গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বিভিন্ন সিটিং-এ বিভিন্ন বিষয় সম্বন্ধে যে সমস্ত আলোচনা করতেন সেগুলোই এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা আগের দিন গুরুমহারাজের বলা একজন সাধুবাবার জীবনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। ঐ সাধুটির কথা ছাড়াও গুরুমহারাজ আর একজন বৃদ্ধ সাধুবাবার কথাও বলেছিলেন, যিনি নেপালের মৎসপুছ্ এলাকায় হিমালয়ের দুর্গম একটি অঞ্চলে থাকতেন।
ঐ বৃদ্ধ সাধুবাবার অপ্সরা সিদ্ধি ছিল। তিনি শৈবসাধক ছিলেন৷ যোগসাধনা করতে করতে বিভিন্ন সিদ্ধি তাঁর করায়ত্ত হয়েছিল। সেইসব সিদ্ধির প্রয়োগ ঘটাতে গিয়ে দেখলেন সে সবই বাস্তবে ঘটে যাচ্ছে ! এতেই উৎসাহিত হয়ে উনি কোনো স্থূলরূপের সিদ্ধি অর্জন করা যায় কিনা – তারজন্য ক্রিয়াসাধন করতে শুরু করলেন। তার ফলও ফলে গেল। একেবারে স্থূলরূপে অষ্টাদশী অপূর্ব সুন্দরী কুমারীবেশে ‘অপ্সরা’ এসে তাঁর সামনে প্রকট হয়ে গিয়েছিল এবং প্রকট হয়েই সেই অপ্সরা সাধুটির জন্য কি কি করতে পারে তা জিজ্ঞাসা করেছিল! সাধুবাবা হিমালয়ের সেই নির্জন প্রান্তরে এইরকম একটা সুযোগ পেয়ে প্রথমেই তাঁর বাসস্থানটা (গুহা বা কুটিয়া গোছের কিছু একটা ছিল) একটু comfortable করতে চাইলো। মুহূর্ত্তে তা হয়ে গেল !
বিস্মিত সাধুবাবা এরপর সেই অপ্সরার কাছে কিছু প্রায়োজনীয় আসবাবের জন্য বললেন – তাও সঙ্গে সঙ্গেই এসে গেল। সাধুবাবাটি দীর্ঘদিন লোকালয়ের বাইরে থাকায় বহুদিন কোনো গরম মুখোরোচক খাবার খান নি – ফলে এবার তিনি সেগুলিই যাচঞা করলেন – তাও এসে গেল ! এ তো ভারী মজা ! এবার ঐ সাধুবাবা অন্যান্য সকল সাধুকে (যারা ঐ অঞ্চলে থাকতো বা যারা পরিব্রাজন করতে করতে ঐ অঞ্চলে এসে পড়তো – তাদেরকেও তাঁর সিদ্ধির প্রয়োগ দেখানোর জন্য বা তাদের কিছু সেবা করার জন্য ঐ অপ্সরাকে তাঁর কাছে পাকাপাকিভাবে থেকে যেতে বললেন। অপ্সরা সাধুর সব কথাতেই রাজী। আর হবে নাই বা কেন ? ঐ অপ্সরা তো এক ‘মায়া’ ! সাধুর সাধন-শক্তির ফলে সৃষ্ট এক ‘মায়া’, ঐ সাধুর-ই সৃষ্টি !
এই অদ্ভুত ব্যাপার চাউর হতে বেশী সময় লাগে নি ! চারিদিক থেকে সাধু-সন্তের দল ভিড় জমাতো ঐ সাধুটির কুটিরে। অপ্সরা সিদ্ধ ঐ সাধুটিও আগত অতিথিদের তাদের নিজ নিজ পছন্দমতো গরম গরম খাবার পরিবেশন করে আপ্যায়ন করতো। খুব পীড়াপীড়ি করলে সাধুবাবা তাঁর সিদ্ধির স্থূলরূপটি কাউকে কাউকে দেখার সুযোগ‌ও করে দিতেন। এইভাবেই প্রথমদিকে ঐ সাধুটির সময় বেশ ভালোই কেটে যাচ্ছিলো। চারিদিকে ওনার সিদ্ধির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ায় নিজেকে বেশ একটা কেউকেটা ভাব জাগতো – আর উনি সেই অবস্থাটাকে খুব enjoy-ও করতেন।
কিন্তু ‘চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়’৷ দিন যত কাটতে লাগলো – হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলের সাধুদের কাছে ঐ ব্যাপারটা ‘জোলো’ হয়ে গেলো। ফলে সাধুটির আশ্রম আবার সেই পূর্বের অবস্থায় ফিরে গেল। সাধুটিরও বয়স বাড়তে থাকলো, সাধনশক্তির প্রয়োগ ঘটে যাওয়ায় তাঁর শরীর দ্রুত ভেঙে পড়তে লাগলো। কিন্তু আশ্চর্য্যের ব্যাপার এই যে, সেই অপ্সরা মা-টির কিন্তু শরীরের কোনো পরিবর্ত্তন হোলো না ! সে সেই অষ্টাদশীবর্ষীয় যেমন ছিল – তেমনটিই রয়ে গেল !
এদিকে সাধুটির বয়স বাড়ার সাথে সাথে এবং পুনরায় একা হয়ে যাবার ঘটনার পর থেকে তাঁর মধ্যে একটা আত্মগ্লানির ভাব দেখা দিল। সদা-সর্বদা তাঁর মনে হোতে লাগলো – সেই ছোট বয়সে অন্তরে তীব্র বৈরাগ্য জাগায় সে গৃহত্যাগ করেছিল, ঈশ্বরলাভ-ই তাঁর জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল – তারজন্য সে কত সাধন-ভজন করেছে, কত কৃচ্ছ্বসাধন করেছে, কত সাধু-যোগীর পায়ে ধরে চোখের জলে তাঁদের কৃপাভিক্ষা করেছে ! আর আজ ! সমস্ত সাধনফল নিঃশেষ হয়ে গেছে, শরীরেও বল নাই, নতুন করে কিছু করার উদ্যমও নাই ! আর এদিকে তাঁর সিদ্ধির স্থূলরূপ ‘অপ্সরা’ তাকে ছেড়ে দিতেও চায় না ! বৃদ্ধ সাধুটি কয়েকবারই তাকে অনুরোধ করেছিল – কিন্তু মা-টি যেতে চায়নি ! বলেছিল – ” তোমার অসুবিধা কি হচ্ছে বলো না – আমি সব পূরণ করে দেবো ! শুধু আমাকে চলে যেতে বোলো না !”
সাধুটি আর কি করবে ? বৃদ্ধ বয়সে চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কিছু করার উপায় ছিল না ! সাধুটি শুধু দু-চোখের জল ফেলে তার আরাধ্য শিবের আরাধনা কোরতো, আর তাঁর কাছে এই অপ্সরার হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য নিরন্তর প্রার্থনা কোরতো ! অপ্সরা মা-টির হাত থেকে মুক্তি না পেলে যে তার নিস্তার নাই – এটা ঐ সাধুটি ভালোমতোই বুঝে গেছিলো। কারণ এই অপ্সরা মা-টি আসার পর থেকেই সাধুটি আর তেমন করে সাধন-ভজন করতে পারতো না ! তাছাড়া সাধন করার চেষ্টা করলেও ঐ মা-টি তাকে তা করতেও দিতো না। মা-টি সর্বদা চাইতো সাধুটি তার বশীভূত হয়ে থাকুক ! সাধন করে উন্নত হোলে অন্য সিদ্ধি এসে তার এই সিদ্ধিটাকে নষ্ট করতে পারে – এই ভয় ছিল ঐ অপ্সরা মা-টির ! (ক্রমশঃ)