শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা এবং তাঁর ভক্ত-পার্ষদ-সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারীদের কথা বলা হচ্ছিলো। কিন্তু এই কথা বলতে গিয়ে আমরা আরো নানান প্রসঙ্গের আলোচনায় এসে যাচ্ছিলাম। এখন আবার পূর্বের প্রসঙ্গেই ফিরে যাই ! অনেক পূর্বে যখন বিভিন্ন আশ্রম এবং বিভিন্ন মহারাজ বা ভক্তদেরকে নিয়ে আমরা “পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা”-য় আলোচনা করেছিলাম – তখন স্বামী চিৎবিলাসানন্দ সম্বন্ধেও কিছু কথা বলা হয়েছিল । কিন্তু ওই যে, আগেই স্বীকার করে নেওয়া আছে__ সব কথা তো আর একবারে বলে ওঠা হয় না – পরের দিকেও অনেক কথা মনে পড়ে যায়! আর তখন আবার সেটাকেও বলে নিতে হয়!
আজকে আমরা সেইরকমই __স্বামী চিৎবিলাসানন্দ মহারাজ সম্বন্ধে আরো কিছু ‘না বলা কথা’ আলোচনা করবো।
গুরুমহারাজ রুরাল ইলেক্ট্রিফিকেশন কোম্পানিতে চাকুরী করাকালীন সময়ে রায়নার জগবন্ধু দত্ত অর্থাৎ জগাদাকে ‘দাদা’ হিসাবে মান্যতা দিতেন ! আর তাছাড়াও পাহাড়হাটীর গোপাল ঘোষ বা গোপাল ডাক্তারকেও উনি ‘দাদা’ বলে ডাকতেন। কিন্তু বনগ্রাম আশ্রমে যখন মদন মহারাজ বা চিৎবিলাসানন্দ এসে ব্রহ্মচারী হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন – তখন কিন্তু মদন মহারাজ সত্যি সত্যিই গুরুমহারাজ অপেক্ষা স্থূলবিচারের বয়সে সামান্য বড়-ই ছিলেন এবং মামার বাড়ির সম্পর্কিত ‘দাদা’-ও বলা যায় ।
মদন মহারাজ তৎকালীন সময়ে M.Com পাস করেছিলেন অর্থাৎ যথেষ্ট-ই শিক্ষিত ছিলেন। আমি প্রথম প্রথম আশ্রমে গিয়ে এটাও শুনেছিলাম যে, উনি পুলিশের ‘দারোগা পদে’ চাকরির নিয়োগপত্রও পেয়েছিলেন, কিন্তু উনি চাকুরীর প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের আরব্ধ কাজে অংশীদার হবার জন্য নিজেকে তাঁর চরণে উৎসর্গ করেছিলেন। এইসব মহান মানুষের সম্বন্ধে কিছু কথা লেখার সুযোগ পাওয়াও অতি ভাগ্যের ব্যাপার !
মদন মহারাজ (স্বামী চিৎবিলাসানন্দ) খুবই সহজ-সরল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। গুরুমহারাজ যখন বনগ্রামে ‘অনাথ আশ্রম’ করার কথা ব্যক্ত করলেন এবং মাত্র কয়েকটি ছেলে নিয়ে সেই কাজ শুরু করলেন, তখন গুরুমহারাজ অনাথ আশ্রমের বালকদের মূল দায়িত্ব দিয়েছিলেন মদন মহারাজকেই ! পরবর্তীতে যেমন যেমন ছেলের সংখ্যা বেড়েছে, গুরুমহারাজ ঠিক তেমন তেমনই মদন মহারাজের সহকারী হিসাবে বিভিন্ন ব্রহ্মচারী মহারাজদের অনাথ আশ্রমের কাজে নিয়োগ করেছেন। এইভাবে একে একে নানু মহারাজ (স্বামী নির্বেদানন্দ), স্বামী জ্যোতির্ময়ানন্দ, নচিকেতা (সিঙ্গুর), সাগর (পানাগড়), গৌতম (ফরিদপুর), তাছাড়াও আরো অনেককে গুরুমহারাজ অনাথ আশ্রমের হোস্টেলে পাকাপাকিভাবে থাকার জন্য পাঠিয়েছিলেন। তখন আশ্রম বালকেরা মদন মহারাজকে ‘বড় মহারাজ’ এবং নানু মহারাজকে ‘ছোট মহারাজ’ বলে সম্বোধন কোরতো !
অন্যান্য সকল মহারাজরা ছেলেদেরকে একটু-আধটু শাসন করলেও মদন মহারাজ সচরাচর (rare দু-একটা বিশেষ ঘটনা ছাড়া) কাউকেই মারধর করে শাসন করতেন না ! উনি মুখেই তর্জন-গর্জন করতেন বেশি ! ছোট ছোট ছেলেদের কাছে মদন মহারাজ-ই ছিলেন তাদের মা বা বাবা ! তাঁদের অনেক আবদার বা অভিযোগ সামলাতে হতো মহারাজকেই ! আমরা আশ্রমে দেখেছি – বিকালের দিকে হয়তো মদন মহারাজ অনাথ আশ্রম বিল্ডিং-এর সামনে বটগাছটির কাছে আসন পেতে বসে রয়েছেন, আর দু-চারটি ছোট ছোট ছেলে ওনার ঘাড়ে চাপছে, কোলে বসছে, ওনাকে ধরে টানাটানি করছে ! এই চিত্র দেখেই বোঝা যেত যে, কতটা প্রেমিক সাধু ছিলেন স্বামী চিৎবিলাসানন্দ বা মদন মহারাজ ! যে ছেলেগুলো একটু বড় অর্থাৎ যারা নাইন-টেনে পড়তো (নাইন-টেনে পড়া বেশিরভাগ ছেলেগুলি আশ্রমের পবিত্র পরিবেশে এবং শুদ্ধ-সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ সুন্দর শরীর স্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে যেতো) তারা একটু বড় হয়ে যেতো – তারা তখন শান্ত-ভালোমানুষ মদন মহারাজকে আর অতটা পাত্তা দিতে চাইতৈ না ! কিন্তু মহারাজ হেঁকে-ডেকে সকলকে নিজের আয়ত্তে রেখে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। পরবর্তীতে যে সমস্ত ছেলেরা আশ্রম থেকে পড়াশোনা করে পরবর্তীতে কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন বিভাগে একটু হলেও স্থান করে নিতে পেরেছে – তাদের অনেকের সাথেই কথা বলে দেখেছিলাম যে, তারা ঐরূপ আচরণের জন্য চরম আফসোস করছিল ! তারা বলেছিল যে, বড়(মদন) মহারাজের কাছে তারা যে স্নেহ ভালোবাসা পেয়েছিল – তা ভোলার নয় ! তারা এখনও শ্রদ্ধার সাথে মহারাজের সাথে তাদের কাটানো সেইসব সময়ের কথা স্মরণ করে !
মদন মহারাজের প্রকৃত বাড়ি ছিল বিজারা গ্রামে (গুরুমহারাজের মামার বাড়ি), স্বামী স্বরূপানন্দেরও ওই গ্রামেই বাড়ি। মদন মহারাজরা স্বরূপানন্দেরই জ্ঞাতি-কুটুম্ব, সেই হিসাবেই মদন মহারাজ ছিলেন মামার বাড়ির সম্পর্কিত মামাতো দাদা ! যাইহোক, মদন মহারাজের এক দাদাও গুরুমহারাজের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন – তিনি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরাও প্রায়ই আসতেন বনগ্রামে গুরুমহারাজের কাছে। কিন্তু কখনো তাদের প্রতি মদন মহারাজকে special care নিতে দেখিনি ! আর করবেনই বা কেন – যা ছেড়ে চলে এসেছেন, তাই নিয়ে আদিখ্যেতা দেখানো তো সন্ন্যাসীদের ক্ষেত্রে শোভা দেয় না ! সুতরাং তিনি তা কখনোই করতেন না । একথা সত্যিই – গুরুমহারাজের প্রথম দিকের দীক্ষিত সন্ন্যাসীগণের সকলেই খুবই উন্নত অবস্থার সাধু ! তবে এটা আমি শুনেছিলাম যে, গুরুমহারাজ অনেকেরই সাধনশক্তি নিজের কাছে গচ্ছিত রেখে দিয়েছিলেন – তাই আমরা তাদেরকে ঠিকমত স্বমহিমায় দেখতে পেলাম না।
(এর পরের দিন বাকি কথা!) [ক্রমশঃ]
আজকে আমরা সেইরকমই __স্বামী চিৎবিলাসানন্দ মহারাজ সম্বন্ধে আরো কিছু ‘না বলা কথা’ আলোচনা করবো।
গুরুমহারাজ রুরাল ইলেক্ট্রিফিকেশন কোম্পানিতে চাকুরী করাকালীন সময়ে রায়নার জগবন্ধু দত্ত অর্থাৎ জগাদাকে ‘দাদা’ হিসাবে মান্যতা দিতেন ! আর তাছাড়াও পাহাড়হাটীর গোপাল ঘোষ বা গোপাল ডাক্তারকেও উনি ‘দাদা’ বলে ডাকতেন। কিন্তু বনগ্রাম আশ্রমে যখন মদন মহারাজ বা চিৎবিলাসানন্দ এসে ব্রহ্মচারী হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন – তখন কিন্তু মদন মহারাজ সত্যি সত্যিই গুরুমহারাজ অপেক্ষা স্থূলবিচারের বয়সে সামান্য বড়-ই ছিলেন এবং মামার বাড়ির সম্পর্কিত ‘দাদা’-ও বলা যায় ।
মদন মহারাজ তৎকালীন সময়ে M.Com পাস করেছিলেন অর্থাৎ যথেষ্ট-ই শিক্ষিত ছিলেন। আমি প্রথম প্রথম আশ্রমে গিয়ে এটাও শুনেছিলাম যে, উনি পুলিশের ‘দারোগা পদে’ চাকরির নিয়োগপত্রও পেয়েছিলেন, কিন্তু উনি চাকুরীর প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের আরব্ধ কাজে অংশীদার হবার জন্য নিজেকে তাঁর চরণে উৎসর্গ করেছিলেন। এইসব মহান মানুষের সম্বন্ধে কিছু কথা লেখার সুযোগ পাওয়াও অতি ভাগ্যের ব্যাপার !
মদন মহারাজ (স্বামী চিৎবিলাসানন্দ) খুবই সহজ-সরল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। গুরুমহারাজ যখন বনগ্রামে ‘অনাথ আশ্রম’ করার কথা ব্যক্ত করলেন এবং মাত্র কয়েকটি ছেলে নিয়ে সেই কাজ শুরু করলেন, তখন গুরুমহারাজ অনাথ আশ্রমের বালকদের মূল দায়িত্ব দিয়েছিলেন মদন মহারাজকেই ! পরবর্তীতে যেমন যেমন ছেলের সংখ্যা বেড়েছে, গুরুমহারাজ ঠিক তেমন তেমনই মদন মহারাজের সহকারী হিসাবে বিভিন্ন ব্রহ্মচারী মহারাজদের অনাথ আশ্রমের কাজে নিয়োগ করেছেন। এইভাবে একে একে নানু মহারাজ (স্বামী নির্বেদানন্দ), স্বামী জ্যোতির্ময়ানন্দ, নচিকেতা (সিঙ্গুর), সাগর (পানাগড়), গৌতম (ফরিদপুর), তাছাড়াও আরো অনেককে গুরুমহারাজ অনাথ আশ্রমের হোস্টেলে পাকাপাকিভাবে থাকার জন্য পাঠিয়েছিলেন। তখন আশ্রম বালকেরা মদন মহারাজকে ‘বড় মহারাজ’ এবং নানু মহারাজকে ‘ছোট মহারাজ’ বলে সম্বোধন কোরতো !
অন্যান্য সকল মহারাজরা ছেলেদেরকে একটু-আধটু শাসন করলেও মদন মহারাজ সচরাচর (rare দু-একটা বিশেষ ঘটনা ছাড়া) কাউকেই মারধর করে শাসন করতেন না ! উনি মুখেই তর্জন-গর্জন করতেন বেশি ! ছোট ছোট ছেলেদের কাছে মদন মহারাজ-ই ছিলেন তাদের মা বা বাবা ! তাঁদের অনেক আবদার বা অভিযোগ সামলাতে হতো মহারাজকেই ! আমরা আশ্রমে দেখেছি – বিকালের দিকে হয়তো মদন মহারাজ অনাথ আশ্রম বিল্ডিং-এর সামনে বটগাছটির কাছে আসন পেতে বসে রয়েছেন, আর দু-চারটি ছোট ছোট ছেলে ওনার ঘাড়ে চাপছে, কোলে বসছে, ওনাকে ধরে টানাটানি করছে ! এই চিত্র দেখেই বোঝা যেত যে, কতটা প্রেমিক সাধু ছিলেন স্বামী চিৎবিলাসানন্দ বা মদন মহারাজ ! যে ছেলেগুলো একটু বড় অর্থাৎ যারা নাইন-টেনে পড়তো (নাইন-টেনে পড়া বেশিরভাগ ছেলেগুলি আশ্রমের পবিত্র পরিবেশে এবং শুদ্ধ-সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ সুন্দর শরীর স্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে যেতো) তারা একটু বড় হয়ে যেতো – তারা তখন শান্ত-ভালোমানুষ মদন মহারাজকে আর অতটা পাত্তা দিতে চাইতৈ না ! কিন্তু মহারাজ হেঁকে-ডেকে সকলকে নিজের আয়ত্তে রেখে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। পরবর্তীতে যে সমস্ত ছেলেরা আশ্রম থেকে পড়াশোনা করে পরবর্তীতে কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন বিভাগে একটু হলেও স্থান করে নিতে পেরেছে – তাদের অনেকের সাথেই কথা বলে দেখেছিলাম যে, তারা ঐরূপ আচরণের জন্য চরম আফসোস করছিল ! তারা বলেছিল যে, বড়(মদন) মহারাজের কাছে তারা যে স্নেহ ভালোবাসা পেয়েছিল – তা ভোলার নয় ! তারা এখনও শ্রদ্ধার সাথে মহারাজের সাথে তাদের কাটানো সেইসব সময়ের কথা স্মরণ করে !
মদন মহারাজের প্রকৃত বাড়ি ছিল বিজারা গ্রামে (গুরুমহারাজের মামার বাড়ি), স্বামী স্বরূপানন্দেরও ওই গ্রামেই বাড়ি। মদন মহারাজরা স্বরূপানন্দেরই জ্ঞাতি-কুটুম্ব, সেই হিসাবেই মদন মহারাজ ছিলেন মামার বাড়ির সম্পর্কিত মামাতো দাদা ! যাইহোক, মদন মহারাজের এক দাদাও গুরুমহারাজের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন – তিনি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরাও প্রায়ই আসতেন বনগ্রামে গুরুমহারাজের কাছে। কিন্তু কখনো তাদের প্রতি মদন মহারাজকে special care নিতে দেখিনি ! আর করবেনই বা কেন – যা ছেড়ে চলে এসেছেন, তাই নিয়ে আদিখ্যেতা দেখানো তো সন্ন্যাসীদের ক্ষেত্রে শোভা দেয় না ! সুতরাং তিনি তা কখনোই করতেন না । একথা সত্যিই – গুরুমহারাজের প্রথম দিকের দীক্ষিত সন্ন্যাসীগণের সকলেই খুবই উন্নত অবস্থার সাধু ! তবে এটা আমি শুনেছিলাম যে, গুরুমহারাজ অনেকেরই সাধনশক্তি নিজের কাছে গচ্ছিত রেখে দিয়েছিলেন – তাই আমরা তাদেরকে ঠিকমত স্বমহিমায় দেখতে পেলাম না।
(এর পরের দিন বাকি কথা!) [ক্রমশঃ]
