদি নানান সৎ-যুক্ত শব্দ দিয়ে সদাচারকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে – কিন্তু এইসব শব্দ দিয়ে কী কখনো তা বোঝানো যাবে ? কিন্তু সত্যি সত্যিই যদি কোনো সদাচারী ব্যক্তিকে চোখের সামনে কখনো দেখা যায় – তাঁকে দেখেই শত শত বা সহস্র সহস্র মানুষ বুঝে যাবে যে ‘সদাচার’ কাকে বলে বা ঠিক ঠিক ‘সদাচারী’ মানুষ কেমনটা হওয়া উচিৎ ! তাঁর সামনে দাঁড়ালেই বাকী মানুষদের মাথা এমনিতেই নত হয়ে যাবে ! তাঁর চোখের দিকে চেয়ে কথা বলাই মুস্কিল হয়ে পড়বে। তাঁর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ‘সত্য’ চোখের দৃষ্টি দিয়ে এতো অঝোর ধারায় ঝরে পড়তে থাকে যে ওনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের মতো সাধারণ ব্যক্তিদের সারাজীবনের সমস্ত মিথ্যাগুলি ভয়ে বাইরে বেড়িয়ে আসতে থাকে এবং এক ভয়ানক লজ্জার মধ্যে ফেলে দেয় ! তাই তাঁর চোখের দিকে তাকাতে গেলেই নিজের চোখ নীচের দিকে নেমে যায় – মস্তক আপনা-অাপনি অবনত হয়ে যায়। এটাই ঠিক ঠিক ‘শ্রদ্ধা’! আপনি হয়তো মাথা ঝোঁকাতে চাইছেন না – কিন্তু আপনার মাথা কখন যে ঝুঁকে গেছে – তা আপনি নিজেই জানতে পারবেন না ! যাঁর কাছে গেলে অথবা যাঁকে পেলে আপনার এমনটা হয়, সেই ব্যক্তিই সত্যে প্রতিষ্ঠিত ! সেই ব্যক্তিই প্রকৃত চরিত্রবান ! সেই ব্যক্তিই যথার্থ শ্রদ্ধাভাজন !!
মানবের শ্রেষ্ঠ জীবনচর্যার পরবর্তী আচরণ বোঝাতে গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ‘ত্যাগ’ মূর্ত হয় ‘পরোপকারে’! পরোপকার মানুষ কতটা করতে পারে ? বহু ধর্মমতে রয়েছে – কোনো ব্যক্তির আয়ের এক-পঞ্চমাংশ বা এক-চতুর্থাংশ সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য, ধর্মস্থানের উন্নতির জন্য দান করতে হবে ! ভারতীয় পরম্পরায় রয়েছে – দুর্বল ব্যক্তিকে যে কোনোভাবে সাহায্য করার সংস্কার ! গুরুমহারাজের কাছে শুনেছিলাম – কুকুরের কাছে ঋষিরা ‘যে ছয়টা গুণ মানবের গ্রহণ করা উচিত’- বলে চিহ্নিত করেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতমটি হলো – বিপন্নকে সাহায্য করার মানসিকতা ! দেখা যায় কোনো কুকুর হয়তো কোথাও শান্তভাবে শুয়ে বিশ্রাম করছে, হঠাৎ করে _দূরে যদি কোনো কুকুর বিপন্নভাবে চিৎকার করে ওঠে – তাহলে ওই বিশ্রামরত কুকুরটি সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠে পড়ে এবং চিৎকার করে সাড়া দিতে থাকে ! অর্থাৎ সেই বিপন্ন কুকুরটিকে বলতে চায় – ” ভয় পেয়ো না – আমি তোমার পাশে রয়েছি !” তারপর যদি সে দেখে যে বিপন্ন কুকুরটি তখনও চিৎকার করছে(সাহায্য চাইছে)– তখন এই কুকুরটি ছুটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় !
সুতরাং নিম্নতর প্রাণীদের মধ্যেও বিপন্নকে রক্ষা করা বা অপরকে সাহায্য করার প্রবনতা খুবই রয়েছে। গুরুমহারাজ বলেছিলেন – হাতিরা জঙ্গলের পুলিশের ভূমিকা পালন করে ! কোনো জলাশয়ে হাতির পাল যখন জল খেতে যায়, তখন সেখানে তাঁদের সাহসে হরিণের মতো দুর্বল প্রাণীরাও সেখানে জলপান করতে যায়। কিন্তু বাঘ বা সিংহরাও জানে যে, জলাশয়ে সকলকেই আসতে হবে – তাই তারা ঝোঁপে-ঝাড়ে ওঁৎ পেতে বসে থাকে_ দুর্বল, অসহায় শিকারের আশায়। এইসব হিংস্র প্রাণীদের সন্ধান যদি হাতিদের দলপতি পেয়ে যায় তাহলে সে বাঘ বা সিংহদেরকে guard করে দাঁড়িয়ে যায় – যাতে অন্যান্য প্রাণীরা নিরাপদে জল খেতে পারে। সুতরাং বিপন্নকে রক্ষা করা অথবা অসহায়-দুর্বল কোনো নারীকে তার মর্যাদা দেওয়া – এটা প্রকৃতিতে শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে মানুষের তো করাটা বিচিত্র কিছু নয় ! বরং এটা করাটাই তো সহজতা,এটাই তো মনুষ্যত্বের পরিচায়ক !
কিন্তু আমরা বেশিরভাগ মানুষেরা তা করতে পারি না – কারণ আমরা আমাদের সহজতা হারিয়ে ফেলেছি, অসহজ হয়ে পড়েছি ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন এইসব কথা ! উনি আরও বলেছিলেন – এখান থেকেই সৃষ্টি হয়েছে মানুষের মনোবিকার ! আর এই বিকার বা বিকৃতি থেকেই মানুষের জীবনে, মানুষের সমাজে নেমে এসেছে যতকিছু উৎপাত, বিশৃংখলা ! মানবজীবন যেন হয়ে পড়েছে অভিশাপগ্রস্ত ! !
[ এই আলোচনার বাকি অংশ পরের দিন।]
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – প্রকৃতপক্ষে চারটি জীবনচর্যা উন্নত মানুষের পরিচায়ক। সেইসব মানুষই আধ্যাত্মিক বা উন্নত যাদের জীবনে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যাদের জীবনে ত্যাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যাদের জীবনে প্রেম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং যাদের জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গুরুমহারাজ মানব জীবনের ওই চারটি শ্রেষ্ঠ জীবনাদর্শের আচরণ কেমনটি হবে, তারও দিকনির্দেশ করে দিয়েছিলেন। উনি বলেছিলেন – ‘সত্যে’ প্রতিষ্ঠিত হোতে হলে সাধককে সদাচারী হোতে হবে (এখানে ব্যক্তি না বলে সাধক বলা হোলো, কারণ নিষ্ঠা ভরে জীবনাদর্শের ঐ চারটি আচরণ-ই তো সাধনা) ! ‘সদাচারী’- এই কথাটি ছোট্ট কিন্তু এর ব্যাপ্তি যে কতটা, তা লিখে শেষ করা যাবে না!!
বৌদ্ধশাস্ত্রে সৎবাক্য, সৎকর্ম, সৎসংকল্প – ইত্যাদি নানান সৎ-যুক্ত শব্দ দিয়ে সদাচারকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে – কিন্তু এইসব শব্দ দিয়ে কী কখনো তা বোঝানো যাবে ? কিন্তু সত্যি সত্যিই যদি কোনো সদাচারী ব্যক্তিকে চোখের সামনে কখনো দেখা যায় – তাঁকে দেখেই শত শত বা সহস্র সহস্র মানুষ বুঝে যাবে যে ‘সদাচার’ কাকে বলে বা ঠিক ঠিক ‘সদাচারী’ মানুষ কেমনটা হওয়া উচিৎ ! তাঁর সামনে দাঁড়ালেই বাকী মানুষদের মাথা এমনিতেই নত হয়ে যাবে ! তাঁর চোখের দিকে চেয়ে কথা বলাই মুস্কিল হয়ে পড়বে। তাঁর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ‘সত্য’ চোখের দৃষ্টি দিয়ে এতো অঝোর ধারায় ঝরে পড়তে থাকে যে ওনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের মতো সাধারণ ব্যক্তিদের সারাজীবনের সমস্ত মিথ্যাগুলি ভয়ে বাইরে বেড়িয়ে আসতে থাকে এবং এক ভয়ানক লজ্জার মধ্যে ফেলে দেয় ! তাই তাঁর চোখের দিকে তাকাতে গেলেই নিজের চোখ নীচের দিকে নেমে যায় – মস্তক আপনা-অাপনি অবনত হয়ে যায়। এটাই ঠিক ঠিক ‘শ্রদ্ধা’! আপনি হয়তো মাথা ঝোঁকাতে চাইছেন না – কিন্তু আপনার মাথা কখন যে ঝুঁকে গেছে – তা আপনি নিজেই জানতে পারবেন না ! যাঁর কাছে গেলে অথবা যাঁকে পেলে আপনার এমনটা হয়, সেই ব্যক্তিই সত্যে প্রতিষ্ঠিত ! সেই ব্যক্তিই প্রকৃত চরিত্রবান ! সেই ব্যক্তিই যথার্থ শ্রদ্ধাভাজন !!
মানবের শ্রেষ্ঠ জীবনচর্যার পরবর্তী আচরণ বোঝাতে গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ‘ত্যাগ’ মূর্ত হয় ‘পরোপকারে’! পরোপকার মানুষ কতটা করতে পারে ? বহু ধর্মমতে রয়েছে – কোনো ব্যক্তির আয়ের এক-পঞ্চমাংশ বা এক-চতুর্থাংশ সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য, ধর্মস্থানের উন্নতির জন্য দান করতে হবে ! ভারতীয় পরম্পরায় রয়েছে – দুর্বল ব্যক্তিকে যে কোনোভাবে সাহায্য করার সংস্কার ! গুরুমহারাজের কাছে শুনেছিলাম – কুকুরের কাছে ঋষিরা ‘যে ছয়টা গুণ মানবের গ্রহণ করা উচিত’- বলে চিহ্নিত করেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতমটি হলো – বিপন্নকে সাহায্য করার মানসিকতা ! দেখা যায় কোনো কুকুর হয়তো কোথাও শান্তভাবে শুয়ে বিশ্রাম করছে, হঠাৎ করে _দূরে যদি কোনো কুকুর বিপন্নভাবে চিৎকার করে ওঠে – তাহলে ওই বিশ্রামরত কুকুরটি সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠে পড়ে এবং চিৎকার করে সাড়া দিতে থাকে ! অর্থাৎ সেই বিপন্ন কুকুরটিকে বলতে চায় – ” ভয় পেয়ো না – আমি তোমার পাশে রয়েছি !” তারপর যদি সে দেখে যে বিপন্ন কুকুরটি তখনও চিৎকার করছে(সাহায্য চাইছে)– তখন এই কুকুরটি ছুটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় !
সুতরাং নিম্নতর প্রাণীদের মধ্যেও বিপন্নকে রক্ষা করা বা অপরকে সাহায্য করার প্রবনতা খুবই রয়েছে। গুরুমহারাজ বলেছিলেন – হাতিরা জঙ্গলের পুলিশের ভূমিকা পালন করে ! কোনো জলাশয়ে হাতির পাল যখন জল খেতে যায়, তখন সেখানে তাঁদের সাহসে হরিণের মতো দুর্বল প্রাণীরাও সেখানে জলপান করতে যায়। কিন্তু বাঘ বা সিংহরাও জানে যে, জলাশয়ে সকলকেই আসতে হবে – তাই তারা ঝোঁপে-ঝাড়ে ওঁৎ পেতে বসে থাকে_ দুর্বল, অসহায় শিকারের আশায়। এইসব হিংস্র প্রাণীদের সন্ধান যদি হাতিদের দলপতি পেয়ে যায় তাহলে সে বাঘ বা সিংহদেরকে guard করে দাঁড়িয়ে যায় – যাতে অন্যান্য প্রাণীরা নিরাপদে জল খেতে পারে। সুতরাং বিপন্নকে রক্ষা করা অথবা অসহায়-দুর্বল কোনো নারীকে তার মর্যাদা দেওয়া – এটা প্রকৃতিতে শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে মানুষের তো করাটা বিচিত্র কিছু নয় ! বরং এটা করাটাই তো সহজতা,এটাই তো মনুষ্যত্বের পরিচায়ক !
কিন্তু আমরা বেশিরভাগ মানুষেরা তা করতে পারি না – কারণ আমরা আমাদের সহজতা হারিয়ে ফেলেছি, অসহজ হয়ে পড়েছি ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন এইসব কথা ! উনি আরও বলেছিলেন – এখান থেকেই সৃষ্টি হয়েছে মানুষের মনোবিকার ! আর এই বিকার বা বিকৃতি থেকেই মানুষের জীবনে, মানুষের সমাজে নেমে এসেছে যতকিছু উৎপাত, বিশৃংখলা ! মানবজীবন যেন হয়ে পড়েছে অভিশাপগ্রস্ত ! !
[ এই আলোচনার বাকি অংশ পরের দিন।]
