শ্রী শ্রী গুরুমহারাজের জীবনে ঘটে যাওয়া দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা আমরা আগের দিন উল্লেখ করেছিলাম – যেগুলিকে স্বয়ং গুরুমহারাজ তাঁর জীবনে ঘটা “ঈশ্বরের মহিমার প্রকাশ”- বলে বর্ণনা করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে গুরুজীর গুরুদেব অর্থাৎ পরমগুরুদেব পূজ্যপাদ রামানন্দ অবধূতজী ওনাকে (গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দকে) এই কথা বলেছিলেন। সেইসব কথাতেই আসছি – কিন্তু আগের কথা আগে !
গুরুমহারাজের সঙ্গে ঐ যে দুটি ঘটনা ঘটে গিয়েছিল – গুরুমহারাজ বলেছিলেন যে, ঐ দুটি ঘটনারই ঘটার পিছনে কোনো কারণ উনি যুক্তি,বিচার ইত্যাদি দিয়ে খুঁজে পাননি ! এই কথাটা সত্যিই আশ্চর্য !! স্বয়ং ভগবান তিনি ! তাঁর(ভগবান স্বামী পরমানন্দ)-ই জগৎ – এই জগতের ভালো-মন্দের ভার যাঁর উপর, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র থেকে অতি বৃহৎ সবকিছুরই মালিক যিনি, মহামায়া-যোগমায়া সবাই যাঁর একান্ত অনুগতই শুধু নয় – তাঁর আজ্ঞা পালনের জন্য সদা-প্রস্তুত – সেই তিনি কিনা বললেন – “তোরা বিশ্বাস করবি কিনা জানি না, কিন্তু আমি সত্যি বলছি, আমি অনেক চিন্তা করেও ওই ঘটনাদুটির নির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাইনি ! তবে এটা বুঝেছিলাম যে, বর্তমানে মা জগদম্বা আমার এই পরমানন্দ-রূপ শরীরটাকে নিয়ে নানারকম খেলা করছেন !”
যাইহোক, গুরুমহারাজ বলেছিলেন যে, তিনি এরপর আর ঐ দুটি বিষয় নিয়ে চিন্তা করা ছেড়ে দিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে তিনি রুরাল ইলেক্ট্রিফিকেশনের চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই উনি গর্ভধারিণী মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হিমালয় অঞ্চলের উত্তরকাশীতে গিয়ে রামানন্দ অবধূতজীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন ! তখন রামানন্দজীর বয়স ছিল ১৫৭ বছর (রামানন্দজী ঐ বয়সে একমাত্র গুরুমহারাজকেই সন্ন্যাসদীক্ষা দিয়েছিলেন। আর গুরুমহারাজকে নির্দেশ দিয়েছিলেন কৈলাস আশ্রমের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিদ্যানন্দ গিরির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সংস্কারের কাজটা করিয়ে নিতে। গুরুমহারাজ অবশ্য কোনোরকম সংস্কারে আবদ্ধ ছিলেন না – তাই তিনি প্রথমটায় সন্ন্যাস সংস্কার করাতেই চাননি ! কিন্তু পরম গুরুদেব ওনাকে বলেছিলেন – “তোমার জন্য কোনো সংস্কারের প্রয়োজন নাই ঠিকই – কিন্তু মানুষের জন্য সবকিছুরই প্রয়োজন রয়েছে ! এমনকি তোমার সন্ন্যাস সংস্কারেরও প্রয়োজন রয়েছে !”
সেইজন্যেই গুরুমহারাজ প্রায় দুই/তিন মাস কৈলাস আশ্রমে থেকে সমস্ত রকম সন্ন্যাস সংস্কারের ক্রিয়াদি সম্পন্ন করা, বেদাদি শাস্ত্র অধ্যয়ন সহ দশনামী সম্প্রদায়ভুক্ত সন্ন্যাসীদের পালনীয় কর্তব্যের শিক্ষাদিও সম্পন্ন করেছিলেন।।
রামানন্দজীর কাছে থাকাকালীন একদিন গুরুমহারাজ যখন পরম-গুরুদেবের পদসেবা করছিলেন, তখন উনি কথা প্রসঙ্গে তাঁর চাকুরী করাকালীন ঐ ঘটনা দুটির উল্লেখ করেন এবং এটাও বলেন যে, তিনি অনেক চিন্তা করেও ঐরূপ অসম্ভব ঘটনা ঘটার পিছনে কি কারণ থাকতে পারে – তা খুঁজে পান নি !
গুরুমহারাজ আমাদেরকে যেটা বলেছিলেন সেটা হোল – “দ্যাখ্, আমি যদি সংকল্প করতাম বা মা জগদম্বার কাছে ঐরূপ কোনো ঘটনা ঘটার জন্য প্রার্থনা জানাতাম – তাহলে এমনটা ঘটতেই পারতো ! কিন্তু আমি এসব কিছুই করিনি, অথচ এমনটা ঘটলো কেন – এটাই ছিল ওনার কাছে আমার জিজ্ঞাসা !” যাইহোক, সেদিন উত্তরকাশী গঙ্গাতীরে অবস্থিত রামানন্দ অবধূতজীর কুটিয়ার সামনে গুরুর পা আপন কোলে তুলে নিয়ে গুরুজী স্বামী পরমানন্দ যখন তাঁর গুরুদেব রামানন্দজীকে এই জিজ্ঞাসা রেখেছিলেন, তখন রামানন্দজী উত্তর দিয়েছিলেন – “ব্রহ্ম কা অনন্ত মহিমা হোতা হ্যায় বেটা ! তেরা সাথ ও যো হুয়া – উহ্ ভি ব্রহ্ম কা হি মহিমা হ্যায়!”
পরমগুরুদেব রামানন্দজী ব্রহ্মজ্ঞানী ছিলেন, উনি সবসময়েই ব্রাহ্মী স্থিতিতে অবস্থান করতেন ! ফলে সর্বদা ব্রহ্মময় জগৎ দেখতেন – সেইজন্যেই উনি ‘মহিমা’ বলতে ‘ব্রহ্মের মহিমা’র কথাই বলেছিলেন।
গুরুমহারাজ অবশ্য এর আগে হিমালয়ের আর একজন ভক্তিমার্গের সিদ্ধ সাধককেও এই একই কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন। সব কথা শুনে সেই সিদ্ধ ভক্ত গুরুমহারাজকে বলেছিলেন – “এই ঘটনাগুলি ছিল ঈশ্বরের (ভগবানের) মহিমার প্রকাশ !”
..[ক্রমশঃ]