শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা, তাঁর জীবনে প্রকাশিত মহিমার কথা এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা ছিলাম ওনার ছোটবেলাকার নানান ঘটনায়। আমরা যে ঘটনাগুলির কথাই বলার চেষ্টা করি না কেন – কখনোই তাঁর সমস্ত ঘটনা তো উল্লেখ করতে পারবো না ! তাই কিছু কিছু তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে ! আর ওনার ছোটবেলায় ঘটে যাওয়া যে কোনো ঘটনারই উল্লেখ করা হোক না কেন – তার মাধ্যমেই ভগবান পরমানন্দের ‘মহিমা’ প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে ! আসলে তিনি তো অনন্ত মহিমময় ! তাঁর মহিমার প্রকাশ তো তিনি নিজেই – তাঁর জীবনের সমস্তটা জুড়েই তাঁর মহিমা প্রকাশিত ! তাহলে নতুন করে বা আলাদা করে কোনটাকে বলা যাবে ? তাই গোড়া থেকেই শুরু করার চেষ্টা !
বনগ্রাম আশ্রমে একবার গুরুমহারাজ সিটিং-এ সিঙ্গুর থেকে আসা একজন ভক্তের ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বিষয়ক জিজ্ঞাসার উত্তরে বলেছিলেন – ” দ্যাখো, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে সম্পূর্ণ কেউ কোনদিন-ই জানতে পারবে না ! কারণ তা জানতে হলে তাকেও ‘ঠাকুর’ হয়ে উঠতে হবে। আর তাঁর জীবন বা জীবনীও কি সম্পূর্ণ জানা সম্ভব ? তা জানতে হলে তো – তাঁর গর্ভে আগমন এবং সূতিকা গৃহের সদ্যোজাত যে শিশুটি জন্মেই উনোনের ছাইমাখা হয়ে গিয়েছিল – সেখান থেকে শুরু করতে হবে ! আর তারপর কামারপুকুরের জীবনের, কলকাতার দক্ষিণেশ্বরের জীবনের__ পঞ্চবটিতে কাটানো প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত্রি, প্রতিটি ক্ষণের ঘটনা জানতে হবে এবং শেষে বরাহনগর মঠের অন্তিম শয়ানে শায়িত ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, যে দীর্ঘকাল রোগে ভুগে কঙ্কালসার, মুখ বা চোয়াল সরু, শরীর কালো রংয়ের বাদুড়ের মতো হয়ে গেছে – এই সবটার ধ্যান করতে হবে ! তবে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ সম্বন্ধে তোমার ধারণা হবে। কিন্তু তা কি তুমি করতে পারবে ? পারবে না ! তুমি কেন – কেউ-ই পারবে না। কারণ এই পুরোটা তো তুমি দেখতে পাচ্ছো না ! তাই সেই চেষ্টা করছ কেন ? যাকে সামনে দেখতে পাচ্ছো – তার ধ্যান করো ! তাকে জানার চেষ্টা করো – তাহলেই হবে।”
আমরাও এখানে সেই চেষ্টাই করছি ! পরমানন্দরূপী সেই মহান মানুষটির কথাই এখানে বলার চেষ্টা করা হোচ্ছে – তাঁর রূপের কথা, তাঁর গুণের কথা, তাঁর জ্ঞানের কথা – বিজ্ঞানের কথা – প্রজ্ঞানের কথা এবং তাঁর জীবনের ছোট ছোট ঘটনা, লৌকিক বা অতিলৌকিক ঘটনা, তাঁর জীবন – জীবনী এইসব আলোচনা করে তাঁরই ধ্যান করার চেষ্টা করা হোচ্ছে। আর আপনারা যারা পাঠককুল রয়েছেন – তাদেরও এই আলোচনা-পাঠের মাধ্যমে পরমানন্দের স্মরণ-মনন হয়ে যাচ্ছে। ফলে আপনাদেরও ধ্যান হয়ে যাচ্ছে। আপনাদের অনেকেরই মন্তব্য শুনে বোঝা যায় – তারাও গভীরে ঢুকে পরমানন্দ-রসের সাগরে অবগাহন করে – আধ্যাত্মিক নির্যাস পান করেন ! পরমানন্দের কৃপা সকলের উপর বর্ষিত হোক – পরম করুণাময়ের কাছে এই প্রার্থনা করি !
অনেক আগে বলা হয়েছিল – গুরুমহারাজ খুব ছোট বয়স থেকেই লৌকিকভাবেও ‘গুরু’ হয়ে গিয়েছিলেন ! উনি ৫/৬ বছর বয়সে ল্যাংটো হয়ে কচুবনে ফড়িং ধরার সময় একজন বৃদ্ধা বৈষ্ণবীকে দীক্ষা দিয়েছিলেন। ওই বৈষ্ণবী আবার যে সে নয় – সে-ই ছিল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসে ‘কমলি’ বা ‘কমললতা’! বাঘনাপাড়া (গুরুমহারাজের জন্মভূমি কৃষ্ণদেবপুরের কাছেই) অঞ্চলে শত শত বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীর আখড়া রয়েছে। কমললতাদের আখড়াও ওই অঞ্চলেই ছিল। যৌবন বয়সে ‘কমলি’ বোষ্টমী দেখতে-শুনতে খুবই সুন্দরী ছিল ! লেখক শরৎবাবু – এই অঞ্চলগুলিতে, বিশেষতঃ বিভিন্ন বৈষ্ণব আখড়াগুলিতে খুবই ঘুরতেন। সেখানেই ‘কমলি’ বৈষ্ণবীর সাথে ওনার আলাপ হয়েছিল এবং তার‌ই চরিত্রকে রঙ-চঙ মাখিয়ে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছিলেন ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসে !
‘কমলি’ বৈষ্ণবীকে দীক্ষা দেওয়া ছাড়াও ঐ বয়সেই গুরুমহারাজ ওই অঞ্চলের আর একজন বৃদ্ধা ভক্তিমতী মহিলা “রামকেষ্ট-র মাসি”-কেও দীক্ষা দিয়েছিলেন ! আসলে ঘটনা ঘটেছিল কি – ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ যখন কালনায় ভগবানদাস বাবাজীর আশ্রমে গিয়েছিলেন, সেদিন বাল্যবিধবা ঐ ছোট মেয়েটি ওখানে মায়ের সাথে বা অন্যান্য আত্মীয়ের সাথে উপস্থিত ছিল ! – সেই ঘটনাটা পরবর্তীতে ও সকলকে বলে বলে বেড়াতো ! কিন্তু মানুষজন ঘটনাটা মিথ্যা মনে করতো এবং ওকে ‘পাগলী’- ‘মাথাখারাপ` মহিলা – এইসব মনে করতো ! ফলে ঐ মহিলা যখনই কাউকে বলতে যেতো – তখনই সে বলে উঠতো – “তা, তুমি আবার রামকেষ্টকে দেখনি ! তুমি তো দেখবেই ! তুমি যে ‘রামকেষ্টর মাসি’ ছিলে !”
সেইথেকেই ঐ মহিলাকে সবাই ‘রামকেষ্টর মাসি’- বলেই ডাকতো। বৈষ্ণবদের ভিক্ষাবৃত্তি-ই সম্বল। ফলে ওনাকেও বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত ভিক্ষা করতে হতো। গুরুমহারাজের মা (গর্ভধারিণী জননী) ঐ বৃদ্ধ মহিলাকে খুবই যত্ন করতেন। কাছে বসিয়ে খাওয়াতেন, বিশ্রাম করার ব্যবস্থা করে দিতেন। সেই রামকেষ্টর মাসিরও একদিন হঠাৎ করে গুরুমহারাজের মধ্যে “বাল-গোপাল” দর্শন হয়ে গেছিল – যেমনটা হয়েছিল ‘কমলি’ বোষ্টমীর ! ফলে ধরা পড়ে গিয়ে ঐ পাঁচ বছর বয়সেই গুরুমহারাজকে দীক্ষা দিতে হয়েছিল ওই দুইজন অশীতিপর বৃদ্ধা বোষ্টমীকে !!