শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা উঠলেই মহাসাধক সাক্ষাৎ শিবকল্পপুরুষ ন’কাকা (শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়) বলতেন – ” সখী সে হরি কেমন বল্ – নাম শুনে যার এত প্রেম জাগে, চোখে আসে এত জল !” হরির অবতার পরমপুরুষ স্বামী পরমানন্দের মহিমার কথা বলতে গেলে – ওই কথাই বলতে হয় ! পরমপ্রেমিক পরমানন্দ – যাঁর পরমপ্রেমের পরশ যে পেয়েছে – সেই মজেছে ! এ জীবনটা – তাঁর নাম শুনে, ‘এত প্রেম জাগা’ নিয়ে, আর ‘চোখের জল’ ফেলেই কাটাতে হবে – তাছাড়া আর কিছুই করার নাই ! কারণ, ‘তিনি যে, তার চরণের দাস করে নিয়েছেন’_এই কৃতজ্ঞতা জানানোর অন্য কোনো আর কি উপায় রয়েছে, তা কি কারো জানা আছে? আমি যে জানি না_তাই “চোখে ভরে আসে জল”!
গুরুমহারাজের নির্বিকল্পের কথা আমি প্রথম শুনেছিলাম তপিমার বাবা শ্রীযুক্ত রমাপ্রসাদ মুখার্জির কাছে। তখন প্রথম প্রথম আশ্রম যাচ্ছি – কিন্তু বনগ্রামের মুখার্জি বাড়ির সাথে আমার একেবারে গোড়া থেকেই আলাপ এবং ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেছিলো। ফলে আশ্রমে গেলেই আমি সময়ে-অসময়ে মুখার্জি বাড়িতে চলে যেতাম। ওনাদের বাড়ির সকল member খুবই অতিথিপরায়ণ এবং সকলের প্রতি কর্তব্যপরায়ণ ছিলেন। ফলে আমাদের মতো যে সমস্ত বাইরের ভক্তরা আশ্রমে যেতো – তারা বনগ্রামের মুখার্জি বাড়িতে “always welcome” ছিল। অবশ্য এটা বলা চলে যে, বনগ্রামের অনেক বাড়িতেই এই ব্যাপারটা ছিল – সেইসময় অনেক বাড়িতে গিয়েই আমি দেখেছিলাম যে, তারাও আমাদেরকে (বাইরের ভক্তদেরকে) খুবই আপ্যায়ন করতো, চা জলখাবার offer করতো। বনগ্রামের অনেক বাড়ির member-রাই ততদিনে গুরুমহারাজের মহিমা শক্তির পরিচয় পেয়ে গেছিলো – তাই এই যে আমাদের যেটুকু খাতির, তা সেই মহান পুরুষের মহিমা-র জন্যই !
যাইহোক, যে কথা হচ্ছিলো সেই কথাতেই ফিরে যাই। আমরা ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ-বিষয়ক বইগুলি পড়ে ফেলার সুবাদে সহজ-সমাধি বা ভাবসমাধি, সবিকল্প সমাধি এবং নির্বিকল্প সমাধি – এই শব্দগুলি সম্বন্ধে এবং এইগুলির লক্ষণসমূহ সম্বন্ধে অল্পবিস্তর পরিচিত ছিলাম। তাই রমাপ্রসাদ বাবু (মেজ কাকা)-র কাছ থেকে প্রথম যেদিন গুরুমহারাজের নির্বিকল্প সমাধির কথা শুনেছিলাম – সেদিন খুবই কৌতুহলী হয়ে পড়েছিলাম সব ঘটনাটা শোনার জন্য ! মেজোকাকা বার বার যেটা বলছিলেন, সেটা হোলো – ” বলে কয়ে নির্বিকল্প রে ! যেদিন নির্বিকল্পে বসবে – তার আগের রাতে আমাদেরকে পরমানন্দ বলল – ‘ বাবা ! মা (জগদম্বা)-য়ের নির্দেশে আমাকে নির্বিকল্পে বসতে হবে।’ তারপর ও (গুরুজী) নিজেই কিভাবে বসবে, কোথায় বসবে, কতদিন নির্বিকল্পে থাকবে, নির্বিকল্প অবস্থা কাটার পর ওর শরীরের কি অবস্থা হবে এবং তখন কি কি করতে হবে – সব বুঝিয়ে বলে দিলো ! পুরোনো ঘি সহ আরো কিছু কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস জোগাড় করে রাখতে বললো, আবার সেগুলি কোথা থেকে পাওয়া যাবে – তারও হদিশ দিয়েছিল !”
এইসব কথা শুনে আমার অন্তঃকরণ গুরুমহারাজের প্রতি কেমন যেন একটা নির্মল শ্রদ্ধায় ভরে উঠতো ! আর খুব আনন্দ হোতো এই ভেবে যে, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের ন্যায় এমন একজনকে গুরু হিসাবে লাভ করেছি – যাঁরও নির্বিকল্প সমাধি হয়েছিল – যিনি নির্বিকল্পের ভূমি থেকে নেমে এসে মানব-কল্যাণের নিমিত্ত শরীর ধারণ করে রয়েছেন ! সহস্র সহস্র মুনি-ঋষিরা যে স্থিতি প্রাপ্ত হবার জন্য যুগ যুগ ধরে সাধনা করে চলেছেন – সেই দেবদুর্লভ, ঋষিদুর্লভ অবস্থা যাঁর অনায়াসলভ্য – তাঁর মহিমা তো স্বতঃপ্রকাশ, তা আর অন্য কেউ কিভাবে বোঝাতে পারবে ?
গুরুমহারাজের নির্বিকল্প কিন্তু ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মতো গুরুর (তোতাপুরী) নির্দেশে, উপস্থিতিতে এবং তত্ত্বাবধানে হয় নি – সরাসরি ৺মায়ের নির্দেশে হয়েছিল ! গুরুমহারাজের কাছে আমরা শুনেছিলাম – গুরুমহারাজ একদিন যখন বনগ্রাম আশ্রম থেকে সন্ধ্যার দিকে গ্রামের মুখার্জি বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন, তখন যাবার পথে (এখন যেখানে হসপিটাল হয়েছে – ঠিক সেইখানেই) আকাশবাণীর মাধ্যমে মা জগদম্বা নির্দেশ দিয়েছিলেন – ” রাজা ! তুই এবার নির্বিকল্পটা করে নে।” গুরুমহারাজ বলেছিলেন – মা জগদম্বা গুরুমহারাজকে “রাজা” বলে সম্বোধন করতেন ! তা তো করবেন-ই ! ‘রাজা’-কে রাজা-ই তো বলবেন ! সকল মানুষের মনের রাজা, জীব-জগতের রাজা, পৃথিবীর রাজা, বিশ্বজগৎ-সংসারের ‘রাজা’-কে “রাজা” ছাড়া আর কি-ই বা বলা যেতে পারে ! আপনারা তো দেখেছেন পরমানন্দের কেমন perfect ‘রাজপুরুষ’ শরীর ছিল ! গুরুমহারাজকে খালি গায়ে তখন দেখার সৌভাগ্য খুব কম জনের-ই হয়েছে (তবুও বহুজনের হয়েছে ! এখন অবশ্য ছবির মাধ্যমে অনেকেই দেখেছে)– কিন্তু সরাসরি যারা দেখেছে তারা জানে যে, ওনার উন্মুক্ত শরীরের দিকে তাকালে চোখ ঝলসে যাবার মতো হোত ! এতো glaze বা glamour কি কখনও সাধারণ মানুষের হোতে পারে ? হোতেই পারে না !
স্বামী পরমানন্দের শরীরটাই তো ছিল ‘মহিমময়’! তাঁর কথা বলার স্টাইল দেখেছেন (ভিডিওর মাধ্যমে এখনও দেখা যায়)–তাঁর হাঁটা চলা ? যদি না দেখে থাকেন, ভালো করে ভিডিওগুলো দেখবেন – তাহলেই আপনারও মনে হবে “পৃথিবীর রাজা” হেঁটে যাচ্ছেন ! তাঁর কথা বলার style বা ভঙ্গিমা দেখে বুঝতে পারবেন – ইনি পৃথিবীগ্রহের শ্রেষ্ঠ শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীগণের ‘রাজা’ কথা বলছেন ! তাহলে তিনি তো রাজা-ই ! তাই হয়তো মা জগদম্বা গুরুমহারাজকে ‘রাজা’ বলে সম্বোধন করতেন (অবশ্যই এটা আমাদের ক্ষুদ্রবুদ্ধির ব্যাখ্যা)!
গুরুমহারাজের নির্বিকল্প নিয়ে আরো কিছু কথা পরের দিন ….! (ক্রমশঃ)