শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ ! ভগবান স্বামী পরমানন্দ ! তাঁর কথা, তাঁর মহিমার কথা বলে বা লিখে শেষ করা যায় না ! শেষ করা যায় না অর্থে – যারা বলবে বা লিখবে তারাই তো তাঁর লীলার কিয়দংশ মাত্র জানে, তাহলে তারা সবটা বলবেই বা কি করে লিখবেই বা কি করে ? ঐ অন্ধদের হস্তীদর্শনের মতোই হাতরে হাতরে যে যেটুকু বুঝেছে বা দেখেছে – সে সেইটুকুই বলতে পারে অথবা লিখতে পারে – তার বেশি একচুলও নয় ! জোর করে যদি কিছু করতে যায় – তাহলেই গোলমাল করে ফেলবে !
গুরুমহারাজের পৃথিবী গ্রহে অবতরণের কথা আগের দিন বলা হচ্ছিলো। আমি একবার শ্রীরামপুরে রমেনবাবু (রমেন চক্রবর্তী)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম (গুরুমহারাজের শরীর ছাড়ার পরে) – ” আচ্ছা রমেনবাবু, আপনিও গুরুমহারাজের অবতরণ নিয়ে ‘শ্রুতি’ গ্রন্থে লিখেছেন ! ঐ যে ওখানে বলা হয়েছে __ “‘আমি’ প্রথমে ‘শতভিষা'(নক্ষত্রে)-য় নামলাম এবং ওখান থেকে সংস্কাররাশি এবং শক্তি গ্রহণ করে আবার সূর্যমন্ডলের দিকে আকর্ষণ অনুভব করলাম এবং দুরে ছোট্ট পৃথিবীগ্রহ আমার দৃষ্টিগোচর হোল”– ইত্যাদি। –এখানে ঐ ‘আমি’টি ঠিক কে বা কি বা ঠিক কিরকম ? ওটি তো কোনো ব্যক্তি নয়, বস্তু বা বিষয় নয়, কোনো শক্তিও নয় – তাহলে সেটি কি ?” আসলে সেইসময় আমার মনে এই নিয়ে একটা ঝড় চলছিল – নিজে নিজে ঠিক সন্তোষজনক কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাই হাতের কাছে রমেনবাবুকে পেয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম । কিন্তু দেখলাম_রমেনবাবুও তেমন কিছুই বললেন না, জিজ্ঞাসাটাই এড়িয়ে গেলেন ! পরে ন’কাকা (শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী)-র সাথে কথা বলে আমার ঐ ব্যাপারে মনের সন্দেহটা মিটেছিল।
গুরুমহারাজ যেটা বলেছিলেন সেটা হোলো – ” অখন্ডের মধ্যে একটা অব্যক্ত ব্যথা (যেটা পৃথিবীর মানুষ সহ জীবসকলের ব্যথা-বেদনা-আর্তি থেকে সৃষ্ট!) সেখান থেকেই করুণায় ও প্রেমে অখন্ড স্থিতি থেকে খন্ডসত্তার আবির্ভাব হয়েছিল এবং সেই সত্তাই শতভিষা এবং পৃথিবী গ্রহের টান অনুভব করেছিল !
যাইহোক, গুরু মহারাজের অবতরণের সময় যে ঘটনাটি ঘটেছিল, সেটা হোলো – হিমালয়ের পাদদেশে গঙ্গার উৎস মুখের কোনো স্থানে উনি (সেই ঈশ্বরীয় খন্ডসত্তা) সাতজন ঋষির সামনে প্রথম অবতরণ করেছিলেন ! সেই ঋষিরা তাদেরই ধ্যানের গভীরে থাকা ভাবময় শরীরকে প্রকট অবস্থায় ওনাকে প্রথম দেখেছিলেন এবং স্তুতি করেছিলেন। আরো কিছু নিশ্চয়ই তাঁরা করেছিলেন – সেই কথাগুলি আমাদের শোনা হয়নি ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” এরপর উনি (ওনার সূক্ষরূপের ভাবময় শরীর) গঙ্গার ধারা ধরে চলে এসেছিলেন কালনার কাছে কৃষ্ণদেবপুরে সেই জ্যোতিঃধারার কাছে, যেখানে ওনার মা (গর্ভধারিনী জননী) ছিলেন। মা-কে দেখেই উনি বুঝতে পেরেছিলেন এই মা-ই পারেন ঐ মহাশক্তিকে ধারণ করতে। সেইজন্য মায়ের চারিদিকে জ্যোতিঃর্বলয় রূপে প্রদক্ষিণ করে উনি নাসারন্ধ্র পথে মায়ের জঠরে প্রবেশ করেছিলেন !
পৃথিবী গ্রহের নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম আছে – সেগুলিকে মান্যতা দিয়েই পৃথিবীতে শরীর ধারণ করতে হয় । অবতার পুরুষদেরও এই নিয়ম মানতে হয় ! কিন্তু এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডটাই যাঁর নিয়মে চলছে – তাঁর আবার নিয়মের বালাই কি ! এইজন্যেই যেকোনো পার্থিব নিয়মই উনি মানতে গেছেন – সেখানেই সেইসব নিয়মকে ছাপিয়ে প্রাধান্য পেয়েছে ওনার মহিমা ! এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল ! কারণ গুরুমহারাজ তো মাতৃজঠরে প্রবেশ করে গিয়েছিলেন__ কিন্তু ঠিক সেইসময়ে গুরুমহারাজের পিতা বেশ কিছুদিন ধরেই out of station ছিলেন ! তাহলে ঘটনাটা কি দাঁড়ালো ? আমাদের সমাজে বিশেষতঃ গ্রাম-গঞ্জের সমাজে, যেখানে সবাই সবাইকে চেনে বা জানে! সেখানে– স্বামীর অনুপস্থিতিতে স্ত্রীর গর্ভলক্ষণ প্রকাশ প্রকাশ পাওয়াটা চরম লজ্জাজনক ঘটনা ! তাই গুরুমহারাজের শক্তিই যেকোনো ভাবে দূরবর্তী তীর্থস্থান থেকে পিতা ফকির চন্দ্র দাসকে ফিরিয়ে এনেছিল।
মা-বাবা একজায়গা হওয়ার পর, মায়ের সমস্ত উপলব্ধির কথা বাবা শুনলেন, আবার পিতার উপলব্ধির কথা(তীর্থস্থানে পিতা ফকির চন্দ্রের‌ও নানান দর্শন এবং উন্নত সাধুদের সংস্পর্শে এসে নানা উপলব্ধি হয়েছিল)-ও মা শুনলেন ! এরফলে গুরুমহারাজ মায়ের গর্ভে আসার সময় থেকেই ওনার পিতা এবং মাতা উভয়েই যুগপুরুষের আগমন সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে অবগত হয়ে গেছিলেন।
এরপর থেকে শুধুই গর্ভধারিণী মায়ের ভূমিকা ! গর্ভে থাকাকালীন মায়ের কতরকম যে অনুভূতি, উপলব্ধি, দর্শন হয়েছিল তার ইয়ত্তা নাই ! মহা মহা সাধকেরা বহু সাধনাতেও যা পায় না – গুরুমহারাজ মায়ের গর্ভ থেকেই মা-কে সেই সমস্ত উপলব্ধি করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু গুরুমহারাজের মা এতোই সহজ-সরল ছিলেন যে, তিনি সাধারণ গ্রাম্যবধূ হিসাবেই সারাজীবন কাটিয়ে দিয়েছিলেন – স্বয়ং ভগবানের মা হয়েও তিনি বহু উপলব্ধি বা বোধের অধিকারীনী হওয়া সত্ত্বেও কখনোই এই নিয়ে নিজেকে অপরের কাছে ‘আলাদা’ প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেন নি ! ‘ভগবানের মা’ যতদিন শরীরে ছিলেন ততদিন তিনি তাঁর সব সন্তানের মা হয়েই ছিলেন ! সবার স্নেহময় জননী ! আমার কয়েকবার-ই ওনার সাথে কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছিল ! তখন দেখেছিলাম কি অলৌকিক সারল্য-ই ছিল – ভগবানের জননীর ! মহিমময় সন্তানের মহিমময়ী জননী ছিলেন – জননী নিভারানী ।৷