শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা প্রসঙ্গে এখন তাঁর ভক্ত, শিষ্য, পার্ষদ ইত্যাদিদের সম্বন্ধে আলোচনা হচ্ছিলো। আমরা ছিলাম মদন মহারাজ বা স্বামী চিৎবিলাসানন্দের কথায় – কিন্তু কথায় কথায় সেখান থেকে আমরা এখন একটু অন্য প্রসঙ্গে এসে পড়েছি ! তথাকথিত সাধু-সন্ন্যাসী এবং গৃহীভক্তদের মধ্যে যে একটা মনোজাগতিক দ্বন্দ্ব রয়েছে (যেটা একেবারেই থাকার কথা নয়), সেই প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিলো। এই প্রসঙ্গটি এসেছিল এইজন্য যে, এই দ্বন্দ্বের ব্যাপারটা একেবারেই মদন মহারাজের মধ্যে ছিল না। কারণ ওনার ঘরে (সাধু ব্যারাক) মাঝে মাঝেই উনি আমাকে (এবং অন্য অনেককেই) গুরুজীর গল্প করার জন্য ডেকে নিয়ে যেতেন। ওনার ঘরে গিয়ে আমি বসার জন্য একটা অন্য জায়গা খুঁজতেই উনি জোর করে ওনার বিশ্রামের জন্য রাখা চৌকিতেই আমাকে বসতে বাধ্য করতেন ! অথচ বনগ্রাম আশ্রমেই আমার বন্ধুস্থানীয় সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারী বা আমার থেকে বয়সে ছোট স্নেহের ভাইপ্রতিম ব্রহ্মচারীরাও তাদের বিছানায় কখনোই আমাকে বসতে দেয়নি ! ঘরে গেলে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে __যাতে তার চৌকিটা ছুঁয়ে না ফেলি ! অবশ্য বনগ্রামের বাইরে বিভিন্ন শাখায় যে সমস্ত সন্ন্যাসীরা আছেন – তাঁদের অনেকের বিছানায় শুধু বসাই নয়,একসাথে শুয়ে অনেক রাতও কাটিয়েছি ! আমার মনে হয়__এঁরাই তো গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের শিক্ষায় শিক্ষিত, তাঁর দীক্ষায় দীক্ষিত_ সন্ন্যাসী ! এঁরাই তো আধুনিক সন্ন্যাসী ! এঁরা সর্বাধুনিক ! যা পূর্ব পূর্ব মহাপুরুষদের পরম্পরার সন্ন্যাসীদের থেকে এক’শ ধাপ এগিয়ে !!
এক’শ বছর আগে স্বামী বিবেকানন্দ কিছু কথা তাঁর পরম্পরার সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারীদের উদ্দেশ্য করে (যাদের প্রয়োজন ছিল তাদেরকেই, সার্বজনীন হয়তো নয়) কিছু কথা বলে গিয়েছিলেন, কিছু নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন – কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তা সহস্র সহস্র বছরের জন্য মান্য ! তাই যদি হবে, তাহলে যুগপুরুষের–যুগাবতারের আগমনের প্রয়োজনটাই বা কি ? যেমন নতুন নতুন virus-এর জন্য নতুন নতুন টিকার উদ্ভাবন করতে হয়, নতুন নতুন ঔষধের বিধান দিতে হয় – ঠিক তেমনই যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মানবিক চেতনার উত্তরণ হয় (পূর্ব পূর্ব মহাপুরুষদের প্রভাবেই তা হয়)! ফলে তখন আর পুরোনো prescription-এ কাজ চলে না, নতুন prescription গ্রহণ করতে হয় এবং সেই prescription অনুযায়ী ওষুধ খেতে হয় ! এটাই যুগধর্ম ! ফলে আমাদের মিশনের (পরমানন্দ মিশন) সাধু-সন্তদের অনেকের মধ্যেই গৃহী-সন্ন্যাসী ভেদ বা Sentiment আর ততটা নাই ! আমার স্থির নিশ্চিত ধারণা যে, এইসব সাধু-সন্তরা গুরুমহারাজের বিশেষ কৃপাধন্য, কারণ তাঁরা তাঁদের জীবনে গুরুমহারাজের আদর্শকে অনেকাংশে রূপদানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।কারণ পরবর্তীতে এইরূপ ভেদাভেদশুন্যতাটাই যুগধর্ম হয়ে উঠবে। এইজন্যই তো এবারের পরমানন্দ লীলায় ঠাকুরের (শ্রীরামকৃষ্ণ) আমলের বহু সন্ন্যাসী এবার গৃহস্থী এবং সেই সময়ের অনেক গৃহী ভক্ত এবার সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করছে। তাই স্থুলদৃষ্টিতে বিচার করতে গেলে __কে গৃহী,কে সন্ন্যাসী— সব ভুলভাল হয়ে যাবে।।
কিন্তু এটাও ঠিক যে, পরমানন্দ মিশনের ষোলআনা সাধু-ব্রহ্মচারীরাও তো এই sentiment থেকে মুক্ত নয় – তাই অন্যান্য মিশনের (যারা পুরোনো prescription অনুযায়ী চলে) সাধু-সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে আমরা বেশি কিছু আশা করতেও পারি না ! তারা তাদের গুরুর কাছে যেমনটা শিখেছে – তেমনটাই পালন করে চলেছে। অনেক পরে যখন cyclone-এর মতো ultra-modern “পরমানন্দ formulla”- সমাজের বুকে আছড়ে পড়বে, তখন অন্যান্য পরম্পরার সদস্যরাও সেই formulla-য় চলবে ! এইটাই তো জগতের রীতি। এমনটাই হয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে !
প্রকৃতিতেও আমরা দেখতে পাই_ পুরোনো পাতা ঝড়ে গিয়ে বৃক্ষরাজিতে নতুন পাতা গজিয়ে পৃথিবীর সবুজকে বাঁচিয়ে রাখে, পুরোনো মানুষেরা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে পরিবার থেকে,সমাজ থেকে বিদায় নেয় – আবার ওই পরিবারেই নতুন শিশুরা জন্ম নিয়ে কত লীলাখেলা করে, কত রঙ্গ করে ! ঠিক তেমনি সমাজের বিবর্তনেও পুরোনো নিয়ম বিদায় নেয় – তার বদলে নতুন বিধান সেখানে স্থান করে নেয় !
যাইহোক,আমরা মদন মহারাজের কথায় ফিরে আসতে চাইছি ! কিন্তু আবার এই প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে যাচ্ছে বলে __এখানে বলে রাখি ! আমরা যখন প্রথম প্রথম আশ্রমে যাওয়া শুরু করেছিলাম (১৯৮৩/৮৪), তার বেশ কিছুদিন পরে অর্থাৎ যখন আমার সাথে কৃষ্ণদেবপুরের (গুরুমহারাজের বাড়ি) বাড়ির দু-একজনের সাথে আলাপ পরিচয় হয়েছে, এমন সময়েই একদিন আশ্রমে গিয়ে শুনেছিলাম গুরুমহারাজের এক ভাইয়ের ছোট একটি মেয়ে মারা গেছে ! মেয়েটির নাম ছিল গৌরী। সে ছোটোতেই দেখতে খুবই সুন্দর ছিল__ ফর্সা রং, মাথায় ঘন চুল – ফলে তাকে বাড়ির সবাই খুবই ভালবাসতো। সর্বোপরি মেয়েটি গুরুমহারাজের গর্ভধারিনীর খুবই প্রিয় ছিল, মায়ের কাছেই বেশি থাকতো ! তাই তার অকালমৃত্যুতে ‘জননী নিভারাণী’ খুবই মুষড়ে পড়েছিলেন – খুবই ব্যাথাকাতর হয়ে পড়েছিলেন। এই পুরো ব্যাপারটা গুরুমহারাজ একদিন সিটিংয়ে আলোচনা করেছিলেন এবং উনি বলেছিলেন – ” মায়ের (ওনার গর্ভধারিনী) এই ব্যাথা আমাকে স্পর্শ করছে, আমার অন্তঃকরণকেও বেদনার্ত করে তুলছে ! তবে শিগগিরই ওই মেয়েটি আবার শরীর নেবে৷”
পরে আমরা এটাও শুনেছিলাম যে, ওই মেয়েটি মদন মহারাজের(বিজারা) পরিবারে শরীর গ্রহণ করেছে !
গুরুমহারাজের অনেক কথাই আমাদের বিস্মরণ হয়ে গেছে, কিন্তু মদন মহারাজ সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে হঠাৎ করে সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল – তাই এখানে উল্লেখ করলাম। “পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা” তো এক অর্থে ফেলে আসা দিনগুলোর দলিল, সেই দিনগুলির ইতিহাস ! তাই এই ছোট্ট ঘটনাটাও স্থান পাক সেখানে। মদন মহারাজের সম্বন্ধে অন্যান্য কথা না হয় পরের আলোচনায় হবে ! [ক্রমশঃ]
এক’শ বছর আগে স্বামী বিবেকানন্দ কিছু কথা তাঁর পরম্পরার সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারীদের উদ্দেশ্য করে (যাদের প্রয়োজন ছিল তাদেরকেই, সার্বজনীন হয়তো নয়) কিছু কথা বলে গিয়েছিলেন, কিছু নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন – কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তা সহস্র সহস্র বছরের জন্য মান্য ! তাই যদি হবে, তাহলে যুগপুরুষের–যুগাবতারের আগমনের প্রয়োজনটাই বা কি ? যেমন নতুন নতুন virus-এর জন্য নতুন নতুন টিকার উদ্ভাবন করতে হয়, নতুন নতুন ঔষধের বিধান দিতে হয় – ঠিক তেমনই যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মানবিক চেতনার উত্তরণ হয় (পূর্ব পূর্ব মহাপুরুষদের প্রভাবেই তা হয়)! ফলে তখন আর পুরোনো prescription-এ কাজ চলে না, নতুন prescription গ্রহণ করতে হয় এবং সেই prescription অনুযায়ী ওষুধ খেতে হয় ! এটাই যুগধর্ম ! ফলে আমাদের মিশনের (পরমানন্দ মিশন) সাধু-সন্তদের অনেকের মধ্যেই গৃহী-সন্ন্যাসী ভেদ বা Sentiment আর ততটা নাই ! আমার স্থির নিশ্চিত ধারণা যে, এইসব সাধু-সন্তরা গুরুমহারাজের বিশেষ কৃপাধন্য, কারণ তাঁরা তাঁদের জীবনে গুরুমহারাজের আদর্শকে অনেকাংশে রূপদানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।কারণ পরবর্তীতে এইরূপ ভেদাভেদশুন্যতাটাই যুগধর্ম হয়ে উঠবে। এইজন্যই তো এবারের পরমানন্দ লীলায় ঠাকুরের (শ্রীরামকৃষ্ণ) আমলের বহু সন্ন্যাসী এবার গৃহস্থী এবং সেই সময়ের অনেক গৃহী ভক্ত এবার সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করছে। তাই স্থুলদৃষ্টিতে বিচার করতে গেলে __কে গৃহী,কে সন্ন্যাসী— সব ভুলভাল হয়ে যাবে।।
কিন্তু এটাও ঠিক যে, পরমানন্দ মিশনের ষোলআনা সাধু-ব্রহ্মচারীরাও তো এই sentiment থেকে মুক্ত নয় – তাই অন্যান্য মিশনের (যারা পুরোনো prescription অনুযায়ী চলে) সাধু-সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে আমরা বেশি কিছু আশা করতেও পারি না ! তারা তাদের গুরুর কাছে যেমনটা শিখেছে – তেমনটাই পালন করে চলেছে। অনেক পরে যখন cyclone-এর মতো ultra-modern “পরমানন্দ formulla”- সমাজের বুকে আছড়ে পড়বে, তখন অন্যান্য পরম্পরার সদস্যরাও সেই formulla-য় চলবে ! এইটাই তো জগতের রীতি। এমনটাই হয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে !
প্রকৃতিতেও আমরা দেখতে পাই_ পুরোনো পাতা ঝড়ে গিয়ে বৃক্ষরাজিতে নতুন পাতা গজিয়ে পৃথিবীর সবুজকে বাঁচিয়ে রাখে, পুরোনো মানুষেরা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে পরিবার থেকে,সমাজ থেকে বিদায় নেয় – আবার ওই পরিবারেই নতুন শিশুরা জন্ম নিয়ে কত লীলাখেলা করে, কত রঙ্গ করে ! ঠিক তেমনি সমাজের বিবর্তনেও পুরোনো নিয়ম বিদায় নেয় – তার বদলে নতুন বিধান সেখানে স্থান করে নেয় !
যাইহোক,আমরা মদন মহারাজের কথায় ফিরে আসতে চাইছি ! কিন্তু আবার এই প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে যাচ্ছে বলে __এখানে বলে রাখি ! আমরা যখন প্রথম প্রথম আশ্রমে যাওয়া শুরু করেছিলাম (১৯৮৩/৮৪), তার বেশ কিছুদিন পরে অর্থাৎ যখন আমার সাথে কৃষ্ণদেবপুরের (গুরুমহারাজের বাড়ি) বাড়ির দু-একজনের সাথে আলাপ পরিচয় হয়েছে, এমন সময়েই একদিন আশ্রমে গিয়ে শুনেছিলাম গুরুমহারাজের এক ভাইয়ের ছোট একটি মেয়ে মারা গেছে ! মেয়েটির নাম ছিল গৌরী। সে ছোটোতেই দেখতে খুবই সুন্দর ছিল__ ফর্সা রং, মাথায় ঘন চুল – ফলে তাকে বাড়ির সবাই খুবই ভালবাসতো। সর্বোপরি মেয়েটি গুরুমহারাজের গর্ভধারিনীর খুবই প্রিয় ছিল, মায়ের কাছেই বেশি থাকতো ! তাই তার অকালমৃত্যুতে ‘জননী নিভারাণী’ খুবই মুষড়ে পড়েছিলেন – খুবই ব্যাথাকাতর হয়ে পড়েছিলেন। এই পুরো ব্যাপারটা গুরুমহারাজ একদিন সিটিংয়ে আলোচনা করেছিলেন এবং উনি বলেছিলেন – ” মায়ের (ওনার গর্ভধারিনী) এই ব্যাথা আমাকে স্পর্শ করছে, আমার অন্তঃকরণকেও বেদনার্ত করে তুলছে ! তবে শিগগিরই ওই মেয়েটি আবার শরীর নেবে৷”
পরে আমরা এটাও শুনেছিলাম যে, ওই মেয়েটি মদন মহারাজের(বিজারা) পরিবারে শরীর গ্রহণ করেছে !
গুরুমহারাজের অনেক কথাই আমাদের বিস্মরণ হয়ে গেছে, কিন্তু মদন মহারাজ সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে হঠাৎ করে সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল – তাই এখানে উল্লেখ করলাম। “পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা” তো এক অর্থে ফেলে আসা দিনগুলোর দলিল, সেই দিনগুলির ইতিহাস ! তাই এই ছোট্ট ঘটনাটাও স্থান পাক সেখানে। মদন মহারাজের সম্বন্ধে অন্যান্য কথা না হয় পরের আলোচনায় হবে ! [ক্রমশঃ]
