শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর প্রথমদিকের কিছু বিশেষ বিশেষ ভক্তদের নিয়ে কথা হচ্ছিলো। আমার বনগ্রামে আশ্রম যাওয়ার শুরু থেকেই (১৯৮৩) আমি কলকাতা থেকে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে রমেন চক্রবর্তী মহাশয়কে প্রায়শঃই যে কোনো উৎসব-অনুষ্ঠানে আসতে দেখতাম। ফর্সা ধবধবে চেহারার এই সজ্জন ব্যক্তিকে দেখতাম – আশ্রমের সকলেই একটু সম্মানের চোখে দেখতেন। গুরুমহারাজের সাথেও রমেনবাবুর খুবই একটা মধুর সম্পর্ক ছিল। গুরুমহারাজ‌ও রমেনবাবুকে খুবই শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন। একদিন কথা প্রসঙ্গে গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” রমেনবাবু “শশ” প্রকৃতির পুরুষ(শাশ্ত্রে চার প্রকার পুরুষ ও চার প্রকার নারীর কথা বলা হয়েছে। পুরুষদের মধ্যে ‘শশ’ পুরুষ এবং নারীদের মধ্যে ‘পদ্মিনী’ নারী শ্রেষ্ঠ)! উনি Perfect gentleman-এর উদাহরণ।”
পরবর্তীতে রমেনবাবুর সাথে আশ্রমে আসতেন অরুণবাবু, উনি থাকতেন খড়দহ শান্তিনগরে (আর রমেনবাবু সোদপুরে) ! যদিও প্রথম দিকটায় রমেনবাবু বিহারের (বর্তমান ঝাড়খন্ড) রাঁচি রোডে কোম্পানির বাংলোয় থাকতেন, যেখানে বহুবার গুরুমহারাজের পায়ের ধুলো পড়েছিল। আমরা অবশ্য তখন অতশত জানতাম না, ‘ওনারা কলকাতা থেকে আসেন’- এটাই জানতাম। রমেনবাবু যখন চাকরিতে ভলেন্টিয়ার রিটায়ারমেন্ট নিয়ে পাকাপাকিভাবে সোদপুরে বসবাস করতে শুরু করলেন(১৯৮৫/৮৬ হবে বোধয়)– তারপর থেকে ওনারা বেশ বড়সড় একটা দল বেঁধে আশ্রমে আসতেন। সেই দলে ছিল রমেনবাবু, অরুণবাবু, খড়দহের-ই শ্যামল ব্যানার্জির বাবা চিত্ত মুখার্জি (ইনি পূর্বে পূর্বে পুলিশের ইন্সপেক্টর ছিলেন। এই শ্যামল ব্যানার্জি-ই গুরুমহারাজের কথায় আশ্রমের ২/৩ জন মহিলাকে বাংলাদেশ নিয়ে গিয়ে কাঁথাস্টিচের ট্রেনিং দিয়ে নিয়ে এসেছিলেন।), খড়দহের সন্তোষ সাধুখাঁ, কোলকাতার বড়বাজারের ব্যবসাদার হাওড়ার গুনধর সাউ, হাওড়ার রমেশবাবু (রমেশ দত্ত, নরেশ দত্ত দুই ভাই, এনাদের হাওড়ার লোহা-লক্কড়ের কারখানা ছিল। এই দুইজন গুরুমহারাজের খুবই একনিষ্ঠ ভক্ত ও রসদদার ছিলেন। আশ্রমের যে কোনো বড় কাজে এনাদের অকৃপণ অর্থসাহায্য ছিল।), ভবতোষবাবু (ভবতোষ সাহা), শেখর রায় (ইনিও কলকাতা বড়বাজারের ব্যবসাদার ছিলেন।), আরো পরে মানিকবাবু (মানিক বোস বা লক্ষ্মীপতি বোস) এবং তার ভাইয়েরা (রতন বাবু এবং ছোট ভাই স্বপন) প্রায় একই সাথে আসতেন৷
তখন ওনারা ছিলেন যেন আশ্রমের শোভা ! গুরুমহারাজ এবং তৃষাণ মহারাজ বা মুরারী মহারাজ__ এইসব বাবুদের সাথে পরামর্শ করেই নতুন কোনো project-এর রূপরেখা তৈরি করতেন। আশ্রমের যে কোনো কাজে ঐ মানুষগুলির contribution ছিল অপরিসীম ! বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনের তিল তিল করে রূপদানের ক্ষেত্রে কলকাতাগত ওই সমস্ত ভক্তদের খুবই অবদান ছিল। South Indian ভক্তরা, বিশেষত: সত্যমজীর পরিবারের সদস্যরা এবং ওনার আত্মীয়-স্বজনেরাও আশ্রমের রূপ-বিকাশের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। তুলনায় উত্তরাগত (দিল্লি, মিরাট, লখনৌ ইত্যাদি) ভক্তদের মধ্যে ভক্তির আতিশয্য যতটা ছিল, তুলনায় সরাসরি বনগ্রাম আশ্রম কর্তৃপক্ষের সাথে থেকে development-এর কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালনের কাজ__ কমই করেছেন ! ব্যতিক্রম ছিল সৌরভ পুন্ডির ! এই ঝকঝকে তরুণ ছেলেটি তার জীবনের bright carrier (ভালো চাকরি-বাকরি, যেটা ঐ বয়সের প্রায় সব ছেলেই চায়!), যৌবনের ভোগ-বাসনার আকর্ষণ ত্যাগ করে পাকাপাকিভাবে চলে এসেছিল বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে, গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের সেবামূলক কাজের অংশীদার হবার জন্য !
সৌরভ পুন্ডির গুরুজীর কাছে ব্রহ্মচর্য দীক্ষাও নিয়েছিল ! যদিও সৌরভ ‘সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর লোক নয়, তবুও construction-এর ব্যাপারটা ও খুব ভালোই বুঝতো (যে কোনো বুদ্ধিমান ছেলে কোনো কাজ বুঝে নিতে বেশি সময় নেয় না ! আর বিশেষতঃ যেখানে বুঝিয়ে দেবার লোকটি হোলো স্বয়ং ভগবান গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ!) ! সেইজন্য প্রথম দিকের দু’চারটে building construction-এর কাজ ছাড়া পুকুর বাঁধাই, স্কুল বিল্ডিং – ইত্যাদি বড় বড় construction-এর কাজ দেখাশোনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব গুরুমহারাজ দিয়েছিলেন সৌরভ পুন্ডিরের উপর ! সারাদিন রৌদ্র, বৃষ্টি, শীত উপেক্ষা করে মাথায় টুপি পরিহিত সৌরভকে আমরা disigning-এর কাগজপত্র হাতে construction-এর কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি ! ঢালাই-এর সময়, Rod-binding, shuttering এবং ঢালাইয়ের কাজে সবসময় উপস্থিত থেকে মিস্ত্রিদের নির্দেশ দিতেও দেখেছি।
প্রায়শঃই গুরুমহারাজ সকাল সাতটা বা সাড়ে সাতটার সময় নিজের ঘর থেকে স্নান বা প্রাতঃকৃত্য ছেড়ে fresh হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতেন। আর জগুমা বা অন্য কেউ মাঝারি কাঁচের গ্লাসে চিনি ছাড়া লিকার চা করে নিয়ে এসে গুরুমহারাজের হাতে ধরিয়ে দিতো ! গুরুমহারাজ সেই কাঁচের গ্লাসটিকে দু’হাতের তালুতে পাকাতে পাকাতে সোজা চলে যেতেন – যেখানে construction-এর কাজ চলছে সেখানে এবং সেখানে গিয়ে চা খেতে খেতে head মিস্ত্রী এবং সৌরভের সাথে কাজের progress এবং planning নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করতেন। কোন কোন দিন সেখানে তৃষাণ মহারাজ বা মুরারী মহারাজও উপস্থিত থাকতেন। [ক্রমশঃ]