শ্রী শ্রী গুরুমহারাজের কথা এবং তাঁর ভক্ত-শিষ্য, পার্ষদ, সাধু-ব্রহ্মচারীদের কথাই এখানে বলা হচ্ছিলো। গুরুমহারাজ যে “পরমানন্দ মন্ডল”-এর কথা বলেছিলেন তাতে প্রথমে ছিল ”এক”! সেই এক নিশ্চয়ই “গুরু মহারাজ”! তাঁকে কেন্দ্র করে ছিলেন “তিনজন”(তিন জনের কথা পরে বলা যাবে)। সেই ‘তিন’-কে কেন্দ্র করে ‘ছয়জন’ – এঁরা ‘দিকপাল’ ! এঁদেরকে নির্জন মরুপ্রান্তরে নিয়ে গিয়ে ফেললেও এঁরা সেখান থেকেই ঈশ্বরের আরব্ধ কাজ সম্পন্ন করবেন, তাঁরা এতটাই শক্তিমান ! প্রচন্ড প্রতিকূলতার মধ্যেও এঁরা নিজেদের কর্মে ধীর-স্থির-অবিচল রয়ে যাবার ক্ষমতা রাখেন !
ওই ‘ছয়’-কে কেন্দ্র করে থাকবে ‘ষোলজন’, যাঁরা ভগবানের পার্ষদ ! এঁরা যুগে যুগে ভগবানের সাথেই শরীর ধারণ করে থাকেন। সব লীলায় যে সবাই আসেন, তা নয় – কিন্তু ঈশ্বরের ‘ভগবৎ লীলা’-য় এঁরা ভগবানের কাছাকাছি থেকে, তাঁর কাজের সহায়তা করেন ! এই যে ষোলজনের কথা বলা হোলো – এঁরা ঈশ্বরের দ্বারা নির্বাচিত বা নিজেদের আকাঙ্ক্ষা (ভগবানের সঙ্গলাভের আকাঙ্ক্ষা, তাঁর সাথে তাঁর হয়ে কাজ করার আকাঙ্ক্ষা) থেকেও শরীর ধারণ করতে পারেন ! গুরুমহারাজ ভগবান পরমানন্দ বলেছিলেন – ” আমার সাথে যারা পৃথিবীগ্রহে আসে, তারা কিন্তু তাদের স্বরূপ ভুলে গিয়ে মহামায়ার মায়ায় পড়ে, নানারকম ভাবে ফেঁসেও যেতে পারে ! তবে আমার সর্বদা খেয়াল থাকে। যখনই দেখি গোলমাল হয়ে যাচ্ছে – অমনি সতর্ক করে দিই ! তাতেও যদি কাজ না হয় – তাহলে ‘হুক্’ করে তুলে নিই !” এটাই মজা – এটাই লীলা ! এইজন্যই বলা হয়েছে “ভগবানের নরলীলা”! আর ভগবানের নরলীলা সাধারণ মনুষ্যবুদ্ধিতে ধরতে গেলেই মুস্কিল হয়ে যাবে। কিছুই কূলকিনারা করতে পারা যাবে না – কোনোভাবেই কোনো মানুষ হিসাব মেলাতে পারবে না !
ষোলজন পার্ষদের কথা বলা হোলো – এবার এই ষোলজন পার্ষদকে কেন্দ্র করে রয়েছেন ছত্রিশজন সিদ্ধ পুরুষ। এঁরা কলা সিদ্ধ ! এঁরা সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে ভগবানের কাজের সহায়তা করে যাবেন। সঙ্গীত, সাহিত্য, চিত্রকলা, ধর্মনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি – ইত্যাদি যে কোনো field-এ এনারা কাজ করবেন মানবের কল্যাণার্থে ! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন ! রাজনীতির field-এও এই মহাত্মাদের দু-একজন কাজ করছেন!
এইখানে একটা গোলমাল পরমানন্দ ভক্তদের মনে সেই প্রথম থেকেই দানা বেঁধেছে যে, এই যে সব দিকপালেরা-পার্ষদেরা ভগবানের সাথে এসে এখন লীলা করছেন – তাহলে এঁরা সকলেই কি পরমানন্দ মিশন থেকেই কাজ করছেন ? এর উত্তরে বলা যায় – “মোটেই না ! পরমানন্দ মিশনের‌ও হোতে পারে, আবার বাইরের‌ও হোতে পারে !” কারণ এই সমগ্র বিশ্বচরাচর যাঁর পরিধি, তাঁকে ক্ষুদ্র একটা আশ্রমের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখার ভাবনা বা প্রচেষ্টাটা নিছক আহাম্মকি ছাড়া আর কি-ই বা হোতে পারে !
মানুষের সর্বাঙ্গীন কল্যাণের জন্য যে সমস্ত মহাত্মা বা মহান মানুষ এই পৃথিবীর যেখানেই অর্থাৎ যে দেশে বা যে সমাজে কাজ করছেন – তিনিই পরমানন্দের সৈনিক, পরমানন্দ-পার্ষদ ! তিনিই আমাদের একান্ত আপনজন – আত্মার আত্মীয়! আমার মনে হয় – এইরকম ব্যক্তিদের (তা তিনি যে দেশের বা যে সমাজের বা যে কোন ধর্মমতেরই হোন না কেন) সাথে মুক্তমনা পরমানন্দ অনুরাগীদের সাক্ষাৎ হোলে খুব সহজেই পরস্পরের মধ্যে অন্তরঙ্গতা গড়ে উঠবে ! আর এতেই প্রমাণ হবে যে, তাঁরা সকলেই সেই পরমানন্দের কাজেরই সহকারী – অন্য কিছু নয় ! যুগপুরুষ যুগ-প্রয়োজনে যে আরব্ধ কাজ নিয়ে শরীর ধারণ করেছিলেন – তিনি তো সেই কাজটা সম্পন্ন না করে ছাড়বেন না! ফলে, যার দ্বারা অর্থাৎ যেকোন মত বা পথের সাধক বা উন্নত soul-এর দ্বারাই উনি কাজ করিয়ে নিতে পারেন ! সবাই তো ওনার_ফলে ওনার তো কোনো অসুবিধা নাই! সেখানে সেই ব্যক্তিকে “পরমানন্দ মিশনের কেউ” হোতেই হবে এমন কোন মানে নাই তো!
যাইহোক, আমরা কথা বলছিলাম “পরমানন্দ মন্ডল” নিয়ে ! ছত্রিশজন কলাসিদ্ধকে ঘিরে রয়েছেন চুয়ান্নজন প্রাজ্ঞ, ঋষিকল্প মহাপুরুষ ! এঁরা সকলেই পৃথিবীর নানা সমাজে ছড়িয়ে থেকে মানুষকে পরাজ্ঞানের বাণী শোনাবে, নিজের জীবন-দর্শন দিয়ে সমাজের মানুষকে প্রভাবিত করে তাদেরকেও অধ্যাত্মমুখী করবেন, আত্মবোধে উপনীত হোতে সাহায্য করবেন। ফলতঃ বোঝাই যাচ্ছে – এই ধরনের মহাত্মারা যে শুধুমাত্র সনাতন হিন্দু ধর্মমতের field-এ কাজ করছেন তা নয় – এঁরা হয়তো ইসলাম ধর্মমতে, খ্রিস্টান ধর্মমতে, বৌদ্ধ ধর্মমতে ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্মমতের মধ্যে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন ! তবে এঁরা যেখানেই থাকুন না কেন – এঁরা যথার্থ ধর্মের শিক্ষা বা প্রকৃত অধ্যাত্ম শিক্ষা-ই দিয়ে চলেছেন। তাঁর চতুর্পার্শ্বস্থ জনেদেরকে যোগ-সাধনার শিক্ষা দিয়ে তাদের কুলকুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত করছেন – যাতে করে সেইসব মানবের বিবেকের জাগরন ঘটে, চেতনার উত্তরণ হয়। আর এটাই তো প্রকৃত মহাপুরুষদের কাজ ! ধর্মমতগুলির মধ্যে বিভেদ-বিভাজন ঘটিয়ে পৃথিবীকে বারবার রক্তস্নাত করা কখনোই “মানবের ধর্ম” হতে পারে না – বরং ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ পরস্পর পরস্পরকে শ্রদ্ধা করবে, ভালোবাসবে, সহানুভূতিশীল হবে, ‘ভাই’ বলে সম্মোধন করবে – তবেই তা “মানব ধর্ম” হিসাবে সমগ্র জগতে গ্রহণযোগ্য হবে। আর্যঋষিরা যেমনটা বলেছিলেন – “বসুধৈব কুটুম্বকম”।
চুয়ান্নজন প্রাজ্ঞর বাইরের সার্কেলে রয়েছেন চৌষট্টিজন সদ্গুরু ! এঁরা সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে তাদেরকে দীক্ষা দিয়ে তাদের কুলকুণ্ডলিনী শক্তি জাগিয়ে দেবেন, তাদের চেতনার উত্তরণ ঘটিয়ে মানুষকে প্রকৃতপক্ষে ‘মান-হুঁশ’ যুক্ত মানুষে রূপান্তরিত হোতে সহায়তা করবেন। আর সব শেষে অর্থাৎ পরমানন্দ মন্ডলের সর্ববহিঃস্থ স্তরে রয়েছেন একশ আট জন প্রচারক। এঁদের প্রচারে আকৃষ্ট হয়ে সমাজের মানুষ পরমানন্দমুখী হবে এবং জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য বা মানব জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাবে।৷ [ক্রমশঃ]