শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের সাথে বিভিন্ন ভক্তদের সম্পর্কের কথা এবং তাদের সাথে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার কথা এখানে বলা আলোচনা করা হচ্ছিলো। আপনারা যারা ‘পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা’ অনেকদিন ধরে follow করছেন, তারা দুর্গাপুরের মাইজী (ঝা-মা)-র কথা নিশ্চয়ই আগে শুনেছেন। আজকে তার সঙ্গে গুরুজীর লীলার আরও দু’একটি ঘটনার উল্লেখ করি। ওই মা মৈথিলী ভাষায় রাম-গুণগান করতে পারতেন (কারণ ঝা-মায়ের বাড়ি ছিল উত্তরপ্রদেশের মিথিলা অঞ্চলে, সেখানেই আমাদের আশ্রমের অর্থাৎ পরমানন্দ মিশনের একটি শাখা তৈরি হয়েছে। স্বামী সহস্রানন্দ বা করিমপুরের আশু মহারাজ ওখানকার ভারপ্রাপ্ত সন্ন্যাসী।) তাছাড়া উনি হিন্দি ভজনও গাইতে পারতেন।
ফলে, গুরুমহারাজের সিটিং-এ (বনগ্রামে) যখনই মাতাজী (ঝা-মা) আসতেন, সময়-সুযোগ পেলেই গুরুমহারাজ ওনাকে গান গাইতে বলতেন ! মাইজী হয়তো মীরার ভজন বা তুলসীদাসের কোনো পদ থেকে গাইলেন – তবু গুরুমহারাজ ওনার কাছ থেকে মৈথিলী ভাষায় কোন গান শুনতেই যেন বেশি ভালবাসতেন। রাঢ়বঙ্গের গ্রামের মেয়েরা পুকুরের জলে ‘ইউরিনাল’ করে – এইটা মাইজী বনগ্রাম আশ্রমে এসে প্রথম notice করেছিলেন। তারপর উনি সরাসরি গুরুমহারাজের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে বসলেন – ” বাবা ! এইটা ‘কির্ কম্’ (কি রকম) বেপার (ব্যাপার) হোলো !” গুরুমহারাজ, লজ্জাজনক একটা ঘটনার কথা সরাসরি শুনে আর কি বলেন – উনি বলেছিলেন, ” হ্যাঁ, এটা এখানকার গ্রামাঞ্চলে মায়েদের একটা বদভ্যাস ! এইটা খুবই inhygenic ! এরজন্যেই গ্রামাঞ্চলের ছোট ছোট শিশুরা কৃমিজনিত রোগে ভোগে, শরীরের পুষ্টি হোতে চায় না ! কারণ পেচ্ছাপের সাথে প্রচুর কৃমির germ পুকুরের জলে মেশে। এরপর ঐ জলে বাসন-কোসন ধোয়া হয়, কাপড় কাচা হয়, স্নান করা হয় – এর ফলে ঐ germ-গুলি শিশুদের শরীরে প্রবেশ করে অনর্থ ঘটায় ! তবে এখানকার মেয়েরা স্কুল-কলেজে লেখাপড়া শিখছে, এরা বড় হয়ে গেলেই গ্রাম বাংলার মায়েদের (মেয়েদের) এই অভ্যাসটা বন্ধ হয়ে যাবে।” ছোটদের কৃমিনাশের medicine হিসাবে উনি বলেছিলেন__ দুমুঠো গরম ভাতের সাথে ‘একপলা’ সরষের তেল এবং এক চামচ pure হলুদগুঁড়ো(বাঁটা হলুদ হোলেই ভালো হয়) মিশিয়ে খেয়ে ফেলা !
মাইজী (ঝা-মা) দুর্গাপুরে হাউসিং কমপ্লেক্সে থাকেন৷ সেজোকাকা (ন’কাকার সেজদা, উমাপ্রসাদ মুখার্জি) থাকেন ঐ একই বিল্ডিং-এর দোতালায়, আর ঝা-মায়েরা থাকেন একতলায় ! ফলে গুরুমহারাজ দুর্গাপুরে সেজোকাকাদের বাড়িতে যখনই যেতেন, তখনই ঝা-মায়ের বাড়িতেও যেতেন। উনি গুরুমহারাজকে “শ্রীরাম”-জ্ঞানে ফুল-গঙ্গাজল দিয়ে পূজা করতেন৷
সেজোকাকা অর্থাৎ উমাপ্রসাদবাবু-দের সুবাদেই ঝা-জীরা গুরুমহারাজের সান্নিধ্যে আসেন, সেই ব্যাপারটা ওনারা তখন খুবই বলতেন। ঝা-মায়ের স্বামী ….ঝা-জী খুবই gentelman লোক ছিলেন। সিটিং-এ দেখতাম উনি প্রায়শই কোনো কথা বলতেন না – চুপচাপ গুরুমহারাজের কথা শুনে যেতেন। কখনো কোনো কারনে গুরুমহারাজ যদি ওনার সাথে কোনো আলোচনা করতেন – তখন ঐ ভদ্রলোক এত নম্র, ভদ্র এবং শ্রদ্ধাপূর্ণভাবে গুরুজীর সাথে কথা বলতেন যে, দেখে আমরাই অবাক হয়ে যেতাম আর ওই ভদ্রলোকের প্রতি আমাদেরও শ্রদ্ধাভাব জাগ্রত হোত। তখন দেখতাম ঐ মাইজী-কে আশ্রমের সবাই ভালবাসতেন। ঐ মাইজী-ই প্রথমে গুরুমহারাজকে ওঁদের জন্মভূমি মিথিলার “লহরিয়াসরাই”-এর বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন (যদিও গুরুমহারাজ অন্যভাবে ওই সমস্ত অঞ্চল আগেই ঘুরে এসেছিলেন।)
বাগমতি নদী (যেটি নেপাল থেকে অর্থাৎ হিমালয় থেকে প্রবাহিত)-র তীরে এখন যেখানে আমাদের বর্তমান আশ্রমটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে – গুরুমহারাজ স্বয়ং ঝা-জীদের বাড়ির সকলকে নিয়ে গিয়ে মাঠের মধ্যে স্থানটি নির্বাচন করেছিলেন। আমাদের ওখানকার বর্তমান আশ্রমটির ঠিক পিছন দিয়ে একটা ছোট শাখানদীও রয়েছে যেটি বাগমতী নদীর সাথে যুক্ত – ঐ শাখানদীর দুই তীরে বহুপূর্বে সাধু-সন্ত, মুনি-ঋষিদের প্রচুর আশ্রম ছিল। গুরুমহারাজ বলেছিলেন কিছুটা খোঁড়াখুঁড়ি করলেই ঐসব অঞ্চলে এখনো যজ্ঞের পোড়াকাঠ বা অন্যান্য সামগ্রীর নিদর্শন পাওয়া যায়। ফলে ঐ আশ্রমের বাতাবরণটি বড়ই চমৎকার ! একে তো নির্জন – তায় আবার বহু প্রাচীনকাল থেকে মুনি-ঋষিদের ধ্যান-জপ, যাগ-যজ্ঞ করার vibration তো রয়েছেই ! কলকাতার দু-চারজন ভক্ত খুব সম্প্রতি ওখানে যাওয়া-আসা শুরু করেছেন – এরপর হয়তো আরো অনেকেই শান্তি ও স্বস্তির খোঁজে ওখানে যেতে থাকবেন !
বিহারের ঐ আশ্রমে আশুমহারাজ (স্বামী সহস্রানন্দ) দীর্ঘদিন থাকায় (প্রায় ১৫ বছর), উনি ওখানকার বিস্তীর্ণ জায়গাজুড়ে খুবই পরিচিত এবং সন্মার্হ ! অতিসম্প্রতি উনি – ‘মৈথিলী ব্রাহ্মণদের একাংশ এতোবেশী গোঁড়া কেন’–এই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন। মৈথিলী ব্রাহ্মণরা ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের ব্রাহ্মণদের সাথে নিজেদেরকে আলাদা ভাবে কেন – এই জিজ্ঞাসা রাখায় ওরা বলেছিল যে, ওরা ভারতবর্ষের ব্রাহ্মণ-ই নয় ! রামচন্দ্র যখন রাবণ-বধ করে অযোধ্যায় ফিরে এসেছিলেন তখন ওদের পূর্বপুরুষেরা রামচন্দ্রকে ভালোবেসে তাঁর সাথে চলে আসে। কিন্তু অযোধ্যায় ওদের জায়গা হয়নি – তাই রামচন্দ্র তাদেরকে তাঁর শ্বশুরবাড়ি মিথিলায় পাঠিয়ে দিয়েছিল। সেই থেকে ওরা ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ রাবণ-কেও মানে আবার ভগবান রাম-কেও মানে। [ক্রমশঃ]