শ্রী শ্রী গুরুমহারাজের সমগ্র জীবনকাহিনীই মহিমময়। তাঁর মহিমার কথা আলাদা করে একটা বা দুটো আর কি বলা যায় ! তবু সবার সাথে গুরুমহারাজের জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু কিছু ঘটনার কথা শেয়ার করার চেষ্টায় – এই আলোচনা। গুরুমহারাজ যেদিন আমাদের কাছে প্রথম তাঁর ছোটবেলাকার জীবনের অংশবিশেষ আলোচনা করেছিলেন সেদিন আমরা ছিলাম আজিমগঞ্জ আশ্রমে। ওখানে পঁচিশে ডিসেম্বর গুরুমহারাজের উপস্থিতিতে তাঁর জন্মদিন পালন করা হোতো (শেষ ১০/১২বছর)! ওই উপলক্ষেই স্থানীয় মানুষ সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ, উত্তর ভারতের ভক্তরা, দক্ষিণ ভারতের ভক্তরা, ইউরোপীয় ভক্তদের অনেকে – ইত্যাদি সবাই হাজির হোতো ওখানে। আজিমগঞ্জ আশ্রমের বেশ কয়েকটি attraction-ও ছিল ! এক নম্বরে গুরুমহারাজের জন্মদিন পালন ও 1st January পালন, দুই নম্বরে গুরুমহারাজের রাত্রের সিটিং, তিন নম্বরে হোলো পরিষ্কার, বিশুদ্ধ, নির্মল (দূষণমুক্ত) গঙ্গার জলে স্নান! সারারাত ধরে গুরুমহারাজের সিটিং শোনার সে এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা ! চার নম্বর হোলো গুরুমহারাজের সাথে গঙ্গার তীরে অথবা নৌকাযোগে পিকনিক করতে যাওয়া। এর পরের নম্বরে আসবে __কাছাকাছি দর্শনীয় স্থান হিসাবে হাজারদুয়ারি, সতীপীঠ কিরীটেশ্বরী, রানী ভবানীর গড়, ডাহাপাড়ার জগৎবন্ধুসুন্দরের স্থানগুলি ঘুরতে যাওয়া।
যাইহোক, আমরা যে রাতের কথা বলছিলাম সেই রাতে সারারাত ধরে সিটিং চলছিল এবং গুরুমহারাজ ওনার কৃষ্ণদেবপুরে কাটানো ছোটবেলাকার নানান কথা আলোচনা করেছিলেন। এখানে সেইগুলিই সংক্ষিপ্ত আকারে বলার চেষ্টা করা হোচ্ছে। ঐ রাত্রেই ওনার পাঁচ বছর বয়সে দীক্ষাদানের কথা, মাতৃদর্শনের কথাও বলেছিলেন। তবে সত্যি সত্যিই আমি একেবারে হতবাক এবং বিস্ময়াভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম – যখন উনি ব্যাখ্যা করলেন, ‘কেন ছোটবেলায় উনি সবার কথা শুনতে পেতেন না’ বা ‘কেন ওনাকে ছোটবেলায় সবাই “কালা” মনে কোরতো ?’ উনি বলেছিলেন – “সেই সময় ভারতীয় দর্শনের সমস্ত জ্ঞান এবং বিচার সমূহ তখন থেকেই (ওই পাঁচ বছর বয়স থেকেই) আমার মধ্যে হু হু করে ঢুকছিল এবং বিভিন্ন দর্শনের বিচার এবং বেদান্তের সিদ্ধান্তগুলি (যেগুলি তৎকালীন যুগে বহু তর্কাদি ও মীমাংসার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল) আমার মধ্যে তখন হয়ে চলছিল ! তাই জাগতিক কোনো বিষয়ে মন দেবার মতো তখন আমার অবস্থা ছিল না !”
কি সাংঘাতিক কথা ! আমরা ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে পেয়েছিলাম প্রায় দেড়শ বছর আগে কলকাতায় দক্ষিণেশ্বরে। আমরা এখনো ভেবে অবাক হোতাম কামারপুকুর গ্রামের দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের একজন অশিক্ষিত (তথাকথিত) কৈবর্তের কালীবাড়ির পুরোহিত রামকৃষ্ণ কি করে তৎকালীন কলকাতার তাবড় তাবড় মহা মহাপন্ডিত ব্যক্তিদেরকে তাঁর কথার যাদুতে বশ করতে পেরেছিলেন ! আর শুধু ‘বশ’ করাই নয়, তাদের অনেককে একেবারে তাঁর চরণতলে এনে ফেলতে পেরেছিলেন ! আমরা অবাক হোতাম এই ভেবে যে, কি এমন কথা উনি বলতেন যাতে করে এইসব বইপড়া মহাপন্ডিতগণ একেবারে চুপ মেরে যেতো ?!
সেইদিন আজিমগঞ্জের দোতলার ঘরে গভীর নিশীথে গুরুমহারাজ যখন বলছিলেন – ” সেই ছোট বয়সেই আমার মধ্যে তখন ভারতীয় ষড়দর্শনের সমস্ত তত্ত্ব বা জ্ঞান ও বিচার আমার মধ্যে হু হু করে ঢুকছিল !” সেই মুহূর্তেই এ রহস্যের সমাধান হয়ে গিয়েছিল ! তখনই বুঝতে পেরেছিলাম – ” ওঃ ! তাহলে এই ব্যাপার !” ষড়দর্শন, বেদ-বেদান্তের জ্ঞান এবং তাছাড়াও যাবতীয় জ্ঞান এইভাবেই ওনাদের মস্তিষ্কে input করাই থাকে ! তাহলে কি ওনাদের সাথে বই পড়া পণ্ডিতেরা দাঁড়াতে পারে? ___ওইজন্যেই পারে না ! যেকোনো শিক্ষিত (লেখাপড়া করা )মানুষ যে level-এ কথা বলা শেষ করে – ওনারা সেইখান থেকে শুরু ক’রে_ আরো আগাতে থাকেন ! তাই উপস্থিত ভক্তজনের সেখানে ‘হাঁ’ করে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকেনা।আমাদেরও গুরুমহারাজের সামনে বসে ওই দশাই হোত। আর আমরা কেন – দেশি-বিদেশি ইউনিভার্সিটির প্রফেসরেরা, বড় বড় কোম্পানির ম্যানেজারেরা, বিভিন্ন হসপিটালের নামকরা ডাক্তারেরা, ভারতীয় বিজ্ঞানীরা এমন কি আমেরিকার নাসায় কর্মরত বিজ্ঞানীরা, দু-একটা রাজ্যের রাজ্যপালেরাও গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের সামনে দু-চার কথা বলার পরই – হয় নতমস্তকে বসে থাকতো অথবা ‘হাঁ’ করে স্বামী পরমানন্দের শ্রীমুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হোত।
গুরুমহারাজের সাথে মধ্যপ্রদেশের রাজ্যপাল (মহম্মদ সফিকুরেশী)-এর সাক্ষাৎ হওয়ার ঘটনাটা না হয় পরে একদিন বলা যাবে ! এই ব্যাপারটাও তো গুরুমহারাজের মহিমা শক্তিরই প্রকাশ ! এই প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলে উনি শুধু বলেছিলেন – “এই শরীরে রাজদর্শনের একটা যোগ ছিল ! ওইটা দিয়ে সেটা পূরণ হলো !”(ক্রমশঃ)