শ্রী শ্রী গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের সম্বন্ধে এবং তাঁর ভক্ত, পার্ষদ, ব্রহ্মচারী, সন্ন্যাসী ইত্যাদিদের সম্বন্ধে কথা বলতে গিয়ে আমরা আলোচনা করছিলাম _কোনো ধনী ব্যক্তি হঠাৎ করে ফতুর হয়ে গেলে ঠিক যেরূপ অবস্থা হয়, অধ্যাত্ম-সম্পদে ধনী ব্যক্তির যখন অধ্যাত্ম-ধন হারিয়ে যায় __তাহলে তার অবস্থা পূর্বোক্ত ব্যক্তি অপেক্ষাও অধিকতর কষ্টের এবং নিদারুণ যন্ত্রণাদায়ক হয় ! গুরু মহারাজের সান্নিধ্যে আসা এমন বহু ব্যক্তিকে আমরা খুব কাছ থেকে এই রকমই মুষিক থেকে বিড়াল, বিড়াল থেকে কুকুর, কুকুর থেকে বাঘ হোতে দেখেছি । আবার তার নিজের কর্মদোষে বা ভাবনার দোষে _ পুনরায় সেই ব্যক্তিকে মুষিকে পরিণত হোতে দেখেছি !
এই জন্যই সদাসর্বদা পরমানন্দ-চরণে প্রার্থনা _”হে প্রভু ! তোমার চরণ ভুলে তোমার কৃপা-কণার দান ভুলে যেন মহামায়ার জগতের অহংকার-রূপ পাতা ফাঁদে পা না দিয়ে বসি ! তুমি সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রেখো প্রভু ! মুখের মাধ্যমে যদি অহংকার প্রকাশ পায়, তাহলে মুখ বন্ধ করে দিও ! লেখার মাধ্যমে যদি তা প্রকাশ পায়, তাহলে লেখা বন্ধ করে দিও ! কিন্তু তোমার স্নেহের আঁচলের ছায়া থেকে, তোমার করুণার দৃষ্টি থেকে যেন কখনোই বঞ্চিত করো না !”
আমরা আগের দিন পঙ্কজ বাবু এবং কাটোয়া অঞ্চলের একজন জনৈক জটাধারী সাধুর কথা বলেছিলাম ! যাঁরা যোগ-ঐশ্বর্য বা আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ করার পরেও শেষ জীবনে তা হারিয়ে ফেলেন এবং আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের ন্যায় অপরের কারুন্যে, অপরের সহায়তা নিয়ে _শেষ জীবনটা কাটাতে বাধ্য হয়েছিলেন ! অর্থাৎ ঈশ্বর নির্ভরতা অপেক্ষা যেন ব্যক্তি নির্ভরতাটাই তাদের জীবনে বেশি হয়ে গিয়েছিল ।
আমরা সমাজ জীবনের দিকে চাইলেও সেই একই দৃশ্য দেখতে পাবো । যে কোনো রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক নেতা( ধনী ব্যক্তি, পন্ডিত ব্যক্তি, শিক্ষিত ব্যক্তি, ক্ষমতাশালী ব্যক্তি)-রা যখন‌ই প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিপত্তি লাভ করেন _অমনি শুরু হয়ে যায় তার অহংকারের বড়াই ! সেই ব্যক্তি তখন তার নিচের দিকে থাকা মানুষজনকে আর মানুষ বলে মনে করতেই পারে না বা মনে করতে চায়‌ও না ! তারা তখন ভাবে _’এরা আমার দাসানুদাস ! এরা সর্বদা আমার সন্তুষ্টি বিধান করে চলবে এবং তার বিনিময়ে আমি এদেরকে একটু আধটু করুণা দেখাবো!’ তারা আরো ভাবে যে, ‘আমি কতো বড় মাপের মানুষ _সুতরাং আমার চারপাশে ছোট ছোট লোকজনদের একমাত্র কর্তব্য হোলো আমার হুকুম মেনে চলা, আমার কথার কোনো প্রতিবাদ করার স্পর্ধা না দেখানো ! কারণ, আমার কোনো ভুল থাকতে পারে না ! এই কথাগুলো সর্বান্তকরণে মেনে নেওয়া ওদের কর্তব্য !’
আর সর্বোপরি হোল _ সব সময় সে নিজে কতটা শ্রেষ্ঠ, কতটা বড় _তা প্রচার করা, জাহির করা __এটাই যেন তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। এদের আবার কিছু কিছু মেরুদণ্ডহীন স্তাবক, চাটুকার‌ও জুটে যায় ! তারা সামান্য কিছু অর্থ- -মান-মর্যাদা-ক্ষমতা ইত্যাদিগুলির সুবিধাভোগের বিনিময়ে _তাদের স্তুতি করে, বন্দনা গায় ! বলে _ “আপনি আমাদের মা, আপনিই আমাদের বাপ ! আপনি আছেন বলেই আমরা বেঁচে আছি ! আপনার কিছু হোলে আমরা এই জীবন আর রাখব না !” কিন্তু এইগুলিই স্তাবকতা ! এই স্তাবকের দল ঠিকই টিকে থাকবে ! তাদের বর্তমান মনিবের যখনই কোনো সংকট উপস্থিত হবে এই মোসাহেবের দল সবার আগে অন্য কারো কাছে গিয়ে মাথার নুইয়ে _সেখানে নিজেদের জায়গাটা একই রকমভাবে পাকা করে নেবে !
কিন্তু অহংকারী ঐ নেতৃস্থানীয় (ধর্মনেতা, রাজনেতা, সমাজনেতা ইত্যাদি)ব্যক্তির অবশ্যম্ভাবী পতন ঘটে যাবে। ভারতীয় শাস্ত্রে রয়েছে _ “অহংকার‌ই পতনের মূল!” অহংকার জমলেই তা মানুষকে দ্রুত পতনের দিকে নিয়ে চলে যাবে ! তাই _”সাধু সাবধান!” আমাদের চোখের সামনেই আমরা আমাদের আশ্রমের অনেককেই দেখলাম _যাঁরা প্রথম প্রথম খুবই ধ্যান-জপ,সাধন-ভজন করতেন এবং তাঁরা অনেকটাই উন্নত অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছিলেন । কিন্তু তাঁদের পরবর্তী জীবন অর্থাৎ জীবনের শেষ ভাগ পর্যন্ত সেই অবস্থাটা তাঁরা ধরে রাখতে পারলেন না ! তাঁদের জীবনগুলো শেষের দিকে কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল !
অথচ কি হওয়া উচিত ছিল ? যত দিন যাবে _ততই ঐ সমস্ত উন্নত অবস্থার মানুষগুলোর আধ্যাত্মিকভাবে আরো উন্নতির শিখরে পৌঁছানো উচিৎ ছিল ! জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে তাঁদের প্রত্যেকের জ্ঞানবৃদ্ধ, যোগীশ্রেষ্ঠ, প্রেম ও করুণার সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠা উচিৎ ছিল ! অর্থাৎ এক কথায় প্রত্যেকে যেন এক একটা স্বামী পরমানন্দ ছায়াশরীর হয়ে ওঠা উচিৎ ছিল !
কিন্তু তেমনটা হোলো না কেন ? কোথায় ত্রুটি হোচ্ছে ? কোথায় বাধাটা আসছে ? ওই যে, যেকথা দিয়ে আজকের আলোচনা শুরু হয়েছিল সেটাই বা সেটাই বাধা ! সেটাই কারণ ! আধ্যাত্মিক অগ্রগতির এক এবং একমাত্র কারণ হোলো__”অহঙ্কার!” গুরুমহারাজ বলেছিলেন _ “পদের সাথেই আসে ‘মদ’ !” এখানে ‘মদ’ _মানে হোলো অহঙ্কার! একটা বড় ‘পদ’ বা পোস্ট পাওয়া মানেই তো ক্ষমতা পাওয়া, সামর্থ্য লাভ করা ! আর তার মানেই হোলো _ অনেক মানুষের কাছে মান্যিগন্যি হয়ে ওঠা !
অধ্যাত্ম জগতের ব্যক্তিদের‌ প্রথম জীবনে সাধন-ভজন থাকায় কিছু সিদ্ধির প্রকাশ ঘটে যায় ! আর এই প্রকাশের কিছু কিছু ফল _তার চারপাশের লোকেরাও পেতে থাকে ! অমনি সেই সব সুবিধাভোগীর দল প্রচারণা শুরু করে দেয় _” ইনিই তিনি, তিনিই শিব, তিনি হোলেন এযুগের ভগবান “_ ইত্যাদি ইত্যাদি!!
সত্যি সত্যি ভগবান (শ্রী চৈতন্য, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী পরমানন্দ) হোলে _তাঁর কোনো অসুবিধা হয় না ! কারণ ভগবান নিজেই জানেন যে, ‘তিনি স্বয়ং ভগবান’! কিন্তু মুশকিলটা হয় _যোগাচার্য, মহাসাধক, মহাত্মা-মহাপুরুষদের ক্ষেত্রে ! এঁরা সাধনজগতের মধ্যে রয়েছেন কিন্তু এখনো সম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারেননি ! তাঁদের মনে একটু সংশয় যে কাজ করে না _তা হয়তো নয় ! তাঁরা নিজেরা তো ভালোই জানেন যে, তাঁরা ভগবান নন ! কিন্তু স্তাবকের দল যখন তাঁদেরকে নিয়ে ক্রমাগত ‘ভগবান’- ‘ভগবান’-বলে প্রচার করতে থাকে, তখন তাঁরাও ভাবতে বসেন— “তাহলে হোতেও পারে হয়তো ‘আমি ভগবান’ ! আর ভগবান না হোলেও আমি ভগবানের মতোই কেউ !” ব্যস্ _ সাথে সাথেই শুরু হয়ে যায় অহংকারের পতন!(ক্রমশঃ)