শ্রী শ্রী গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের সঙ্গে বনগ্রাম আশ্রম তৈরীর শুরু থেকে যেসব লীলাসহচরেরা ছিলেন – তাঁদের সম্বন্ধে দু-চার কথা বলা হচ্ছিলো। আমি যখন থেকে বনগ্রাম আশ্রমে যাওয়া-আসা শুরু করেছিলাম [১৯৮৩, অর্থাৎ আশ্রম প্রতিষ্ঠা(১৯৭৮)-র পাঁচ বছর পর] – তখন দেখতাম প্রতি শনিবার বা রবিবার এবং তাছাড়া যে কোনো উৎসব-অনুষ্ঠানের আগে বা বিশেষ প্রয়োজনে গুরুমহারাজের কাছে বিশেষ কয়েকজন উপস্থিত থাকতেনই ! হয়তো গুরুমহারাজ এঁদেরকে আলোচনার জন্য ডেকে পাঠাতেন, তৃষাণ মহারাজ (স্বামী পরমেশ্বরানন্দ) এবং মুরারি মহারাজ (স্বামী নিষ্কামানন্দ)-এর সঙ্গেও এই গ্রুপটির সকলের খুবই সদ্ভাব বিদ্যমান ছিল।
এই গ্রুপের মানুষগুলি হোল __বনগ্রামের মুখার্জি বাড়ির সদস্যবৃন্দ (দেবীবাবু, মেজোকাকা – রমাপ্রসাদ বাবু ও ন’কাকা – শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি), স্বপন খুড়ো বা স্বপন গোস্বামী, রামখুড়ো বা রামমণি মন্ডল, নবু মাস্টার বা রঞ্জিত দাস, তাছাড়া সামন্তী গ্রামের বটু খুড়ো, ক্ষুদিরাম বাবু, মদন মাস্টার (মাঝি) প্রমুখরা। ভান্ডুল বা কান্টিপুর-বনগ্রাম সংলগ্ন গ্রাম হওয়া সত্ত্বেও এই দুই গ্রামে সেইরকম স্বতঃস্ফূর্ত আশ্রম-প্রেমীর সংখ্যা সেই সময় খুবই কম ছিল ! ঐসব গ্রামের গুরুমহারাজের ভক্ত অনেকেই ছিল – কিন্তু সেইরকম উদ্যোগী এবং সদাসর্বদা গুরুমহারাজের পাশে থাকার আশ্বাসদানকারী মানুষ কমই ছিল। ভান্ডুল গ্রামের গাঙ্গুলি বাড়ি থেকে হয়তো দু-চারজন যাওয়া আসা করতো।
যেটা বলা হচ্ছিলো___ আশ্রমের যে কোনো কাজে এই দলটির সকলেরই বিশেষ উদ্যোগ ও উৎসাহ ছিল। সকলেই কিছু কিছু দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে সেগুলি পালন করার প্রাণপণ চেষ্টা করতেন। স্বল্পপরিসরের সেই সময়কার আশ্রম ও আশ্রমিকদের জন্য সামন্তী গ্রামের ভক্তেরা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিছু কিছু collection-ও করে নিয়ে আসতেন। আমি বনগ্রাম আশ্রনে যাবার পর দেখতাম উপরিউক্ত মানুষগুলি গুরুমহারাজের সাথে বন্ধুর মত মিশতেন ! ‘বন্ধুর মতো’ বলতে চাইছিলাম এই অর্থে যে, ওনাদের মধ্যে গুরুমহারাজের সঙ্গে মেলামেশার ব্যাপারে বিশেষ কোনো সংকোচ কখনও দেখিনি। ওনারা গুরুজীর সাথেই সিগারেট বা বিড়ি খেতেন, হই-চই করে গল্প করতেন, নানারকম মজার মজার কথা বলে গুরুজীকে হাসাতেন – নিজেরাও হাসতেন ! এইরকম ব্যাপার-স্যাপার চলতে দেখতাম। সেজন্যেই আমার মনে হতো ওনাদের সাথে গুরুমহারাজের সম্পর্কটা অনেকটাই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল।
তবে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, গুরুমহারাজ যেহেতু স্বয়ং ভগবান – তাই তাঁর নিজস্ব জায়গাটা সবসময়ই আলাদা থাকতো ! ওনারা প্রত্যেকে আসার সময় একবার এবং যাওয়ার সময় একবার গুরুমহারাজের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে ভুলতেন না ! তবে, মুখার্জি বাড়ির সিনিয়রদের প্রণাম গুরুমহারাজ কখনোই নিতেন না – বরং উনি ওই বাড়ির বয়ঃজ্যেষ্ঠদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেন ! যাইহোক, এগুলি ভগবানের লীলার অন্তর্গত – তাই ঐসব ব্যাপারে মাথা না ঘামানোই ভালো ! আমরা বরং আমাদের আলোচনায় ফিরে যাই।
সামন্তীর বটুখুড়ােরা শুধুমাত্র যে নানারকম পরামর্শ দিয়ে বা collection করে আশ্রমকে সাহায্য করতেন তাই নয় – অন্যান্যভাবেও সাহায্য করতেন। সেইসময় (অর্থাৎ আশ্রমের একেবারে গোড়ার দিকে) আশ্রমের চাষযোগ্য জমি খুব একটা বেশি ছিল না, জমিগুলির মানও খুব একটা ভালো ছিল না – মুরারি মহারাজের (তখন মুরারি মহারাজ বা স্বামী নিষ্কমানন্দ মহারাজ আশ্রমে এসে গেছিলেন এবং চাষ-বাসের দায়িত্ব তাঁর হাতে প্রথম থেকেই ন্যস্ত ছিল) হাতে তখন কৃষি-সরঞ্জামও তেমন ছিল না – তাই ওই মানুষগুলি ধানচাষের ব্যাপারে, লাঙ্গল-মোষ-বীজধান ইত্যাদির যোগান দিয়ে, ধানচাষের জন্য প্রয়োজনীয় লোকের যোগান দিয়েও প্রথমদিকে মহারাজকে খুবই সাহায্য করতেন।
যে কোনো একটা বড় প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে ছোট থেকেই বড় হয়ে ওঠে – একদিনেই যে বড় হয়, তা তো হয় না ! তাই সেই দিনগুলিতে ছোট ছোট কাজ করে দেওয়ার লোকগুলোর অবদানও ভুলে যাবার নয় ! হয়তো কেউ তখন একটু বেড়া-বাঁধার কাজ করে দিয়েছিল, কেউ হয়তো খেজুর পাতার চাটাই (তালাই)গুলো বানিয়ে দিয়েছিল, কেউ হয়তো গুরুমহারাজের যাতায়াতের সুবিধার জন্য রাস্তার ধারের ড্রেনটার উপরে একটা বাঁশের চাটা বানিয়ে দিয়েছিল, কেউ হয়তো দুটো শাক-সবজির বীজ এনে একটু জায়গা পরিস্কার করে ছিটিয়ে দিয়েছিল – এগুলো হয়তো এখনকার দৃষ্টিতে (যেহেতু এখন আশ্রমের পরিসর অনেক বড়, এখন ঐসব কাজের কোনো প্রয়োজনও নাই) ওইটুকু কাজের বিশেষ কোনো মূল্যই নাই। কিন্তু সেইদিন ছিল !
আর তাঁরা এই কাজগুলি গুরুজীকে ভালোবেসেই করতেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল গুরুমহারাজকে প্রসন্ন করা ! আর সেইজন্যেই গুরুমহারাজ‌ও ঐ মানুষগুলোর প্রতি খুবই প্রসন্ন ছিলেন ! [ক্রমশঃ]