শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বিভিন্ন সিটিং-এ যে সমস্ত কথা বলতেন, সেগুলিরই আলোচনা হচ্ছিলো। এখানে গুরুমহারাজের বলা কথাগুলি পরিবেশন করা এবং সেই কথাগুলি আমরা যেমনটা বুঝেছিলাম বা সেগুলি কিভাবে আমাদের জীবনে কার্যকরী – এইসব আলোচনা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা আগের সংখ্যায় বলেছি যে, গুরুমহারাজ বলেছিলেন চারটি মূল জীবনাদর্শের কথা। মানবের জীবনের প্রধান চারটি জীবনাদর্শের মধ্যে প্রথমটি সদাচার। সেই নিয়ে আগেরদিন কিছু কথা বলা হয়েছে, আজ আলোচনা হোক ‘ত্যাগ’ নিয়ে। গুরুজীর কবিতায় রয়েছে – “পরোপকারে ত্যাগ মূর্ত হয়, স্বার্থপরতায় নয় ! – পরোপকারই জীবন !” এখানে “জীবন” বলতে ‘জীবিতের লক্ষণ’-কে বোঝানো হয়েছে। ‘জীবিত’ বলতে আবার ‘জীবন আছে যার’ – সেই অর্থে নয় ! যার কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত হয়েছে বা যার বিবেক জাগরন হয়েছে – তার বা তাদেরকে ‘জীবিত’ বলা হয়েছে ! বাকি আমরা যারা আছি – শিক্ষিত-অশিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী-শ্রমজীবী নির্বিশেষে – তারা সকলেই স্বামী বিবেকানন্দের কথায় “moving deadbody !”
গুরুমহারাজ-ও এই দুই ধরনের মানবকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন – ” জীবিতেরা পূর্ব হইতেই অনুগৃহীত, মৃতেরা পুনরুজ্জীবন লাভ করুক !” অর্থাৎ পরমানন্দ লীলায় “moving deadbody “- রাও পরমানন্দ কৃপাপ্রাপ্ত! যাইহোক, এখানে একটা কথা এসেই যাচ্ছে “পরোপকার” বলতে “পর+উপকার” বোঝানো হয়েছে। তাহলে ত্যাগব্রতীদের মধ্যে তখনও আপন বা পর এই বোধ কাজ করে থাকে ! আর তা থাকবেই বা না কেন, সাধক মানেই তো সে পথিক! সে তো এখনো অন্তিম লক্ষ্যে উপনীত হোতে পারে নি! ফলে তার এখনো অদ্বৈতের বোধ হয় নি! অদ্বৈতের বোধ হয়ে গেলে তখন আর কর্ম(সাধন-ভজন) কোথায় ? তখন তো জগৎটাই শূন্য – সেখানে আমি ছাড়া তো দ্বিতীয় কিছুই নাই ! স্থূল জগৎও নাই, তাই স্থূল কর্মও নাই ! অর্থাৎ সিদ্ধান্ত হলো এই যে, ‘ত্যাগ’ব্রত অবলম্বনকারীদের যতক্ষণ পর্যন্ত না অদ্বৈতজ্ঞান হচ্ছে ততক্ষণ তাদের নিজেদের উপকার (আত্মোন্নতি) করার সাথে সাথে_ অপরকেও সাহায্য করার মানসিকতা রাখতে হবে।
আগের দিন আমরা “সদাচারী” ব্যক্তি বোঝাতে গিয়েও ‘পরোপকারে’-র কিছুটা আলোচনা করেছিলাম। আসলে সবগুলোই তো একে অন্যটির সাথে related – তাই একটা আলোচনায় অন্যটি এসে যাওয়াটাই স্বাভাবিক !
আরো একটা কথা ঐ কবিতার লাইনে বলেছেন গুরুমহারাজ – সেটা হোলো “স্বার্থপরতা”! এটি মানুষের চারটি মূল জীবনাদর্শের অন্যতম_ ‘ত্যাগে’র বিপরীত ধর্মী অবগুণ ! গুরুমহারাজ একবার বলেছিলেন – মানুষ যদি “আত্মপর”(আত্মজ্ঞান লাভে তৎপর) হয় তাহলে ভালো। কিন্তু তা না হয়ে অধিকাংশ মানুষ “স্বার্থপর” হয়ে পড়ে এবং নিজেও কষ্ট পায় এবং সমাজের অন্যান্য member-দেরকেও কষ্ট দেয় !
এই স্বার্থপরতা মানুষকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে চলে যেতে পারে – তার ইয়ত্তা করা যাবে না ! ধরুন, এই ধরনের কোনো ‘স্বার্থপর’ মানুষ ছোট থেকে তার জীবনের পথে চলা শুরু করলো ! ছাত্রাবস্থা থেকেই সে অন্য ছাত্রদের সাথে নিজের দূরত্ব বজায় রেখে চলবে, অপরের কাছ থেকে সুবিধাটুকু ঠিক আদায় করে নেবে। তারপর যাকে যতটুকু দরকার তার সাথে ততটুকুই মিশবে বা তাকে ততটুকুই পাত্তা দেবে। এই করতে করতে অন্যদের কাছে সুবিধা নিয়ে, আবার তাদেরকেই ‘ল্যাঙ’ মেরে__ ছেলেটি জীবনে যে কোনোভাবে ঠিকই প্রতিষ্ঠা লাভ করবে (অর্থাৎ ধন, যশ ইত্যাদি লাভ করতে সমর্থ হবে)। এরপর কর্মজীবনে প্রবেশ করে ঐরূপ ব্যক্তি নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে ধনসম্পত্তি লাভের নেশায় পড়ে যাবে ! মানুষের বসবাসের জন্য যেখানে একটি মাঝারি মানের গৃহ-ই যথেষ্ট — সেখানে সে হয়তো প্রাসাদ বানাবে। তাছাড়া একটা বাড়ির জায়গায় বিভিন্ন শহরে একাধিক বাড়ি বানাবে বা ফ্ল্যাট কিনবে। তারচেয়েও যদি তার সামর্থ্য বেশি হয় – সে ইউরোপ বা আমেরিকায় বাড়ি বানাবে ! টাকা-পয়সা সঞ্চয়ের পরিমাণ যদি এমন বেড়ে যায় যে, ব্যাংকে রাখলে অধিক ইনকাম ট্যাক্স-এর আওতায় পড়ে যাবে বা আয়কর দপ্তরের চোখে পড়ে যাবে – তখন সে প্রয়োজনাতিরিক্ত টাকা বিদেশি ব্যাংকে পাঠাতে থাকবে।
এইভাবে ঐ ধরনের ব্যক্তির স্বার্থপূরণের নেশার কোনোদিনই সমাপ্তি ঘটবে না, বরং যতদিন তার সামর্থ্য থাকবে – তার এই প্রবৃত্তি শুধু বৃদ্ধিই পাবে – তবু কমবে না !
কিন্তু একজন স্বার্থপর ব্যক্তির এই কাজ করা মানেই – কতশত জন ব্যক্তিকে সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা – তাও তো ভাবা দরকার ! ধন-সম্পত্তি, সুযোগ-সুবিধা, ভোগ-ঐশ্বর্য এগুলি সবই তো নির্দিষ্ট ! যদি কয়েকজন মানুষ বা মাত্র কয়েকশত জন মানুষ ধন-ঐশ্বর্য, সম্পত্তি, সুযোগ-সুবিধার অধিকাংশ দখল করে বসে থাকে – তাহলে বাকি কোটি কোটি মানুষকে তা থেকে বঞ্চিত থাকতে হবে – তাই নয় কি ! গুরুমহারাজ উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন – মানুষের শরীরের একটা মাত্র অঙ্গ, ধরুন বাম হাতটা যদি বিশাল মোটা হয়ে যায় আর শরীরের বাকি অংশগুলি যদি তুলনায় দুর্বল হোতে থাকে – তাহলে সেই শরীরটা তো অসুস্থ শরীর এবং ওই মানুষটার শারীরিক গঠন ও odd-looking ! তাই নয় কি! ঠিক তেমনই আজকের সমাজের শরীরের অবস্থা !পৃথিবীর ধন-সম্পদ, সম্পত্তি, ভোগ-ঐশ্বর্যের অধিকাংশটা মাত্র কয়েকশত বা কয়েক সহস্র মানুষের হাতে পড়ে গেছে – ফলে তারা ফুলে-ফেঁপে ঢোল হয়ে বসে আছে ! আর এর ফলেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে (বিশেষতঃ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে) কোটি কোটি মানুষ নিরন্ন, নিরাশ্রয়, দরিদ্র, অসহায়, দুর্বল, অত্যাচারিত হয়ে জীবন কাটাতে বাধ্য হয়।৷ … [ক্রমশঃ]