শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের ভক্ত, পার্ষদ, ব্রহ্মচারী-সন্ন্যাসী প্রমুখদের নিয়ে কথা বলা হচ্ছিলো। আমাদের এখানে এখন মদন মহারাজ বা স্বামী চিৎবিলাসানন্দের সরল সাদাসিধে জীবন নিয়ে কিছু আলোচনা করা হবে। আর আজকে খুবই চেষ্টা করা হবে যাতে আমরা প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে চলে না যাই !
এটা পুরোনো ভক্তরা সকলেই জানেন যে, বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে ক্ষ্যাপা ঠাকুর অর্থাৎ কেশব মহারাজ (স্বামী দেবানন্দ), মুরারী মহারাজ (স্বামী নিষ্কামানন্দ) প্রমুখ দুই-একজন ছাড়া মদন মহারাজই ছিলেন, যিনি স্বভাবে একেবারেই খোলামেলা_ যাঁর কাছে অবাধে যাওয়া যেতো, অবাধে মেলামেশা করা যেতো, যাঁর ঘরে যে কেউ যে কোনো সময় প্রবেশ করতে পারতো বা খানিকক্ষণ কাটাতেও পারতো। টাকা পয়সার প্রতিও ওনার মোটেই মোহ ছিল না। সত্যি সত্যিই এমন উদার-হৃদয় সাধু পাওয়া খুবই মুশকিল ! ওনার খুবই পরিচিত (যদিও পুরোনো ভক্তদের প্রায় সবাই ওনার পরিচিত ছিল) ব্যক্তি যদি বিশেষ কোনো কারণে বা ব্যস্ততার জন্য আশ্রমে এসেও মদন মহারাজের সাথে সাক্ষাৎ না করে চলে যাবার চেষ্টা করতো – অমনি মহারাজের সজোরে হাঁক – “এই অমুক (বা অমুক বাবু) ! কি ব্যাপার, দেখা না করেই চলে যাচ্ছো যে! এসো – ও-ও ! এখানে এসো – ও-ও!” সেই বেচারা ভদ্রলোক আর কি করে ! তার যতই তাড়াতাড়ি থাক্ বা বিস্মরণের জন্য লজ্জাবোধ – তাকে মহারাজের কাছে আসতেই হোতো এবং কেন দেখা করেনি তার ব্যাখ্যাও দিতে হোতো !
যদি ভক্তটির হাতে সময় থাকতো (বিস্মরণের ক্ষেত্রে), তাহলে দীর্ঘ সময় ধরে চলতো গালগল্প ! বাড়ির খবর, কাজকর্মের খবর (গ্রামের মানুষ হোলে চাষবাসের খবর), ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, চাকরি-বাকরির খবর ! মায়__ তাদের ব্যক্তিগত জীবনের গোপন খবর !! তিনি যেন ঐ ব্যক্তির একান্ত আপন কেউ !
মদন মহারাজ স্মোকার ছিলেন না – কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হোলো এই যে, কোনো ধূমপায়ী ব্যক্তির সাথে কথা বলতে বলতে উনি তাকে সঙ্গ দিতে পরপর দুটো-তিনটে সিগারেট খেয়ে নিতেন ! কোনো কোনো ধূমপায়ী ভক্ত ওনাকে সিগারেটের প্যাকেট gift হিসেবে দিয়ে গেলে – উনি কিন্তু সেখান থেকে সিগারেট নিয়ে একা একা বড় একটা খেতে চাইতেন না। ওনার ভালোবাসার লোক যে কাউকে দেখতে পেলেই – তাকে ডেকে নিতেন এবং তার সঙ্গে হয়তো একটা সিগারেট খেতেন এবং সেই ভক্তটি চলে যাবার সময় বেশিরভাগ সময়েই উনি সিগারেটের প্যাকেটটা তাকে দিয়ে দিতেন, বলতেন – ” যাও ওইখানে, ‘অমুক-অমুক’ রয়েছে – সবাইকে ভাগ করে দিও।” কেমন মজার মানুষ ছিলেন মদন মহারাজ – তাই না !
ওনার ঘরে বাচ্চাদের (অনাথ বালকদের) জন্য লজেন্স, বিস্কুট, চানাচুর ইত্যাদি খাবার জিনিস থাকতো – যেগুলি কোনো-না-কোনো ভক্ত বাচ্চাদের জন্য ওনার কাছে দিয়ে যেতো ! আমি বা আমার মতো বহু ভক্তেরা_ ওনার ঘরে প্রায়ই যেতাম, কিন্তু কখনোই বাচ্চাদের জন্য রাখা সেই খাবার অন্য কাউকে খাওয়াতে দেখিনি ! উনি সবসময়ই মনে পাড়াতেন যে, এগুলো বাচ্চাদের জন্য রাখা হয়েছে – বিকালের দিকে ওদেরকে দিয়ে দেওয়া হবে। এর ফলে এই ধরনের খাদ্যগুলির খুব বেশি স্টক তৈরী হোতো না, আর জিনিসগুলি বেশিদিনের পুরোনোও হোতে পারতো না। সবাইকে বিলি করে দেবার মতো খাবার জমা হয়ে গেলেই__ উনি সেইগুলি বাচ্চাদের খাইয়ে দিতেন।
বাচ্চাদের পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারেও দেখতাম, উনি স্টক করা পছন্দ করতেন না ! গোটা কয়েক জমলেই উনি ছেলেদেরকে দিয়ে দিতেন। প্রসঙ্গতঃ এখানে বলে রাখা ভালো – এখন যেমন বাচ্চাদের (অনাথ আশ্রমের) জন্য বছরে নতুন নতুন তিন সেট – চার সেট জামা-প্যান্ট দেওয়া হয়, তাছাড়াও হয়তো আরো দু-এক সেট জামাকাপড় প্রলয় মহারাজ (স্বামী চিন্ময়ানন্দ ব্রহ্মচারী, বর্তমানে পরমানন্দ মিশনের অনাথ বালকদের বা অন্যান্য আশ্রমিকদের যিনি বস্ত্র সরবরাহের ভারপ্রাপ্ত মহারাজ)-এর স্টকে থেকেও যায়, কিন্তু প্রথমদিকে আশ্রমে এমন চিত্রটা ছিল না !
তখন আশ্রমের পরিধি ছিল ছোটো। শহরের মানুষজন খুব একটা তখনও আশ্রমে যাওয়া-আসা শুরু করেনি (১৯৮৩/৮৪ সাল)! যারাও বা আসতো – তারা তখনও গুরুমহারাজকেই মান্যতা দিতো। আশ্রমের বাকি ব্যাপারে মাথা ঘামাতো না – অর্থাৎ তখনও আশ্রমের সাথে তাদের ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে নি। শুধু স্থানীয় গ্রামগুলির মানুষেরাই বেশি যাওয়া-আসা করতো এবং তাদের সাথেই মহারাজদের কিছুটা হলেও অন্তরঙ্গতা গড়ে উঠেছিল। সেইসময় আশ্রমে অনাথ বালকদের সংখ্যাও কম ছিল ! তবু তখন দেখেছিলাম __মদন মহারাজের অনুরোধে অনেক ভক্তরাই তাদের বাড়ির ছেলেদের ব্যবহার করা জামা-কাপড়-শীতবস্ত্র আশ্রমে দিয়ে যেতো। সেগুলি থেকে বেছে বেছে যেগুলি পড়ার উপযুক্ত – সেইগুলি ছেলেদেরকে দেওয়া হোতো ! অবশ্য দুর্গাপূজার সময়ে প্রতি বছরেই গুরুমহারাজ নিজের হাতে এক সেট করে নতুন জামাকাপড় সকলের হাতে তুলে দিতেন।
সুতরাং, শুধু আজকের বিচারে বনগ্রাম আশ্রমকে যদি কেউ বিচার করতে চায় – তাহলে বড়ই ভুল হয়ে যাবে। পুরোনো দিনের বনগ্রাম কেমন ছিল – তার জ্ঞানটাও থাকা জরুরি। গুরুমহারাজ এটাই বলেছিলেন – ” বর্তমানকে নিয়ে থাকো, কিন্তু অতীত (পুরোনো)-কে শ্রদ্ধা কোরো।” [ক্রমশঃ]