শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের জীবনে ঘটা নানান ঘটনা এবং তাঁর বলা বিভিন্ন পশু-পাখি সংক্রান্ত কথা এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো – যেগুলো পড়ে বা শুনে আপনারাও বুঝতে পারবেন সেই মহিমময় মানুষটির কি অসম্ভব ঘটনাবহুল রহস্যময় জীবন এবং পৃথিবীর যাবতীয় জ্ঞানভান্ডার যেন ওনার কাছে রক্ষিত অথবা পৃথিবীর সকল প্রাণীর মানুষের সমস্ত রকম অভিজ্ঞতায় যেন তিনি পুষ্ট ছিলেন ! হোক সে হিমালয়ের গোপন-গহীনে সাধনরত সহস্র-সহস্র বছরের পুরাতন কোনো যোগী-সন্ন্যাসী অথবা গভীর জঙ্গলের আদিবাসী, হোতে পারে সে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলির সভ্য-শিক্ষিত-পন্ডিত মানুষ অথবা অখ্যাত কোনো গ্রামের একেবারে নিতান্ত সাধারণ খেটে খাওয়া অশিক্ষিত পুরুষ বা মহিলা – সবার জীবনের সমস্ত রকম অভিজ্ঞতাই তাঁর মধ্যে ছিল ! সেইজন্যেই সমাজের এই ধরনের ভিন্ন ভিন্ন মানসিক স্তরের মানুষেরা তাঁর সান্নিধ্যলাভ করলেই মনে শান্তি পেতেন, প্রাণে আরাম পেতেন !
কেন সকলেই শান্তি বা আরাম পেতেনই বা কেন ? কারণটা হোচ্ছে_ এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ তার মনের মতো মানুষ খুঁজে খুঁজে বেড়ায়। সে তার পিতা-মাতা-স্ত্রী-স্বামী-পুত্র-কন্যা-বন্ধু-বান্ধব-আত্মীয়-স্বজন ইত্যাদিদের মাঝে __তার মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা ‘মনের মানুষ’-টিকে খুঁজে পেতে চায় – কিন্তু কোথাও তা পায় না ! আর পাওয়া সম্ভবও নয় !
পৃথিবীর মানুষের জীবনে সদগুরুরূপী নরতনুধারী ভগবান-ই হ’ন একমাত্র মনের মানুষ – অপর কেউই হোতে পারে না। কারণ তাদের নিজের মনের উপরেই কর্তৃত্ব নাই – তো অপরের মনকে কি করে জানবে ? সুতরাং মনকে জয় করতে যে না পেরেছে__সে যতোই আত্মীয় হোক বা স্বজন হোক, কি করে তারা তার মনের মানুষ হয়ে উঠবে ?
ছেলেমেয়েরা যতদিন ছোট থাকে ততদিন স্নেহময় জননী তার সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে তার ‘মনের কথা’ বুঝতে পারেন – ফলে ছোট বয়সটায় (কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটা বড় বয়স পর্যন্ত continue করে) গর্ভধারিনী জননী হয়ে ওঠেন সন্তানের কাছে ‘মনের মানুষ’। শিশু তার অন্তরের সব কথা এবং ঘরের বাইরে গিয়ে তার সাথে কোথায় কি ঘটেছে – সেসব কথা,যত দ্রুত সম্ভব__ মাকে এসে অকপটে বলতে পারে। কিন্তু শরীরে যৌবন আসার পর থেকেই ছেলে-মেয়েরা মা-কেও অনেক কথা লুকোতে শুরু করে, ফলে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়।
কিন্তু সদ্গুরু (যাঁর আত্মজ্ঞান লাভ হয়েছে) হলেন মনের রাজা ! তিনি সবার মনের খবর রাখেন, সবার মনের মনোজগতে প্রবেশ করে সহজেই তার মনের মতো হয়ে উঠতে পারেন ! তাই তো তিনিই একমাত্র “মনের মানুষ” ! তাছাড়া সদগুরুর প্রাণতত্ত্ব জানা থাকায় প্রাণে প্রাণেও সংযোগ করতে পারেন বলে__ তিনিই হয়ে ওঠেন প্রাণের মানুষ !
এইজন্যেই বলা হয় শ্রীরামকৃষ্ণ কে বলা হয় – “প্রাণের ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ” ! ঠিক সেইরূপ‌ই__ স্বামী পরমানন্দও তাঁর ভক্তজনের কাছে প্রাণের ঠাকুর – মনের মানুষ ! যতদিন তিনি শরীরে ছিলেন – ততদিন প্রতিটি ভক্ত-ই এটা জানতো এবং মনেপ্রাণে মানতোও ! মানতো – এইজন্যে যে, না মেনে উপায় ছিল না ! যার দিকে তিনি একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেন – সেই দৃষ্টি এতটাই মর্মভেদী ছিল যে, সেই ভক্তটি (নারী বা পুরুষ) বুঝতে পারতো__ এক লহমায় গুরুজী (স্বামী পরমানন্দ) তার মনের ভিতরটা সব দেখে নিলেন! এইবার আপনারাই বলুন – কার জীবনে আর একটু-আধটু ‘কালো দাগ’- না রয়েছে ! স্থূলে না থাকলেও – মনোজগতেও তো ছিলই ! তাই তিনি কারও দিকে তাকানো মাত্রই সেই ব্যক্তিটি ভয়ে, লজ্জায়, শ্রদ্ধামিশ্রিত ভক্তিতে মাথা নিচু করে ফেলতো। আর তখনই মহিমময় গুরুমহারাজ একটা মধুর হাসি হেসে – কোনো না কোনো কুশল জিজ্ঞাসা করে __তার সঙ্কোচ কাটিয়ে দিতেন। পারস্পরিক সম্পর্কটা, অস্বস্তিকর পরিস্থিতিটা নিজগুণে সহজ করে দিতেন। ফলে তারপর থেকে আর তাঁর সঙ্গে communication-করতে কোনো অসুবিধা হোতো না।
আগের আগের আলোচনায় আমরা ওনার বিভিন্ন পশুর সাথে সাক্ষাৎ বা বিভিন্ন পশু ধরার কৌশলের কথা আলোচনা করছিলাম। উনি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ কিভাবে ধরতে হয়, বিভিন্ন পাখি কিভাবে ধরতে হয় – এসব কথাও আমাদেরকে শেখাতেন। কোনো পুকুরে একটা মাত্র বোয়াল মাছ‌ও যদি থাকে – তাহলে তাকে কোন কৌশলে ধরতে হয় – সে কথাও তিনি বলেছিলেন। আবার তিনি যে, সমস্ত পশু-পাখির ভাষা জানতেন এবং অক্লেশে খুব দ্রুত তাদের আপন হয়ে যেতে পারতেন – এমন উদাহরণও আমরা খুবই দেখেছি !
মুরলী ও পুলিন নামের ময়ূর দুটি – যেখানেই থাক না কেন – গুরুমহারাজ ডাকলেই ওনার কাছে এসে হাজির হোতো ! উনি ওনার পাশে থাকা বড় বেলের খোলা থেকে দানাদার বা কাঁচাসন্দেশ বা মন্ডাজাতীয় কোনো মিষ্টিপ্রসাদ ভেঙে-ভেঙে ওদের সামনে ছড়িয়ে দিতেন। ওরা দুজনে খুঁটে খুঁটে সবটা খেয়ে নিতো ! আরো খাবার ইচ্ছা থাকলে ওরা প্রথমবারের খাবার শেষ করে গুরুমহারাজের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো – তখন গুরুমহারাজ আবার দিতেন। আশ্রমের অতো লোকের মধ্যে আর কারো ডাকে কিন্তু ময়ূর দুটি আসতো না !
এই উদাহরণটা দিয়েই যে আমি গুরুমহারাজের সঙ্গে পশুপাখির communication-এর ব্যাপারটা বোঝাতে চাইলাম, তেমনটা নয় ! এইরকম অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। সাপের ডিম নষ্ট করার জন্য সাপেদের তাঁর কাছে অভিযোগ, রাজহাঁসের ডিম চুরি করে নেওয়ার জন্য রাজহাঁসদের অভিযোগ, চড়ুই পাখির বাসায় লাউডগা সাপের আক্রমণের জন্য মা-পাখীটির অভিযোগ – এগুলো তো আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম ! (পরের দিন ঐই প্রসঙ্গে আরো কিছু বলা যাবে।) [ক্রমশঃ]