শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের মহিমার কথা বলা হচ্ছিলো। মহাপুরুষ-অবতারপুরুষদের এই পৃথিবীতে শরীর ধারণ করে নানারকম লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয় ! এই লাঞ্ছনা শারীরিক, মানসিক ইত্যাদি নানাবিধ ! আর সেই লাঞ্ছনার বেশিরভাগটার জন্য আমরা অর্থাৎ সাধারণ মানুষেরাই দায়ী ! আমরাই তাঁদেরকে অত্যাচারের পর অত্যাচারে জর্জরিত করে তুলি ! তাঁরা অবশ্যই জানেন যে, সাধারণ মানুষ তাঁদের সঙ্গে এমনটাই করবে – তাই তাঁরাও যেন তাঁদের প্রশস্ত বক্ষ পেতে দেন, বলেন – “নে ! তোরা কত আমাকে আঘাত করবি কর্ ! আমি তোদের শত আঘাত সহ্য করেও তোদেরকে ভালবেসে যাবো, তোদের সবসময় সর্বাঙ্গীন কল্যাণ করে যাবো !” এইসব কথা যখন মনে পড়ে, আপনারাই বলুন তখন কি দু-চোখের কোনে একটু জল না এসে থাকতে পারে ??
গুরু মহারাজ আমাদের মতো সাধারন মানুষের এই ধরনের অত্যাচারকে বলেছিলেন – ” অবোধের গোবধে আনন্দ !”
মহাপুরুষদের সারাজীবনে বেশিরভাগটাই শুধু কষ্টভোগ করে যাবার ব্যাপারে ___আমি একবার ন’কাকাকে (শ্রীশ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়) জিজ্ঞাসা করেছিলাম ! উনি বলেছিলেন – ” বাবা ! তাঁরা কষ্টগুলো না নিয়ে নিলে – সাধারণ মানুষের যে দুর্গতির শেষ থাকতো না ! এই বামদেবকেই দ্যাখো না (ন’কাকা সাধারণত বামদেবকে দিয়েই বেশিরভাগ উদাহরণ দিতেন) – সারাজীবনে সেই অর্থে কোনো রকম ভোগ-সুখ, স্বচ্ছন্দ ইত্যাদির ধার-ই ধারলো না ! ছোটবেলাটায় অভাব-অনটন, না খেতে পাওয়া – এইসবের মধ্যে দিয়েই কাটলো ! তারপর কিছুদিনের জন্য চলে গেল মুলুটিতে ! ওখানেও নানারকম নির্যাতনের শিকার হয়ে ফের ফিরে এলো ! তারপর থেকেই তারাপীঠের জঙ্গলে সাধনজীবন শুরু। তখনকার দিনে ওইসব স্থান চরম দুর্গম ছিল ! একমাত্র মরা পোড়াতে আসা লোকজন ছাড়া দিনের বেলাতেই ওদিকপানে বড় একটা কেউ যেতো না ! বিভিন্ন কাপালিক, ভৈরব-ভৈরবী, অঘোরাচারী ইত্যাদিরা ওখানে তিথি-নক্ষত্র দেখে গভীর রাতে আসতো এবং তাদের নির্দিষ্ট অসাধারণ পদ্ধতি সম্পন্ন করে আবার চলে যেতো ! একমাত্র বামাচরণই ওখানে পাকাপাকিভাবে দীর্ঘদিন থেকেছিল ! তাহলেই বোঝ – ওঁর সাধন-জীবন কেমন ছিল ! একা নির্জন ওই গভীর জঙ্গলপূর্ণ শ্মশানে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাটানো কি সহজ কথা ? সাক্ষাৎ মহাভৈরব ছাড়া কি কেউ পারে ? সারা গায়ে কাদা মাখা, মাটি মাখা, পা-হাত সহ গোটা শরীর কাঁটার আঁচড়ে রক্তাক্ত – তাতে আবার মাছি বসছে, পায়খানা করেছে হয়তো ছোঁচানোও হয়নি – এইরকম অবস্থায় থাকতো ! পূজারীরা পূজা সেরে দিনে দিনেই জঙ্গল ছেড়ে পালাতো ! রাত্রিতে শুধু শব, শিবা (শিয়াল), নিশাচর পাখিরা। তবে শ্মশানে মড়াখেকো কুকুর গোটাকয়েক সব সময় বামাচরণের কাছে কাছে থাকতো – ওকে পাহারা দিয়ে সব সময় বসে থাকতো !”
গুরু মহারাজ ন’কাকা সম্বন্ধে বলেছিলেন – ” ন’কাকা হলো মহাভৈরব !” এখন আমাদের রাঢ়বঙ্গে শিবের গাজন চলছে। মনে পড়ে যাচ্ছে বনগ্রামে ন’কাকা শিবের গাজনে প্রত্যেক বছর সন্ন্যাসী হোতেন (হয়তো দুই-এক বছর নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম ছিল)। ন’কাকা গাজনের সন্ন্যাসী হোতেন বলেই – আরো দু-চারজন যুবক ছেলে তাঁর সাথে সন্ন্যাসী হয়ে গাজনের ক’দিন (কামান, ফল, জলসন্ন্যাস, নীল, চড়ক – এই পাঁচদিন) বনগ্রামের শিবতলাতেই কাটিয়ে দিতেন ! গুরুমহারাজ একবার বলেছিলেন – ” ন’কাকাই তো বনগ্রামের বুড়োশিব !” তাহলে বুড়োশিব-ই বুড়োশিবের গাজনে সন্ন্যাসী হয়ে সমস্ত নিয়ম পালন করতেন ! এটাই যথার্থ – “আপনি আচরি ধর্ম জীবেরে শিখায় !”
যাইহোক, আমরা মহাপুরুষদের জীবনে কষ্ট ভোগ এবং লাঞ্ছনাভোগের কথায় ছিলাম। বামদেবের প্রসঙ্গ যখন এসে গেল তখন তাঁর জীবনচরিতের দিকে দৃষ্টিপাত করলেও দেখা যায় – তাঁর সমগ্র জীবনটাই (আমাদের দৃষ্টিতে) কষ্টে ভরা, লাঞ্ছনা-গঞ্জনায় ভরা ! কিন্তু তিনি যে সদানন্দে-নিত্যানন্দে সর্বদা বিরাজ করতেন – সেকথা বলাই বাহুল্য !
বামদেবের জীবনের একেবারে শেষভাগে হরিচরণ শাস্ত্রী মহাশয় (যিনি কলকাতার নিকটস্থ কোনো স্থানের লোক ছিলেন এবং পেশায় উকিল বা অ্যাডভোকেট ছিলেন।) বামদেবের কাছে (তারাপীঠে) গিয়ে তাঁর কৃপাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। উনি বামদেবের যে জীবন-চরিত লিখেছিলেন – সেটাই প্রধান প্রামাণ্য গ্রন্থ ! পরবর্তীতে যেগুলি লেখা হয়েছিল – সেগুলি সমকালীন মানুষজনের কাছে শুনে লেখা – ফলে প্রচুর ‘জল’ ঢুকে রয়েছে ! যাইহোক, হরিচরণ শাস্ত্রী মহাশয় একবার “রাত্রে বামদেবের সাথে কাটাবো”– এইরূপ মনস্থ করেছিলেন ! তখন একটা মাটির চালাঘরে ‘বামা মিশন’ সদ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ওখানেই বৃদ্ধ, প্রায় চলৎশক্তিহীন বামদেবের জন্য একটা কুটির নির্মাণ করা হয়েছে – সেখানে ওনার জন্য বালিশ-বিছানা-মশারীর ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু শাস্ত্রীজী ওই ঘরে শোবার সময় দেখলেন যে, বামদেবের মশারীর মধ্যে বড় বড় গোল গোল করে কাটা অংশ রয়েছে ! এই দেখে শাস্ত্রীজী অবাক হয়ে বামদেবকে (গুরুদেব) জিজ্ঞাসা করেছিলেন – ” মশারীতে এতো বড় বড় ফাঁক রয়েছে, ওখান থেকে মশা ঢুকবে তো ?” বামদের হেসে উত্তর দিয়েছিলেন – ” না-না ! ওগুলো দিয়ে ফুলি, কালু, ভুলো (বামদেবের প্রিয় কুকুরগুলো) – ওরা ঢোকে, মশারা ঢোকে না !” এবার কি বুঝবেন বুঝুন – মহামানবদের কষ্টভোগের লীলা ! [ক্রমশঃ]
গুরু মহারাজ আমাদের মতো সাধারন মানুষের এই ধরনের অত্যাচারকে বলেছিলেন – ” অবোধের গোবধে আনন্দ !”
মহাপুরুষদের সারাজীবনে বেশিরভাগটাই শুধু কষ্টভোগ করে যাবার ব্যাপারে ___আমি একবার ন’কাকাকে (শ্রীশ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়) জিজ্ঞাসা করেছিলাম ! উনি বলেছিলেন – ” বাবা ! তাঁরা কষ্টগুলো না নিয়ে নিলে – সাধারণ মানুষের যে দুর্গতির শেষ থাকতো না ! এই বামদেবকেই দ্যাখো না (ন’কাকা সাধারণত বামদেবকে দিয়েই বেশিরভাগ উদাহরণ দিতেন) – সারাজীবনে সেই অর্থে কোনো রকম ভোগ-সুখ, স্বচ্ছন্দ ইত্যাদির ধার-ই ধারলো না ! ছোটবেলাটায় অভাব-অনটন, না খেতে পাওয়া – এইসবের মধ্যে দিয়েই কাটলো ! তারপর কিছুদিনের জন্য চলে গেল মুলুটিতে ! ওখানেও নানারকম নির্যাতনের শিকার হয়ে ফের ফিরে এলো ! তারপর থেকেই তারাপীঠের জঙ্গলে সাধনজীবন শুরু। তখনকার দিনে ওইসব স্থান চরম দুর্গম ছিল ! একমাত্র মরা পোড়াতে আসা লোকজন ছাড়া দিনের বেলাতেই ওদিকপানে বড় একটা কেউ যেতো না ! বিভিন্ন কাপালিক, ভৈরব-ভৈরবী, অঘোরাচারী ইত্যাদিরা ওখানে তিথি-নক্ষত্র দেখে গভীর রাতে আসতো এবং তাদের নির্দিষ্ট অসাধারণ পদ্ধতি সম্পন্ন করে আবার চলে যেতো ! একমাত্র বামাচরণই ওখানে পাকাপাকিভাবে দীর্ঘদিন থেকেছিল ! তাহলেই বোঝ – ওঁর সাধন-জীবন কেমন ছিল ! একা নির্জন ওই গভীর জঙ্গলপূর্ণ শ্মশানে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাটানো কি সহজ কথা ? সাক্ষাৎ মহাভৈরব ছাড়া কি কেউ পারে ? সারা গায়ে কাদা মাখা, মাটি মাখা, পা-হাত সহ গোটা শরীর কাঁটার আঁচড়ে রক্তাক্ত – তাতে আবার মাছি বসছে, পায়খানা করেছে হয়তো ছোঁচানোও হয়নি – এইরকম অবস্থায় থাকতো ! পূজারীরা পূজা সেরে দিনে দিনেই জঙ্গল ছেড়ে পালাতো ! রাত্রিতে শুধু শব, শিবা (শিয়াল), নিশাচর পাখিরা। তবে শ্মশানে মড়াখেকো কুকুর গোটাকয়েক সব সময় বামাচরণের কাছে কাছে থাকতো – ওকে পাহারা দিয়ে সব সময় বসে থাকতো !”
গুরু মহারাজ ন’কাকা সম্বন্ধে বলেছিলেন – ” ন’কাকা হলো মহাভৈরব !” এখন আমাদের রাঢ়বঙ্গে শিবের গাজন চলছে। মনে পড়ে যাচ্ছে বনগ্রামে ন’কাকা শিবের গাজনে প্রত্যেক বছর সন্ন্যাসী হোতেন (হয়তো দুই-এক বছর নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম ছিল)। ন’কাকা গাজনের সন্ন্যাসী হোতেন বলেই – আরো দু-চারজন যুবক ছেলে তাঁর সাথে সন্ন্যাসী হয়ে গাজনের ক’দিন (কামান, ফল, জলসন্ন্যাস, নীল, চড়ক – এই পাঁচদিন) বনগ্রামের শিবতলাতেই কাটিয়ে দিতেন ! গুরুমহারাজ একবার বলেছিলেন – ” ন’কাকাই তো বনগ্রামের বুড়োশিব !” তাহলে বুড়োশিব-ই বুড়োশিবের গাজনে সন্ন্যাসী হয়ে সমস্ত নিয়ম পালন করতেন ! এটাই যথার্থ – “আপনি আচরি ধর্ম জীবেরে শিখায় !”
যাইহোক, আমরা মহাপুরুষদের জীবনে কষ্ট ভোগ এবং লাঞ্ছনাভোগের কথায় ছিলাম। বামদেবের প্রসঙ্গ যখন এসে গেল তখন তাঁর জীবনচরিতের দিকে দৃষ্টিপাত করলেও দেখা যায় – তাঁর সমগ্র জীবনটাই (আমাদের দৃষ্টিতে) কষ্টে ভরা, লাঞ্ছনা-গঞ্জনায় ভরা ! কিন্তু তিনি যে সদানন্দে-নিত্যানন্দে সর্বদা বিরাজ করতেন – সেকথা বলাই বাহুল্য !
বামদেবের জীবনের একেবারে শেষভাগে হরিচরণ শাস্ত্রী মহাশয় (যিনি কলকাতার নিকটস্থ কোনো স্থানের লোক ছিলেন এবং পেশায় উকিল বা অ্যাডভোকেট ছিলেন।) বামদেবের কাছে (তারাপীঠে) গিয়ে তাঁর কৃপাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। উনি বামদেবের যে জীবন-চরিত লিখেছিলেন – সেটাই প্রধান প্রামাণ্য গ্রন্থ ! পরবর্তীতে যেগুলি লেখা হয়েছিল – সেগুলি সমকালীন মানুষজনের কাছে শুনে লেখা – ফলে প্রচুর ‘জল’ ঢুকে রয়েছে ! যাইহোক, হরিচরণ শাস্ত্রী মহাশয় একবার “রাত্রে বামদেবের সাথে কাটাবো”– এইরূপ মনস্থ করেছিলেন ! তখন একটা মাটির চালাঘরে ‘বামা মিশন’ সদ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ওখানেই বৃদ্ধ, প্রায় চলৎশক্তিহীন বামদেবের জন্য একটা কুটির নির্মাণ করা হয়েছে – সেখানে ওনার জন্য বালিশ-বিছানা-মশারীর ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু শাস্ত্রীজী ওই ঘরে শোবার সময় দেখলেন যে, বামদেবের মশারীর মধ্যে বড় বড় গোল গোল করে কাটা অংশ রয়েছে ! এই দেখে শাস্ত্রীজী অবাক হয়ে বামদেবকে (গুরুদেব) জিজ্ঞাসা করেছিলেন – ” মশারীতে এতো বড় বড় ফাঁক রয়েছে, ওখান থেকে মশা ঢুকবে তো ?” বামদের হেসে উত্তর দিয়েছিলেন – ” না-না ! ওগুলো দিয়ে ফুলি, কালু, ভুলো (বামদেবের প্রিয় কুকুরগুলো) – ওরা ঢোকে, মশারা ঢোকে না !” এবার কি বুঝবেন বুঝুন – মহামানবদের কষ্টভোগের লীলা ! [ক্রমশঃ]
