শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর ভক্ত-পার্ষদ সম্বন্ধে কিছু কথা আলোচনা করা হচ্ছিলো। কিন্তু সেই আলোচনা করতে গিয়ে আমরা আগের দিন প্রসঙ্গান্তরে চলে গিয়েছিলাম। আমরা আলোচনা করেছিলাম যে __ যুগপুরুষ হয়ে যাঁরা আসেন, তাঁরা সেই যুগের যুগধর্ম প্রচার করে যান এবং সেই যুগের কি আচার, কি বিচার, কি শিক্ষা, কি কর্তব্য, সাধন-ভজনের কৌশল কি – ইত্যাদি সবকিছুরই বিস্তারিত বিবরন দিয়ে যান ও পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়ে যান। তাঁর জীবদ্দশাতেই তিনি বহু মানুষকে আকর্ষণী মুদ্রার দ্বারা তাঁর স্বমতে নিয়ে এসে তাদেরকে হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়ে তৈরি করে নেন (অবশ্যই কয়েকজন readymade পার্ষদদের তো সঙ্গে করে নিয়ে আসেন-ই)। তারা পরবর্তীদের কাছে আদর্শস্বরূপ হয়ে ওঠে অর্থাৎ যুগপুরুষের সংসর্গে এসে তাদের জীবনের পরিবর্তন-সাধন দেখে সমাজের অনেকেই অনুপ্রাণিত হয় ! এইভাবেই চলতে থাকে পরম্পরা !
আগের দিন আমরা এইখান থেকেই একটু সরে গিয়ে – কিভাবে পরম্পরার মধ্যে ধর্মজগতের গ্লানির সৃষ্টি হয় – তার আলোচনায় ঢুকে পড়েছিলাম। এবার এইসব আলোচনা থেকে একটা সিদ্ধান্ত অনায়াসেই করা যেতে পারে – সেটা হোলো যে, ঈশ্বরের অবতরণ যখনই হয়, তখনই তাঁর সাথে পার্ষদ বা লীলাসঙ্গীরা যে শুধু লীলার স্বাদ গ্রহণ করতে আসেন তাই নয় – তাঁরাও শ্রীভগবানের (অবতারপুরুষের) আরব্ধ কাজকে ঠিক ঠিক ভাবে আরও খানিকটা এগিয়েও দিয়ে যান ! কারণ ভগবান (অবতারপুরুষ)-ও জানেন, আর পার্ষদরাও জানেন যে – ভগবানের যে উদ্দেশ্যে অবতরণ – সেই উদ্দেশ্য কখনোই ১০০ ভাগ কার্যকরী হবে না – কিছুটা মাত্র হবে ! যতটা হবে, সেটাকেই একশভাগ ধরলে হয়তো দেখা যাবে ভগবান স্থূলশরীরে থাকাকালীন ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ঐ কাজ হয়ে যায়। তাঁর স্থূলশরীর ত্যাগের পর পার্ষদেরা হয়তো আরো দুই generation ধরে বাকি চল্লিশ ভাগের __২০ থেকে ২৫ ভাগ এগিয়ে দিয়ে যান ! এরপরের পনেরো থেকে কুড়ি ভাগ কাজ হতে হতেই আরো চার-পাঁচ generation লেগে যায়। আর এই ছয়/সাত generation-এর পর থেকেই ঐ পরম্পরায় শুরু হয়ে যায় অবক্ষয়।
অবক্ষয় অর্থে, ভগবানের (অবতরিত মহাপুরুষ) মূল শিক্ষা থেকে সরতে সরতে পরবর্তীকালের ভক্তরা বা অনুরাগী (followars)-রা বহুদূরে চলে আসে এবং আধ্যাত্মিক শিক্ষার মূল সুরটি হারিয়ে ফেলে অ-সুরে পরিণত হয় ! অধ্যাত্মজগতের মূল লক্ষ্য (যেটি ঈশ্বরের অবতারগণ যতোবার আসেন – ততোবারই ঐ একই শিক্ষা দিয়ে যান) হোল – জীবের চেতনার উত্তরণ। মানুষ যেহেতু জীবকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, তাই মানুষের মধ্যে শিক্ষালাভের প্রচেষ্টা, অগ্রগতির প্রচেষ্টা, আবিষ্কারের প্রচেষ্টা, স্বাস্থ্যরক্ষার প্রচেষ্টা, সুরক্ষার প্রচেষ্টা __সর্বাধিক। তাহলে অতি অবশ্যই মানবের মধ্যেই চেতনার উত্তরণ বা আত্মিক উত্তরণের প্রচেষ্টাও সর্বাধিক হওয়া উচিৎ !
অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের প্রয়োজনীয়তা বুঝে এগুলি লাভের প্রচেষ্টা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা বুঝে সেগুলিকে অর্জনের প্রচেষ্টা__এগুলো মানুষের স্থূল চাহিদা মেটায়। এইগুলি মিটলে মানুষ স্থূলত সুখী হয়, কিছুটা হোলেও মানসিক স্বস্তি পায়, কিন্তু এই চাহিদাগুলি ভালোভাবে মিটলেও মানুষ parmanant শান্তি কখনোই পায় না ! সমাজে দেখা যায় লক্ষ লক্ষ মানুষ মন্দিরে যাচ্ছে, পূজা-পাঠ করছে, বার-ব্রত-উপবাসাদি করছে অথবা মসজিদে যাচ্ছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছে, হজ-জাকাৎও করছে, খ্রিস্টান হোলে প্রতি রবিবার গির্জায় যাচ্ছে – কিন্তু কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাসীরাই প্রকৃত অর্থে শান্ত হোতে পারছে না, কেউই শরীরে-মনে-প্রাণে পূর্ণ শান্তিলাভ করতে পারছে না!
তাহলে এটা কি বোঝা যাচ্ছে না – যে, মানুষ যেন একটা গড্ডালিকা প্রবাহের মধ্যে পড়ে গেছে ! ধম্মোকম্মো করতে হয় – তাই করছে ! মন্দিরে-মসজিদে-গীর্জায়-গুরুদ্বারে যেতে হয় – তাই যাচ্ছে ! আমার পূর্বপুরুষেরাও করেছে, আমার সমাজের অন্যেরাও করে – তাই আমিও করি ! যে কোনো ধর্মমতের যে কোনো সদস্যকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় – এতদিন যে তুমি ধর্মাচরণ করছো – তুমি কি তোমার মধ্যে আধ্যাত্মিক উন্নতির লক্ষণ ফুটে উঠতে দেখছো ? তোমার কি বিবেকের জাগরণ হয়েছে ? – অর্থাৎ তুমি আর জীবনে কখনো কারও অমঙ্গল চিন্তা করবে না – পারলে ভালো করবে কিন্তু কখনো তোমার দ্বারা একটা ছোট জীবেরও কোনো ক্ষতিসাধন হবে না ? তোমার মধ্যে কি আত্মিক উত্তরণ শুরু হয়েছে ? তুমি কি তোমার কুলকুণ্ডলিনীর ঊর্ধ্বগতির ক্রিয়া উপলব্ধি করছো ? জগতের রহস্য – জীবনের রহস্য – ঈশ্বরতত্ত্ব কি তোমার ‘বোধের জগতে’ এসে ধরা দিচ্ছে ? – উত্তর কি হবে ? উত্তর হবে – না !
গুরু মহারাজ এই আলোচনা করার পর বলেছিলেন_”তাহলে আর ধর্মাচরণের উদ্দেশ্য সফল হোলো কই? আর ধর্মাচরণ করেই বা কি লাভ হোলো ? তোমরা একান্তে বসে_এসব কথা চিন্তা করবে ! তাহলে দেখবে অনেক রহস্য তোমাদের কাছে উন্মোচিত হয়ে যাচ্ছে !” [ক্রমশঃ]
আগের দিন আমরা এইখান থেকেই একটু সরে গিয়ে – কিভাবে পরম্পরার মধ্যে ধর্মজগতের গ্লানির সৃষ্টি হয় – তার আলোচনায় ঢুকে পড়েছিলাম। এবার এইসব আলোচনা থেকে একটা সিদ্ধান্ত অনায়াসেই করা যেতে পারে – সেটা হোলো যে, ঈশ্বরের অবতরণ যখনই হয়, তখনই তাঁর সাথে পার্ষদ বা লীলাসঙ্গীরা যে শুধু লীলার স্বাদ গ্রহণ করতে আসেন তাই নয় – তাঁরাও শ্রীভগবানের (অবতারপুরুষের) আরব্ধ কাজকে ঠিক ঠিক ভাবে আরও খানিকটা এগিয়েও দিয়ে যান ! কারণ ভগবান (অবতারপুরুষ)-ও জানেন, আর পার্ষদরাও জানেন যে – ভগবানের যে উদ্দেশ্যে অবতরণ – সেই উদ্দেশ্য কখনোই ১০০ ভাগ কার্যকরী হবে না – কিছুটা মাত্র হবে ! যতটা হবে, সেটাকেই একশভাগ ধরলে হয়তো দেখা যাবে ভগবান স্থূলশরীরে থাকাকালীন ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ঐ কাজ হয়ে যায়। তাঁর স্থূলশরীর ত্যাগের পর পার্ষদেরা হয়তো আরো দুই generation ধরে বাকি চল্লিশ ভাগের __২০ থেকে ২৫ ভাগ এগিয়ে দিয়ে যান ! এরপরের পনেরো থেকে কুড়ি ভাগ কাজ হতে হতেই আরো চার-পাঁচ generation লেগে যায়। আর এই ছয়/সাত generation-এর পর থেকেই ঐ পরম্পরায় শুরু হয়ে যায় অবক্ষয়।
অবক্ষয় অর্থে, ভগবানের (অবতরিত মহাপুরুষ) মূল শিক্ষা থেকে সরতে সরতে পরবর্তীকালের ভক্তরা বা অনুরাগী (followars)-রা বহুদূরে চলে আসে এবং আধ্যাত্মিক শিক্ষার মূল সুরটি হারিয়ে ফেলে অ-সুরে পরিণত হয় ! অধ্যাত্মজগতের মূল লক্ষ্য (যেটি ঈশ্বরের অবতারগণ যতোবার আসেন – ততোবারই ঐ একই শিক্ষা দিয়ে যান) হোল – জীবের চেতনার উত্তরণ। মানুষ যেহেতু জীবকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, তাই মানুষের মধ্যে শিক্ষালাভের প্রচেষ্টা, অগ্রগতির প্রচেষ্টা, আবিষ্কারের প্রচেষ্টা, স্বাস্থ্যরক্ষার প্রচেষ্টা, সুরক্ষার প্রচেষ্টা __সর্বাধিক। তাহলে অতি অবশ্যই মানবের মধ্যেই চেতনার উত্তরণ বা আত্মিক উত্তরণের প্রচেষ্টাও সর্বাধিক হওয়া উচিৎ !
অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের প্রয়োজনীয়তা বুঝে এগুলি লাভের প্রচেষ্টা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা বুঝে সেগুলিকে অর্জনের প্রচেষ্টা__এগুলো মানুষের স্থূল চাহিদা মেটায়। এইগুলি মিটলে মানুষ স্থূলত সুখী হয়, কিছুটা হোলেও মানসিক স্বস্তি পায়, কিন্তু এই চাহিদাগুলি ভালোভাবে মিটলেও মানুষ parmanant শান্তি কখনোই পায় না ! সমাজে দেখা যায় লক্ষ লক্ষ মানুষ মন্দিরে যাচ্ছে, পূজা-পাঠ করছে, বার-ব্রত-উপবাসাদি করছে অথবা মসজিদে যাচ্ছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছে, হজ-জাকাৎও করছে, খ্রিস্টান হোলে প্রতি রবিবার গির্জায় যাচ্ছে – কিন্তু কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাসীরাই প্রকৃত অর্থে শান্ত হোতে পারছে না, কেউই শরীরে-মনে-প্রাণে পূর্ণ শান্তিলাভ করতে পারছে না!
তাহলে এটা কি বোঝা যাচ্ছে না – যে, মানুষ যেন একটা গড্ডালিকা প্রবাহের মধ্যে পড়ে গেছে ! ধম্মোকম্মো করতে হয় – তাই করছে ! মন্দিরে-মসজিদে-গীর্জায়-গুরুদ্বারে যেতে হয় – তাই যাচ্ছে ! আমার পূর্বপুরুষেরাও করেছে, আমার সমাজের অন্যেরাও করে – তাই আমিও করি ! যে কোনো ধর্মমতের যে কোনো সদস্যকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় – এতদিন যে তুমি ধর্মাচরণ করছো – তুমি কি তোমার মধ্যে আধ্যাত্মিক উন্নতির লক্ষণ ফুটে উঠতে দেখছো ? তোমার কি বিবেকের জাগরণ হয়েছে ? – অর্থাৎ তুমি আর জীবনে কখনো কারও অমঙ্গল চিন্তা করবে না – পারলে ভালো করবে কিন্তু কখনো তোমার দ্বারা একটা ছোট জীবেরও কোনো ক্ষতিসাধন হবে না ? তোমার মধ্যে কি আত্মিক উত্তরণ শুরু হয়েছে ? তুমি কি তোমার কুলকুণ্ডলিনীর ঊর্ধ্বগতির ক্রিয়া উপলব্ধি করছো ? জগতের রহস্য – জীবনের রহস্য – ঈশ্বরতত্ত্ব কি তোমার ‘বোধের জগতে’ এসে ধরা দিচ্ছে ? – উত্তর কি হবে ? উত্তর হবে – না !
গুরু মহারাজ এই আলোচনা করার পর বলেছিলেন_”তাহলে আর ধর্মাচরণের উদ্দেশ্য সফল হোলো কই? আর ধর্মাচরণ করেই বা কি লাভ হোলো ? তোমরা একান্তে বসে_এসব কথা চিন্তা করবে ! তাহলে দেখবে অনেক রহস্য তোমাদের কাছে উন্মোচিত হয়ে যাচ্ছে !” [ক্রমশঃ]
