শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের বলা কথা এবং তাঁর মহিমার কথা নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছিলো। এতদিন পর্যন্ত ‘পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা’-য় বেশিরভাগ অংশ জুড়ে ভগবান পরমানন্দ স্বামীর বলা কথাগুলি নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছে – তুলনায় তাঁর মহিমা শক্তির কথা অনেকটাই কম বলা হয়েছে । অবশ্য এটা ঠিকই যে ভগবানের মহিমা বর্ণনা করতে পারবেই বা কে ? তাঁর মহিমার কথা যতই বলার চেষ্টা করা হবে – ততই যেন ভগবানকে, তার অনন্ত শক্তিকে ছোট – আরও ছোট – আরও ছোট করে ফেলা হবে ! পুষ্পদন্ত নামে একজন শিবভক্ত শিবমহিম্ন স্ত্রোত্র লিখতে গিয়ে লিখেছিলেন – “অসিত-গিরি-সমং স্যাত্ কজ্জলং সিন্ধু-পাত্রে
সুর-তরুবর-শাখা লেখনী পত্রমুর্বী ।
লিখতি যদি গৃহীত্বা শারদা সর্বকালং
তদপি তব গুণানামীশ পারং ন যাতি ॥”
– এই শ্লোকের বাংলা অর্থ হোলো এই যে, “পৃথিবীর সমস্ত কালো কালো পাহাড়-পর্বতগুলি যদি কালির ‘বরি’ হয়, পৃথিবীর সমস্ত তরুরাজি দিয়ে যদি কলম বানানো হয় এবং স্বয়ং সরস্বতী যদি লেখিকা হয়ে সর্বকাল ধরে লিখে যান, তা হলেও হে শিব ! তোমার মহিমা বর্ণনা করা যাবে না।”
তাহলে – আপনারাই বলুন আমাদের মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র চেতনার নর কি করে ভগবান পরমানন্দের মহিমা বর্ণনা করতে পারবে !! বহু উচ্চ উচ্চ সাধক, বহু মহাত্মা – উপরিউক্ত জ্ঞান লাভ করার পর মৌন হয়ে গেছেন ! ভগবানের কথা ভেবে, তাঁর নাম স্মরণ-মনন করে বা হয়তো একবার দু’বার তাঁর নাম উচ্চারণ করে নয়ন জলে বুক ভাসিয়েছেন আর ভাব-সমুদ্রের অতলে ডুব মেরে আত্মস্থ হয়ে গেছেন, সমাধিস্থ হয়ে গেছেন ! সেখানে ক্ষুদ্রমতি সাধারণ মানুষ হয়ে ভগবানের ‘মহিমা’ বলতে যাওয়া চরম মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয় !!
তাই ভগবান পরমানন্দ নিজে যেটুকু স্বয়ং তাঁর কথা শ্রীমুখে বলে গেছেন সেটাই বলার চেষ্টা করা এবং আমরা অতিক্ষুদ্র হয়েও সেই বৃহতাতিবৃহৎকে যতটুকু বুঝেছি, তাঁর মহিমা শক্তির যতটুকু পরিচয় পেয়েছি – সেইটুকু সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার প্রচেষ্টায় এই লেখা – এটুকুই বলা যায়।
আর একটু সাহস রয়েছে – সেটাও বলে নিই ! বৈষ্ণব পদে রয়েছে – “তুঁহু জগন্নাথ, জগতে কহায়সি ! মুই নহি জগত কা ছোড়্ !” অর্থাৎ “তুমি জগতের নাথ, আর আমি তো জগৎ ছাড়া নই ! তাই তোমার প্রতি আমারও অধিকার আছে – তুমি আমারও নাথ !” সুতরাং ‘আমার নাথে’র সম্বন্ধে দুটো স্তুতিবাক্য আমি বলতেই পারি – সেটা আমার জন্মসূত্রে পাওয়া অধিকার !
ঈশ্বরের যখন অবতরণ হয়, তখন যে বিশেষ শরীর ধারণ করে তিনি লীলা করেন, সেই শরীরকেই বলা হয় ‘ভগবান’! সেই অর্থে ভগবান শ্রীরাম, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য, ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ আর অতি সাম্প্রতিককালের ভগবান শ্রীশ্রীপরমানন্দ স্বামী ! ভগবানের মধ্যে অষ্টসিদ্ধি অর্থাৎ অণিমা, লঘিমা, মহিমা, প্রাপ্তি, প্রাকাম্য, ঈশিতা, বশিতা ও কামবশয়িতা – এই আটপ্রকার শক্তির একত্র প্রকাশ দেখা যায়। আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ভগবানের ‘মহিমা’ শক্তি ! কিন্তু তার আগে বিভিন্ন প্রকার শক্তির প্রকাশ কিভাবে ক্রিয়াশীল থাকে তার একটা ধারণা দিয়েছিলেন গুরুমহারাজ – সেটাই বলা যাক্।
অণিমা > অণুবৎ হওয়া বা সূক্ষ্মশরীর ধারণ করা৷
লঘিমা > পাতলা বায়বীয় শরীর ধারণ করা৷
মহিমা > বৃহৎ আয়তন তথা বৃহৎ শরীর ধারণ করা।
প্রাপ্তি > ইন্দ্রিয়গণের উপর আধিপত্য এবং ইন্দ্রিয়াদির ভোগ্যবিষয় ইচ্ছামাত্র প্রাপ্ত হওয়া।
প্রাকাম্য > দূরদর্শন, দূরশ্রবণ, দূরগন্ধপ্রাপ্তি, দূরস্বাদগ্রহণ, দূরস্পর্শ্য ও দুষ্প্রাপ্য বিষয়ভোগ।
ঈশিতা > দূরদূরান্তব্যাপী নিজ শক্তি প্রেরণের সামর্থ্য।
বশিতা > ক্ষুধা-তৃষ্ণারহিত হওয়া, শীত-গ্রীষ্মে ক্লেশভোগ না করা।
কামবশয়িতা > ভোগের সামগ্রী সামনে থাকা সত্ত্বেও ভোগে নিস্পৃহ থাকা বা নিবৃত্তি আসা।
এছাড়াও আরো ‘সিদ্ধি’ আছে – কায়াকল্প, পরকায়াপ্রবেশ, পরচিত্তপ্রজ্ঞা, ইচ্ছামৃত্যু, সংকল্পসিদ্ধি ইত্যাদি।
পূর্বোক্ত ওই আট প্রকারের সিদ্ধির মধ্যে যে ‘মহিমা সিদ্ধি’-র উল্লেখ রয়েছে,সেটার প্রাপ্তি সাধকদের সাধন-সাধ্য ব্যাপার! আমাদের আলোচ্য বিষয় “ভগবানের মহিমা”_এটি অবতারগণের স্বতঃপ্রকাশিত শক্তি। এই শক্তি ওনাদেরকে আলাদা করে অর্জন করতে হয় না!
সাধকগণের সাধনার দ্বারা এক একটা সিদ্ধি অর্জন করে তার প্রকাশ ঘটানো, আর অবতার পুরুষদের আট প্রকার সিদ্ধির‌ই স্বতঃপ্রকাশ-এর মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ ! আমাদের আলোচনায় সেই দিকগুলোই উঠে আসবে !
ভগবান পরমানন্দের “মহিমা শক্তি”_র প্রকাশ আমরা যা দেখেছিলাম, সেইসব আলোচনা শুরু হবে পরবর্তী সংখ্যা থেকে !