শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা এবং তাঁর ভক্ত-পার্ষদ ইত্যাদিদের কথা আলোচনা করা হচ্ছিলো। বনগ্রামের নবুমাস্টারের বাড়িতেও গুরুমহারাজের অনেক লীলা হয়েছিল এবং সেইসব লীলার সাক্ষী হিসেবে ওই বাড়ির লোকেরা তো এখনো রয়েছেই, তাছাড়া বনগ্রাম আশ্রমের বর্তমানের সন্ন্যাসীরা (তখনকার ব্রহ্মচারী)-ও অনেকেই এখনও শরীরে রয়েছেন ! ফলে ঐ সমস্ত ঘটনার কথা নিশ্চয় এখনও তাঁদের স্মৃতিতে রয়েছে !
নবুমাস্টারের ছেলে জয়চন্দ্র (গুরুমহারাজ ‘জয়’-কে জয়চন্দ্র বলেই ডাকতেন, ওর প্রকৃত নাম জয়দেব দাস।) পুরোনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করছিল। ওর চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির কথা বলতে বলতে হারিয়ে যাচ্ছিল সেইসব দিনের গভীরে !
গুরু মহারাজ __ওদের বাড়িতেই কতবার ভাবস্থ হয়ে গেছেন, একবার তো ভাবের ঘোরে কতো কথা বলে যাচ্ছিলেন ! তারপর, মৃত নবু মাষ্টার (জয়চন্দ্রের বাবা)-এর গুরু মহারাজ কতৃক
পুনরুজ্জীবন লাভের আশ্চর্যজনক ঘটনা__এইসব কত স্মৃতি ই না ওর মনে পড়ে যাচ্ছিলো ! শ্রোতা হিসাবে আমি,হর্ষ,নগেন ছাড়াও দোলন(গুরুজীর ভাইঝি) এসে বসলো, গুটি গুটি পায়ে দোলনপুত্রের সাথে আমাদের পাশে বসে পড়লো জয়চন্দ্রের কন্যাদ্বয়_মৈত্রেয়ী ও গার্গী !!
আগের দিন যে ঘটনার কথা আলোচনা হয়েছিল, অর্থাৎ যেদিন ওর ছোট বোন(ডাবরী)-এর জন্য গুরুমহারাজ আশ্রম থেকে ওদের বাড়িতে এসেছিলেন __সেইদিনকার কিছু কথা আর একটু details-এ বলা যাক্ ! সেইদিন আশ্রম থেকে র‌ওনা হবার আগেই গুরুমহারাজ জয়চন্দ্রকে বলেছিলেন – ” আজ একটা মজা করবো ! আমরা হেঁটে হেঁটেই যাবো — কিন্তু আমাদেরকে কেউ দেখতে পাবে না !” জয় একবার বলার চেষ্টা করেছিল যে, ” তুমি ভগবান ! তোমাকে না হয় কেউ না দেখতে পারে, কিন্তু আমাকে তো লোকে দেখে ফেলবেই !” উনি বলেছিলেন – ” আমাকে ধরে থাক্ – তাহলে তোকেও কেউ দেখতে পাবে না !” আর সেটাই হয়েছিল। অতটা পথ দুজনে হেঁটে হেঁটে গিয়েছিলেন, যদিও সময়টা প্রায় সন্ধ্যাকাল কিন্তু অন্ধকার হয়নি – তখনও পথ-ঘাট, গ্রামের লোকজনদের ভালোই দেখা যাচ্ছিলো।
কিন্তু সবচাইতে মজার এবং আশ্চর্যের ব্যাপারটা হয়েছিল – গুরুমহারাজ যখন ওদের বাড়িতে ঢুকেছিলেন তখন ! বাড়ির উঠোনে বনগ্রাম আশ্রমের বেশ কয়েকজন ব্রহ্মচারী (প্রজ্ঞানন্দ, আত্মানন্দ, অখন্ডানন্দ, চিদানন্দ প্রমুখরা) উঠোনে বসে বসে লন্ঠন জ্বেলে নবুমাস্টারের সাথে গল্প করছিলেন, তাদের অনেকেই ধূমপান‌ও করছিলেন ! গুরুমহারাজ নবুমাস্টারের বাড়িতে ঢোকার আগেই জয়-কে ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন – ” তুই এখানেই দাঁড়া – এখন বাড়িতে ঢুকবি না ! আমি ডাবরীর ঘরে ঢোকার পর তুই বাড়িতে পা দিবি !” জয় সেইমতোই কাজ করেছিল। গুরুমহারাজ তো যথারীতি নবুমাস্টার মহাশয় এবং আশ্রমের ব্রহ্মচারী সকলের মাঝখান দিয়ে, কাউকে পাশ কাটিয়ে কাটিয়ে যেখানে অসুস্থ মনি (ডাবরী) ছিল – সেই ঘরে ঢুকে পড়েছিলেন। তারপর বাড়িতে জয়ের প্রবেশ ! সবাই জয়কে একা আসতে দেখে জিজ্ঞাসা করেছিল – “গুরুমহারাজ কই রে !” জয় নিঃসংকোচে বলেছিল – ” গুরুমহারাজ তো এইমাত্র তোমাদের মাঝখান দিয়েই হেঁটে গিয়ে ঐঘরে ঢুকলেন !” ওখানে যারা উপস্থিত ছিল – সকলে মিলে এই কথার প্রতিবাদ করে উঠলো – “তাই কখোনো হয় ! আমরা ওনার ব্রহ্মচারী-ত্যাগী ভক্ত ! আমরা দূর থেকে ওনার গায়ের গন্ধ পাই, ওনার উপস্থিতি টের পাই – আর আমাদের সামনে দিয়ে উনি চলে গেলেন আর আমরা জানতে পারবো না ?!”
ততক্ষণে গুরুমহারাজ অসুস্থ মনি (ডাবরী)-র ঘরে ঢুকে বাড়ির মা-কে চা করতে পাঠিয়ে উনি দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন ! মা ঘরের বাইরে এসে, “হ্যাঁ, সত্যি সত্যিই বাবাঠাকুর এসেছেন !”_এইকথা বলতেই বাকি সকলের তো “স-সে-মি-রা” অবস্থা ! সবাই তখন হাতের বিড়ি বা সিগারেট ফেলার জন্য তৎপর ! কিন্তু যাকে মান্যতা দেবার জন্য এই কাজ – তিনি তো সবই দেখেছেন, সবসময়েই সবই দেখছেন ! আমাদের লজ্জাবোধ, আমাদের অজ্ঞানতা, আমাদের দুর্বলতা থেকে আমরা ভাবি যে, “তিনি দূরে রয়েছেন”, “তিনি বোধহয় আমাকে এখন দেখতে পাচ্ছেন না”! কিন্তু তিনি যে “বিশ্বতোচক্ষু”– তিনি যে ঈশ্বর – তাই তিনি সব দেখছেন, সবসময়ই দেখছেন ! আমরা আহম্মক, অজ্ঞান – তাই ভাবি তিনি বোধহয় আমাকে দেখছেন না !
যাইহোক, সেদিনকার ঘটনায় শুধু মনি(ডাবরী)-র সুস্থতাই নয়, নবুমাস্টারমহাশয় সমেত ওখানে উপস্থিত ব্রহ্মচারী(তৎকালীন)-দের মনের কোণে জমে থাকা ‘অহং’-ও দূর করেছিলেন গুরুমহারাজ ! আমাদেরও নিরন্তর প্রার্থনা – ” হে প্রভু ! এমনি করেই সদা-সর্বদা তুমি আমাদের সকলের মনের কোণে জমে থাকা অহং-অস্মিতা নাশ করো প্রভু ! তুমি তো দূরে কোথাও নাই – সকলের অন্তরের অন্তরযামীরূপে, সকলের হৃদয়ে হৃদয়নাথ হয়ে সদাসর্বদা বিরাজ করছো ! কিন্তু তুমি যেহেতু ‘অলখবিহারী’ – তাই আমরা ভাবি যে, তুমি অলক্ষ্যে রয়েছো ! কিন্তু তুমি তো লক্ষ্য রাখছো ! তোমার লক্ষ্যপথে থেকে, যেন আমরা মানব জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যের পথ ধরে এগিয়ে যেতে পারি এবং লক্ষ্যপ্রাপ্ত হই !”__ সকল ভক্তবৃন্দের হয়ে শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ ভগবান স্বামী পরমানন্দের কাছে – আমার এটাই আকুল প্রার্থনা ! [ক্রমশঃ]